বাবার সঙ্গে প্রায় চার বছর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ডের তিন শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়েছে দেশটির সরকার। এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার কারণে তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন বলেন, শিশুদের উদ্ধারে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এসব ব্যর্থতার কারণে শিশুদের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, তার জন্য সরকার দুঃখিত।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে টম ফিলিপস তার পাঁচ, সাত ও আট বছর বয়সী তিন সন্তানকে নিয়ে জঙ্গলে চলে যান। এর আগেও সন্তানদের নিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি। তবে এবার প্রায় চার বছর তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সাবেক হাইকোর্ট বিচারপতি সাইমন মুরের নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্তে বলা হয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ না থাকার একটি ‘ভুল ধারণার’ কারণে পুলিশ শুরুতে তাদের খোঁজে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের মা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্রের নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অনেক সময় পারিবারিক বিরোধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
ফিলিপস গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডের ছোট শহর পিওপিওতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এরপর থেকে তিন শিশু কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে।
পুলিশ পরে ফিলিপস ও তার সন্তানরা যেখানে লুকিয়ে থাকতেন বলে ধারণা করা হয়, এমন কয়েকটি অগোছালো শিবিরের ছবি প্রকাশ করে। এসব স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিয়ারের ক্যান পাওয়া যায়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ফিলিপস পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সন্তানদের ছাড়াই মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। সে সময় তার মা তাকে ১ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার নগদ অর্থ ও খাবার দেন।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের আগস্টে ওয়াইকাটো অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কেনাকাটা করেন ফিলিপস। ওই একদিনে খাবার, শিশুদের পোশাক, বাগানের সরঞ্জাম, মাছ ধরার সরঞ্জাম, ছুরি ও লাইটারসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে প্রায় ৬ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার খরচ করেছিলেন তিনি।
শিশুদের মায়ের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী লাক্সন। তিনি বলেন, চার বছর জঙ্গলে থাকার পুরো প্রক্রিয়ায় শিশু ও তাদের পরিবারকে ‘ব্যর্থতার শিকার’ হতে হয়েছে।
সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী লুইস আপটন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে, শিশুদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সব বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়নি। এ জন্য সরকার গভীরভাবে দুঃখিত।
তিনি বলেন, শিশুরা চার বছর ‘অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে’ কাটিয়েছে। এর ফলে তারা স্বাভাবিক ও সুস্থ শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তদন্তে পুলিশ, শিশু সুরক্ষা সংস্থা অরাঙ্গা তামারিকি, প্রতিরক্ষা বাহিনী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের উপকমিশনার জিল রজার্সও পুলিশের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তদন্তে যেসব সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কথা উঠে এসেছে, সেগুলো সত্য। শিশুদের যে পরিবেশে থাকতে হয়েছে, তার ছবি দেখা ‘হৃদয়বিদারক’।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় আরও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত শিশুদের উদ্ধার করাই ছিল পুলিশের দায়িত্ব এবং তারা সেটি করতে পেরেছে।









