সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম; সবখানেই এখন এই অপসংস্কৃতির কালো ছায়া।
কিন্তু এই গ্যাং কালচার বিশ্বজুড়ে কীভাবে শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশেই বা এর অনুপ্রবেশ কবে এবং কেন একে ‘কিশোর গ্যাং’ বলা হয়? চলুন জেনে নেওয়া যাক এর আদ্যোপান্ত।
বিশ্বে দলবদ্ধ অপরাধ বা গ্যাং কালচারের ইতিহাস বেশ পুরনো। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিল্প বিপ্লবের পর যখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণ শুরু হয়, ঠিক তখন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে থাকে গ্যাং সংস্কৃতি।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে লন্ডনের রাস্তায় ‘মহিকস’ নামক একদল বখাটে যুবকের তাণ্ডব দেখা যেত। তারা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা ও আক্রমণ করত। এটিই ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্যাং সংস্কৃতির উদাহরণ।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক, শিকাগো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলোতে ইউরোপীয় অভিবাসীদের আগমন ঘটে। চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, বস্তি জীবনের নোংরা পরিবেশ এবং সামাজিক অবহেলার কারণে তরুণেরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় দল গঠন করতে শুরু করে।
১৮২০-এর দশকে নিউ ইয়র্কের ‘ফর্টি থিভস’ নামক দলটিকে আমেরিকার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাং হিসেবে গণ্য করা হয়।
১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমা বিশ্বে পপ কালচার, রক মিউজিক এবং হলিউড সিনেমার প্রভাবে কিশোরদের মধ্যে গ্যাং কালচার ভিন্ন মাত্রা পায়। পরবর্তীতে এটি মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান এবং এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের ইতিহাস পুরনো হলেও ‘গ্যাং কালচার’ বা দলবদ্ধ সন্ত্রাসী সংস্কৃতির উত্থান খুব বেশি দিনের নয়।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে এই সংস্কৃতির বীজ বপন হয়েছিল ১৯৯০ সালের শেষের দিকে। দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রসারের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে কিশোরদের মধ্যে দলবদ্ধ অবাধ্যতার চল শুরু হয়।
তবে এটি চরম এবং দৃশ্যমান সহিংস রূপ নেয় ২০১০ সালের পর থেকে। ২০১৭ সালে উত্তরার স্কুলছাত্র আদনান ইশতিয়াক হত্যাকাণ্ড দেশবাসীকে প্রথম জানান দেয় যে, পাড়ার কিশোরদের এই আড্ডাগুলো আসলে এক একটি মরণফাঁদ বা খুনে বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমানে পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে কয়েকশত কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে এবং এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সমাজবিজ্ঞান এবং অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এই দলগুলোকে ‘কিশোর গ্যাং’ বলার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে:
১. এই দলগুলোর মূল চালিকাশক্তি বা সদস্যদের বয়স সাধারণত ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে থাকা ছেলেরাই এর প্রধান অংশ, যা আইনি ও সামাজিকভাবে ‘কিশোর’ বা ‘নাবালক’ হিসেবে চিহ্নিত।
২. সাধারণ অপরাধীরা একা অপরাধ করতে পছন্দ করলেও, এরা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। এদের নিজস্ব নাম (যেমন: নাইন এমএম, ডিসকো বয়েজ, ব্লেড গ্যাং ইত্যাদি), নির্দিষ্ট পোশাক, চুলের স্টাইল এবং নিজস্ব এলাকা বা ‘টেরিটরি’ থাকে। দলের সবার সম্মতি ও শক্তিতে এরা অপরাধ ঘটায় বলেই একে ‘গ্যাং’ বলা হয়।
৩. এই বয়সে কিশোরদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম বা বীরত্ব প্রকাশের তাড়না থাকে। দল গঠন করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, বাইক মহড়া এবং শক্তির মহড়া দিয়ে নিজেদের জাহির করার মানসিকতা থেকেই ‘কিশোর গ্যাং’ নামের সার্থকতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং কালচার শুধু পারিবারিক উদাসীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ।
রাজনৈতিক ঢাল বা ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি: পাড়া-মহল্লার তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা নিজেদের স্বার্থে, মিছিলে লোক বাড়াতে বা এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে এই কিশোরদের অস্ত্র ও প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। এই ‘দায়মুক্তির’ আশ্বাস কিশোরদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার: টিকটক, লাইকি বা ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া, গ্যাংয়ের প্রচার চালানো এবং অন্য গ্রুপকে হুমকি দেওয়ার জন্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব: মা-বাবার সময়ের অভাব, পারিবারিক কলহ এবং নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়ের কারণে একাকীত্বে ভোগা কিশোরেরা সহজেই গ্যাংয়ের মোহে জড়িয়ে পড়ছে।
কিশোর গ্যাং আজ আর কোনো সাধারণ সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় আতঙ্ক। শুধুমাত্র জেল-জরিমানা বা পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে সেদিকে মা-বাবার কড়া নজরদারি রাখা। এরপর প্রয়োজন সুস্থ বিনোদন। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, কিশোর ক্লাব এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা যাতে তরুণদের শক্তি ইতিবাচক দিকে পরিচালিত হয়। সবশেষ যেটা দরকারি, সেটা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কিশোরদের অপরাধের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতা বা ‘বড় ভাইদের’ চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।









