ইতিহাসে কিছু চুক্তি কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কাগজে-কলমে স্বাক্ষরিত সমঝোতা হয়ে থাকে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো একটি জাতির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের অংশ হয়ে ওঠে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তি তার একটি বড় উদাহরণ। পরাজিত জার্মানির ওপর ক্ষতিপূরণ, ভূখণ্ড হারানো, সামরিক সীমাবদ্ধতা এবং নানা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। চুক্তিটি জার্মান সমাজে অপমান ও ক্ষোভের অনুভূতি তৈরি করেছিল যদিও পরবর্তীতে জার্মান অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে ১৯২৩ সালের ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির পেছনে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রুহর সংকটসহ একাধিক কারণ কাজ করেছিল।
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির অর্থ শুধু তার আইনি ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি চুক্তি জনগণের কাছে কীভাবে প্রতিভাত হচ্ছে, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘পারস্পরিক বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি’ নামে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট মান ও সনদ গ্রহণের বিষয়ও রয়েছে। বাংলাদেশকে শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব, ডিজিটাল বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক আচরণ এবং তৃতীয় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯ শতাংশ পারস্পরিক আমদানি শুল্ক বজায় রাখবে, যদিও নির্দিষ্ট কিছু পণ্য এর বাইরে থাকবে। অর্থাৎ দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকারের কাঠামোকে নিছক ‘সমান শর্তের বাণিজ্য’ হিসেবে দেখলেই পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না; চুক্তির বিভিন্ন ধারায় দুই দেশের অঙ্গীকারের ধরনও ভিন্ন।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার বাণিজ্যনীতি নির্ধারণ করবে কীভাবে? কোন দেশ থেকে কী আমদানি করবে, কোন দেশে কী রপ্তানি করবে, কোন পণ্যের ওপর কী শুল্ক আরোপ করবে এসব সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হয়। কিন্তু সেই অঙ্গীকার যদি ভবিষ্যৎ সরকারের নীতিনির্ধারণের পরিসরকে অতিরিক্ত সংকুচিত করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই চুক্তির বিনিময়ে আমরা কী পেলাম এবং কী কী ছাড় দিলাম?
বিশেষ করে চুক্তির ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সমন্বয়’ বা তৃতীয় দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমন্বয়ের বিষয়টি জনপরিসরে আরও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। চুক্তিতে দুই দেশ সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো, তৃতীয় দেশের ‘অন্যায্য বাণিজ্যনীতি’ মোকাবিলায় পরিপূরক পদক্ষেপ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের কথা বলেছে। এসব ধারা বাংলাদেশের জন্য বাস্তবে কী অর্থ বহন করবে তা কেবল কূটনৈতিক ভাষ্যে নয়, অর্থনীতির বাস্তবতায় ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্যসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের বৈদেশিক সরবরাহের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। আবার তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু খাতে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি রপ্তানি। ফলে কোনো একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে ‘আমেরিকা বনাম অন্য দেশ’ এমন সরল দ্বন্দ্ব তৈরি করা সমাধান নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি কি নিজের অর্থনৈতিক প্রয়োজন, বাজারের বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারছে?
ভার্সাইয়ের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির তুলনাও তাই সাবধানে করতে হবে। দুই চুক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়। ভার্সাই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানির ওপর আরোপিত শান্তিচুক্তি; বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চুক্তি একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা, যেখানে দুই দেশই নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সুতরাং একটিকে আরেকটির হুবহু পুনরাবৃত্তি বলা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। তবু উপমাটির একটি রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে।
যে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকের কাছে যদি মনে হয় তার দেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বাইরের শক্তির প্রভাব বাড়ছে কিংবা চুক্তির সুফল ও দায়ভার সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না তাহলে সেখানে জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
জার্মানির ইতিহাস দেখিয়েছে, পরাজয় ও অপমানের স্মৃতি কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই ইতিহাসের আরেকটি ভয়াবহ শিক্ষা ভুলে গেলে চলবে না আত্মমর্যাদার ক্ষোভ যখন যুক্তিবাদী গণতান্ত্রিক রাজনীতির বদলে উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়, তখন তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ক্ষোভ নয়, সচেতনতা; আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা; বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, মর্যাদাপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক। চুক্তি বাতিল হবে কি না, সংশোধন প্রয়োজন কি না, নাকি বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব-এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, চুক্তির প্রতিটি ধারা, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বাস্তব প্রয়োগের ফলাফল বিশ্লেষণ করেই হওয়া উচিত।
সবচেয়ে জরুরি হলো, জনগণ যেন জানতে পারে চুক্তিতে কী আছে, বাংলাদেশ কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এর অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব কী। কারণ আন্তর্জাতিক চুক্তির শক্তি শুধু রাষ্ট্রের স্বাক্ষরে নয়; তার স্থায়িত্বের ভিত্তি জনগণের আস্থা। আজ তাই প্রশ্নটি কেবল ‘চুক্তিটি ভালো না খারাপ’ এমন সরল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন আরও গভীর: বাংলাদেশ কি তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক এমনভাবে সাজাতে পারছে, যেখানে সহযোগিতা থাকবে, বাজার থাকবে, বিনিয়োগ থাকবে কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকবে?
ইতিহাসের শিক্ষা যদি কিছু হয়ে থাকে, তা হলো একটি জাতির আত্মমর্যাদাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামো স্থায়ী করা কঠিন। সেই আত্মমর্যাদার প্রকাশ যেন যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথেই ঘটে এটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









