প্রিয় আমীরুল, তোমাকে নিয়ে এভাবে এত দ্রুত লিখতে হবে এটা ভাবিনি। তবু লিখতে হলো। তোমাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেক অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। কোনটা রেখে কোনটা লিখব! কত ঘটনাই তো ঘটেছে। স্মৃতির ঝাঁপি খুললে একটার পর একটা বের হতে থাকবে—
আমীরুলের সঙ্গে আমার কবে পরিচয় দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। তবে কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলা থেকেই সম্ভবত তার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে।
একটু চঞ্চল স্বভাবের ছেলে সে। গলার স্বর একটু উঁচু। যেখানেই যায় সেখানেই আড্ডা জমে যায়। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানে দেখা হতো।
তারপর যখন সে চ্যানেল আইতে জয়েন করল, তারপর থেকে আমাদের একই ছাদের নিচে দিনের অধিকাংশ সময় কেটেছে। তার লেখালেখির বাইরে চ্যানেল আইয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান একসঙ্গে পরিকল্পনা করেছি। তার দুরন্তপনায় অনেক অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। নতুন নতুন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ছিল তার মস্তিষ্কপ্রসূত। আমাদের দুজনের কেমিস্ট্রিও ঠিক মিলে যেত।
আমি মনে মনে যা ভাবছি আমীরুলও হয়তো তাই ভেবেছে। এই তো কয়েক দিন আগে চ্যানেল আইতে দুরন্ত দুপুর—নামে একটি নতুন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেছে আমীরুল। এই অনুষ্ঠানটি নিয়মিত উপস্থাপকের বাইরে বিভিন্ন উপস্থাপক উপস্থাপনা করবেন। ঠিক দুপুর ১২টা দশ মিনিটে শুরু হয় এই অনুষ্ঠানটি। এ ছাড়া রংতুলিতে মুক্তিযুদ্ধ, গান দিয়ে শুরুসহ কত অনুষ্ঠানের নেপথ্যে যে কাজ করেছে তার হিসাব নেই। আমীরুল আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আমার লেখালেখিরও অনুপ্রেরণাদাতা সে। অনেক সময় আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে বই প্রকাশের ব্যবস্থা আমীরুলই করেছে। আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে উৎসাহ দিয়েছে। সমম্প্রতি শতাধিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আমার লেখা ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটি প্রকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কখনো কোনো কাজে তার না ছিল না। সারা দিন কাজের ভেতর ডুবে থাকতেই ভালোবাসত।
একদিন আমীরুল যখন অফিস থেকে বের হলো তখন কয়েকবার আমাকে বলল, আমার পকেটে একটা টাকাও নেই। হয় অফিসের একটা গাড়ি পেতে হবে নাহলে হেঁটে হেঁটেই বাংলা একাডেমির বইমেলায় যেতে হবে।
আমি বললাম, তুমি হেঁটে হেঁটে চলে যাবে বাংলা একাডেমিতে?
কী করব বস। আমার পকেট তো আপনার পকেটই। টাকা যদি দেন তাহলে একটা সিএনজি নিয়ে নেব।
তোমার গাড়ি কোথায়?
কী যে বলেন বস, এই ভিড়ের মধ্যে গাড়ি কেমনে নিয়ে যাব। বাসই ভরসা।
আমি বললাম, ঠিক আছে তুমি সেটাই চেষ্টা করো। হাঁটলে শরীর একটু ভালো থাকবে।
সেদিন আমীরুলের মুখটা একটু গম্ভীর হলো। চুপ করে চলে গেল। এরও বেশ কিছুক্ষণ পরে আমি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলায় গেলাম। গিয়ে দেখি আমীরুল গোল হয়ে কয়েকজন লেখককে নিয়ে বসে আছে। সেখানের অনেককেই আমি চিনি। উঠতি ছড়াকার, নামি ছড়াকার, দামি ছড়াকার, বয়স্ক প্রবন্ধকার—সেখানে দেখলাম ছড়াকার আলম তালুকদার, আসলাম সানী, মাহবুব রেজা, সুজন বড়ুয়া, রহীম শাহ, আবু হাসান শাহরিয়ার, কামরুল হাসান, আহমাদ মাযহার, লুৎফর রহমান রিটন, ওবায়দুল গণি চন্দন, আনজীর লিটন, সারওয়ার উল ইসলাম, ইমরান পরশ আরো অনেকে। সবাই মিলে দিব্বি গোল হয়ে বসে ফুচকা খাচ্ছে।
আমি বললাম, ব্যাপারটা কি আমীরুল!
