একসময় দূরের মানুষের কাছে নিজের মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল চিঠি। আজ কাউকে বার্তা পাঠিয়ে পাঁচ মিনিট উত্তর না পেলেই যেখানে মনে হয়, ‘রাগ করেছে নাকি?’ চিঠির যুগে সেই অপেক্ষা ছিল আরও দীর্ঘ। একটি চিঠি লিখে খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার পর শুরু হতো আসল অপেক্ষা। চিঠি পৌঁছেছে কি না, প্রাপক পড়েছে কি না, আর উত্তর দেবে কি না কিছুই জানা যেত না।
কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, কখনোবা মাসও কেটে যেত। তখন মুঠোফোন ছিল না, তাৎক্ষণিক বার্তা ছিল না, এমনকি ‘কোথায় আছ?’ বলে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার সুযোগও ছিল না। ছিল শুধু ডাকপিয়নের আশায় পথ চেয়ে থাকা। দূর থেকে ডাকপিয়নকে দেখা গেলেই মনে হতো, ‘এই বুঝি আমার চিঠি!’ আর তিনি পাশের বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেই সেই আশায় জল ঢেলে যেত!

চিঠির যুগের ভালোবাসার গল্পও ছিল বেশ আলাদা। এখনকার দিনে অনেকের ভালোবাসার কথাবার্তা শুরু হয় ‘খেয়েছ?’ দিয়ে, উত্তর আসে ‘হ্যাঁ’, এরপর ‘কী খেয়েছ?’ ‘ভাত’। তারপর আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে দুজনই চুপ! কিন্তু সেই সময় প্রিয় মানুষকে একটি চিঠি লিখতে বসলে এক কথার সঙ্গে আরেক কথা জুড়ে দিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা হয়ে যেত। কেমন আছ, শরীর কেমন, বাড়ির সবাই কেমন আছে, আজ বৃষ্টি হয়েছে কি না সবকিছুই জায়গা পেত সেই চিঠিতে। আর শেষে থাকত এমন আবেগপূর্ণ কথা, যা আজ কাউকে লিখলে সে হয়তো চিঠিটা পড়ে বলত, ‘এত কথা লিখতে এত সময় পেল কীভাবে!’
তবে চিঠি শুধু ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত অনুভূতির বাহন ছিল না, ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এই চিঠি। রাজা-রানি, রাষ্ট্রনায়ক, সৈনিক, লেখক ও শিল্পীদের লেখা অসংখ্য চিঠি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এসব চিঠি থেকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তাভাবনা, সম্পর্ক এবং তাদের সময়ের সমাজ ও রাজনীতির নানা তথ্য জানা যায়। বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েনের ব্যক্তিগত চিঠিতেও ছিল তার স্বভাবসিদ্ধ রসবোধ ও ব্যঙ্গ। অর্থাৎ, আজ আমরা যেমন মজার কথা লিখে বন্ধুদের হাসাই, তখনও মানুষ চিঠির পাতায় হাসি-ঠাট্টার জায়গা করে নিত।

চিঠির যুগের সবচেয়ে বড় মজার বিষয় ছিল উত্তর দিতে দেরি হলে কাউকে বারবার তাড়া দেওয়ার উপায় ছিল না। ‘কেন উত্তর দিচ্ছ না?’, ‘চিঠি পেয়েছ?’, ‘রাগ করেছ?’এমন প্রশ্ন লিখে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি চিঠি পাঠানোও সম্ভব ছিল না। কারণ সেটি পৌঁছাতেই আবার কয়েক দিন! ফলে অপেক্ষা করাই ছিল একমাত্র উপায়।
সময় বদলেছে। ডাকপিয়নের জায়গা নিয়েছে মুঠোফোন, খামের জায়গা নিয়েছে পর্দার ছোট্ট বার্তার বাক্স, আর দীর্ঘ অপেক্ষার জায়গা নিয়েছে মুহূর্তের যোগাযোগ। এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডেই খবর পৌঁছে যায়। তবুও হাতে লেখা চিঠির আবেদন আজও আলাদা। কারণ একটি চিঠিতে শুধু কিছু শব্দ থাকে না; থাকে লেখকের সময়, যত্ন, হাতের লেখা এবং অনুভূতি।

তাই চিঠির যুগ হয়তো অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে, কিন্তু চিঠির আবেগ এখনো পুরোনো হয়নি। একসময় মানুষ চিঠির উত্তরের জন্য জানালার পাশে বসে থাকত, আর এখন মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। শুধু অপেক্ষার জায়গাটা বদলেছে, অপেক্ষার অনুভূতিটা বোধহয় একই রয়ে গেছে।









