এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের আলোচনায় সমঝোতা না হওয়ায় কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডাও। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) ভোরে নতুন শুল্ক কার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর রপ্তানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৫ শতাংশ প্রভাবিত হবে। এসব পণ্যের মধ্যে হকি স্টিক থেকে শুরু করে চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিহ্বা পরীক্ষার কাঠি পর্যন্ত রয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের শ্রমিক ও ব্যবসাগুলোকে সুরক্ষা দিতে কানাডা ডলারের বিপরীতে ডলার সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে।
কানাডার পাল্টা শুল্কের ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কানাডা ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর আরোপিত মার্কিন শুল্কে ছাড় চেয়েছিল। তবে ওয়াশিংটন এসব বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়নি।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, কানাডা চলতি সপ্তাহের শুরুতে যে শর্তগুলোতে সমঝোতা হয়েছিল, সেগুলোর ভিত্তিতে চুক্তি চূড়ান্ত করতে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নি।
তার দাবি, কানাডার নতুন কিছু দাবি এবং আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে কয়েক দিনের আলোচনায় তৈরি হওয়া সমঝোতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
তবে আলোচনার ভাঙনের জন্য ওয়াশিংটনকেই দায়ী করেছেন কার্নি। তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তে পরিবর্তন ছিল অন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। এসব পরিবর্তন যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এর পরই তিনি আলোচনা স্থগিত করে কানাডার আলোচনাকারী দলকে অটোয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দেন।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা পরস্পরের মধ্যে প্রায় ৮৮০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা বেচাকেনা করেছে। ফলে নতুন শুল্কের অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে শুল্ক কার্যকরের কথা ছিল। তবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে ট্রাম্প সময়সীমা আরও তিন দিন বাড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ওই সময়ের মধ্যেও দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
কার্নি বলেন, আলোচনার শুরু থেকেই কানাডার লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে ভালো চুক্তি নিশ্চিত করা। তবে যেকোনো মূল্য বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চুক্তি করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বিরোধ রয়েছে। কানাডার সফটউড কাঠ আমদানি এবং দেশটির সুরক্ষিত দুগ্ধবাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বহু বছর ধরে টানাপোড়েন চলছে।
তারপরও দুই দেশ দীর্ঘদিন বন্ধু, মিত্র ও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কানাডার সেনারাও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।
দুই দেশের ৫ হাজার ৫২৫ মাইল দীর্ঘ সীমান্তে কোনো সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এবং ২০০ কোটি ডলারের পণ্য সীমান্ত পারাপার হয়। প্রায় ৮ লাখ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।
তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ঐতিহ্যগতভাবে সহযোগিতামূলক এই সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য দেখিয়ে কানাডীয় পণ্যে শুল্ক আরোপের পাশাপাশি ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন।
কার্নি বলেন, কানাডা বুঝতে পেরেছে যে ‘আমেরিকা বদলে গেছে’ এবং দুই দেশ আর আগের সম্পর্কের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
ট্রাম্পের নীতিতে কানাডার জনগণের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রাকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের দাবিতে করা একটি আবেদনে ২১ জুলাই থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার স্বাক্ষর পড়েছে।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে রাষ্ট্রদূত স্বাভাবিক করে তুলেছেন।
গত বছর কানাডার মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। ফলে নতুন মার্কিন শুল্ক কানাডার অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রশাসনও বড় ধরনের শুল্ক নিয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কারণ আমদানিকারকরা শুল্কের বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
মার্কিন সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা ও আইনজীবী রায়ান মাজেরাস বলেন, কানাডা হয়তো নির্দিষ্ট কিছু খাতে আরও বেশি ছাড় চেয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র দিতে রাজি হয়নি। অথবা কানাডার দেওয়া ছাড় ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথেষ্ট ছিল না।
তার মতে, আগামী দিনগুলোতে দুই পক্ষের ওপরই আবার আলোচনায় ফেরার ব্যাপক চাপ তৈরি হবে। তবে কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সমঝোতার পথ আরও কঠিন হয়ে গেছে।
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যান্ডেস লেইং নতুন শুল্ককে ‘উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর বড় আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এতে মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে এবং কানাডার ক্রেতা, বিনিয়োগ ও ছোট ব্যবসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শুল্ককে ব্যবহার করছেন। গত বছর প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর দুই অঙ্কের শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
তবে ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ওই শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। আদালত শুল্ক বাতিল করে এবং আমদানিকারকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পথ তৈরি করে।
এরপর নতুন আইনি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন।
কানাডার ক্ষেত্রে ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারার আওতায় কানাডার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
প্রায় এক শতাব্দী আগে মহামন্দার সময় পাস হওয়া এই আইন ‘স্মুট-হাওলি ট্যারিফ’ নামে পরিচিত। বিশ্ব বাণিজ্য সীমিত করা এবং মহামন্দাকে আরও গভীর করার জন্য অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদদের কাছে আইনটি বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত।
আইনের ৩৩৮ ধারা আগে কখনো শুল্ক আরোপে ব্যবহার করা হয়নি। এতে মার্কিন ব্যবসার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের জন্য আলাদা তদন্তেরও প্রয়োজন নেই এবং কতদিন তা কার্যকর থাকবে, তারও নির্দিষ্ট সীমা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বর্তমানে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে পুরোনো চুক্তির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএ করেন এবং একসময় এটিকে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মেক্সিকোর সঙ্গে চুক্তি সংশোধন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে। তবে কানাডার সঙ্গে এখনো আলোচনা শুরু হয়নি। নতুন করে বাণিজ্য সংঘাত বাড়ায় ভবিষ্যতে সেই আলোচনা আদৌ শুরু হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্ক ল স্কুলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ল-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্যারি অ্যাপলটন বলেন, কানাডা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছিল, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে তারা আলোচনা বন্ধ করে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।
তার মতে, এখন দুই পক্ষই প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান কঠোরভাবে ঘোষণা করেছে। ফলে বাণিজ্য সংঘাত আরও বাড়তে না দেওয়ার জন্য সমঝোতার পথ খুঁজে পাওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।