আমীরুল বলল, কই কোনো ব্যাপার নাই তো। সে বলল, সবাই বসকে ধন্যবাদ দাও। বস তোমাদের ফুচকা খাওয়াচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে উঠল। কেউ কেউ আমার নাম ধরে ধন্যবাদ দিচ্ছে।
আমি বললাম, এর মানে? আমি তো ফুচকা খাওয়াচ্ছি না। ফুচকা তো খাওয়াচ্ছে আমীরুল।
হ্যাঁ, সেটা ঠিক আমীরুলই অর্ডার দিয়েছে।
আমি বললাম, আমীরুল, তুমি বলে এলে তোমার কাছে একটা টাকাও নেই। আর তুমি এতগুলো লোককে ফুচকা খাওয়াচ্ছ!
বস, আজকে টাকা ছিল না, কালকে আপনার পকেট থেকেই আসবে, সমস্যা কী! ফুচকাওয়ালার কানে কানে বলেছি, আজ টাকা নেই। কাল বা পরশু পাইবা মিয়া। কাল বা পরশু তো পকেটে টাকা আইবই। রেগুলারই তো খাই ওর কাছ থেকে।
এই হলো আমীরুল। পকেটে টাকা থাক বা না থাক, বন্ধুবান্ধব শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে আড্ডা জমাবেই।
আমীরুল মানেই হইচই আড্ডাবাজি। আমীরুল মানেই কথার ফুলঝুরি। সেটা খাবার টেবিলে হোক কিংবা মাটিতে বসে হোক, হইহই করে বইমেলায় আমীরুলের আড্ডা হবেই। এই আড্ডা অনেক বছরের। বইমেলার সেই প্রথম থেকেই এই আড্ডা চলে আসছে। আগে বাংলা একাডেমির পুকুরপারে লেখককুঞ্জ তৈরি হতো। সেখানে কিংবা বর্ধমান হাউসের সিঁড়িতে বসে আড্ডা, গল্প, হইচই চলত।
যেকোনো একটা বই নিয়ে হইচই করা, ভালো কোনো বই হলে লেখককে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানানো, ভাই যা লিখেছেন এ বছর, ফাটায়া দিছেন। আবার কারো লেখা ভালো না লাগলে, কি মিয়া এটা কি লিখছ? বইমেলায় আসার বই হলো এইডা? প্রকাশের আগে সবাইকে দেখানো উচিত ছিল না? আবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কেউ এসে সালাম করলে বলত, আরে মিয়া, সালাম করো কেন? সালাম করলে মনে হয় বয়স বাইড়া গেছে। ছেলেটা থতমত খেয়ে যায়। আমীরুল আবার জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন ব্যাচের? আচ্ছা, ওই যে অমুক। আরেকজন বন্ধুর নাম বলে দেয়। অসম্ভব স্মরণশক্তি আমীরুলের। এই স্মরণশক্তির জোরেই সে যে কতকিছু বলতে পারে, করতে পারে। এমন কোনো দিক নেই, যে দিকটা সম্পর্কে আমীরুল বলতে পারে না। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে একটা ছাতিমগাছ আছে। ঢাকা শহরে দুটি ছাতিমগাছ আছে। একটি বলধা গার্ডেনে, আরেকটি চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। আমীরুলকে যদি জিজ্ঞেস করি, এই ছাতিমগাছ সম্পর্কে কিছু বলো। সে বলতে শুরু করবে, এই ছাতিমগাছ এসেছিল অমুক বাদশার আমলে। বাদশা ছাতিমগাছ পছন্দ করতেন। তার পাতা এ রকম, ডালপালা এ রকম।
আমি যদি অন্য রকম বর্ণনা দিই; কিন্তু আমীরুল ঠিকই তার মতো করে বর্ণনা দিয়ে যাবে। গোলাপ ফুল দেখে যদি বলি, আমীরুল, গোলাপ ফুল কত রঙের হয়? সে ত্বরিত গতিতে জবাব দেবে, বাংলাদেশে বেশি রঙের হয় না; কিন্তু পৃথিবীতে গোলাপ ফুল অনেক রঙের আছে—বলেই রঙের বর্ণনা দিয়ে যাবে। কালো গোলাপ যে রয়েছে, তাও বলতে ভুলবে না। একপ্রকার গোলাপ রয়েছে, যার কাঁটা নেই। এক প্রকার গোলাপ রয়েছে, যার গন্ধ অন্যরকম—মানে গোলাপ ফুল নিয়ে অন্তত পনেরো মিনিট বক্তব্য শোনাবে। আবার একই সঙ্গে তাকে যদি রবীন্দ্রসাহিত্যের কঠিন একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করি যে এই শব্দটার মানে কী? তাহলে সে দ্রুত গতিতে জবাব দিয়ে দেবে। কিংবা রবীন্দ্রনাথের কবিতার কোনো কোড বা উপন্যাসের কোড প্রতিটি বিষয়েই তার উত্তর থাকবেই। হেন বিষয় নেই যে সে জানে না। শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, শরত্চন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন সবার সম্পর্কেই তার জানা। কল্লোল যুগের কারো সম্পর্কে যদি জানতে চাই, তাহলেও সে অনায়াসে বর্ণনা করে যাবে। তাকে যদি বলা হয়, এখনকার সময়ে কারা ভালো লিখছে। কবিতা, ছড়া, গল্প উপন্যাস যেকোনো বিষয় বললেই বলে দেবে, এই লেখক ভালো লিখছে। তাদের লেখা সম্পর্কে যদি জিজ্ঞেস করি তাহলে গড়গড় করে কতগুলো নাম শুনিয়ে দেবে। ঢাকায় কবে কোথায় কোন সাহিত্য সভা হচ্ছে বা হয়ে গেছে সেখানকার বিশেষত্ব কী! তাও তাঁর নখদর্পণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন কি না সেটাও জানিয়ে দেবে। আমি রবীন্দ্রনাথের কথা বেশি বলছি এ জন্য যে আমীরুল আর দশজন বাঙালির মতোই রবীন্দ্রচর্চা করে প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের বই প্রায় প্রতিদিনই সে ঘাঁটাঘাঁটি করে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের গান প্রতিদিনই শোনে। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা তার অত্যন্ত প্রিয়। তিন শতাধিক বই লিখেছে আমীরুল। সম্প্রতি শিশুসাহিত্যের আলোছায়া এবং শিশুসাহিত্যের চেনা-অচেনা নামে দুই খণ্ডে লিখেছে শিশুসাহিত্যিকদের নিয়ে। এটি আমাদের শিশুসাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আশা করছি।
চ্যানেল আইতে কাজ করতে গিয়ে আমীরুলের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জমা হয়েছে। সেসব লিখে শেষ করা যাবে না। লিখতে গেলে কলম থেমে যায়, ভিজে যায় চোখ। কয়েক দিন ধরেই আমীরুল আইসিইউতে ছিল। আবার শুনলাম তাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আমীরুলের সঙ্গে হাসপাতালের একটা নিয়মিত সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তাই আমি এতটা শঙ্কিত ছিলাম না। ভেবেছি বরাবরের মতোই আমীরুল ফিরে আসবে। কিন্তু সে যে এবার আর ফিরবে না, সেটা ভাবতে পারিনি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে আমীরুল, এটা বুঝতে পেরেছিলাম। হাসপাতাল থেকে যখন মেসেজ এলো তখন মধ্যরাত। সবাইকে জানালাম। মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। সত্যি সত্যি আমীরুল চলে গেল! যাবার আগে তো কিছুই বলে গেল না। মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আমীরুল নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে। এখন আর কোনো তাড়া নেই তার। চ্যানেল আইতে এসে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করার কোনো তোড়জোড় নেই। আমীরুল, তুমি ঘুমাও। তোমার কাছে চিঠি লেখা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সেটা তোমার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না। তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









