আজকের দিনটি অন্য দিনের তুলনায় একটু আলাদা। কারণ আজ পৃথিবীর সব জায়গায় দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়ে আসে। পৃথিবীর কক্ষপথে এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। এই ঘটনাকে বলা হয় বিষুব বা ইকুইনক্স।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী এই বিষুব ঘটছে সকাল ৬টা ৫ মিনিটে। তবে ‘দিন-রাত সমান’ কথাটি শুনে মনে হতে পারে ঠিক ১২ ঘণ্টা দিন ও ১২ ঘণ্টা রাত হবে। বাস্তবে বিষয়টি একটু ভিন্ন। ঢাকায় আজ সূর্যোদয় প্রায় সকাল ৫টা ৪৭ মিনিটে এবং সূর্যাস্ত প্রায় বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিটে; অর্থাৎ দিনের আলো থাকবে প্রায় ১২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড।
বিষুব কী?
বছরে এমন দুটি সময় আসে যখন পৃথিবীর দুই গোলার্ধ সূর্যের আলো প্রায় সমানভাবে পায়। এই সময় পৃথিবীর বিষুবরেখার ওপর সূর্যের আলো প্রায় সরাসরি পড়ে। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য অনেকটাই কমে যায়।
বছরে সাধারণত দুটি বিষুব হয়। একটি মার্চে, অন্যটি সেপ্টেম্বরে। মার্চের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে বসন্ত এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎ শুরু হয়। আবার সেপ্টেম্বরের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে শরৎ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত ঋতু শুরু হয়।

কেন দিন-রাত প্রায় সমান হয়?
পৃথিবী তার কক্ষপথের সঙ্গে পুরোপুরি সোজা অবস্থায় ঘোরে না। এর ঘূর্ণন অক্ষ প্রায় ২৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি হেলে আছে। এই হেলে থাকার কারণেই বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সূর্যের আলো পাওয়ার পরিমাণ বদলায়। কখনো উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে, কখনো দক্ষিণ গোলার্ধ। কিন্তু বিষুবের সময় পৃথিবীর অবস্থান এমন হয় যে সূর্যের আলো বিষুবরেখার ওপর প্রায় সরাসরি পড়ে। ফলে দুই গোলার্ধে দিনের আলো ও রাতের সময়ের ব্যবধান অনেকটা কমে আসে।
তাহলে ঠিক ১২ ঘণ্টা দিন-রাত হয় না কেন?
এখানেই রয়েছে মজার বিষয়। ‘ইকুইনক্স’ শব্দটির অর্থ সমান অর্থাৎ দিন ও রাত প্রায় সমান। কিন্তু বাস্তবে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হিসাব করার পদ্ধতির কারণে দিন-রাত ঠিক ১২ ঘণ্টা করে হয় না।

আমরা সাধারণত সূর্যোদয় বলতে সূর্যের ওপরের প্রান্ত দিগন্তে ওঠাকে এবং সূর্যাস্ত বলতে ওপরের প্রান্তটি দিগন্তের নিচে চলে যাওয়াকে বুঝি। পাশাপাশি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে কিছুটা বাঁকিয়ে দেয়। ফলে সূর্য প্রকৃত অবস্থানের তুলনায় একটু আগে উঠেছে বা একটু পরে অস্ত গেছে বলে মনে হয়। এই কারণে বিষুবের দিনেও অনেক জায়গায় দিনের আলো ঠিক ১২ ঘণ্টা থাকে না।
এছাড়া সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সূর্যের ওপরের প্রান্তকে বিবেচনা করা হয়। তাই বিষুবের দিনেও দিনের দৈর্ঘ্য অনেক জায়গায় ১২ ঘণ্টার চেয়ে সামান্য বেশি হতে পারে। ঢাকার ক্ষেত্রেও আজ ঠিক সেটিই দেখা যাচ্ছে।
আজকের পর যেসব পরিবর্তন হবে
সেপ্টেম্বরের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং রাত দীর্ঘ হতে থাকে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে সামনে সূর্যের আলো পাওয়ার সময় ক্রমশ কমবে।
ঢাকার হিসাবেও সেই পরিবর্তন দেখা যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড থাকলেও পরদিন তা প্রায় ১২ ঘণ্টা ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ডে নেমে আসে। এরপর প্রতিদিনই দিনের দৈর্ঘ্য আরও কিছুটা করে কমতে থাকে।
পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও বিষুব সরাসরি যুক্ত
পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় তার অক্ষের হেলানো অবস্থান বজায় রাখে। ফলে বছরের একেক সময়ে সূর্যের আলো একেক গোলার্ধে বেশি পড়ে। মার্চ ও সেপ্টেম্বরের বিষুবের সময় সেই পার্থক্য সবচেয়ে কমে আসে। তাই বিষুব শুধু দিন-রাতের হিসাবের বিষয় নয়, এটি সরাসরি যুক্ত।
আমরা প্রতিদিন সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখি, কিন্তু পৃথিবীর মহাজাগতিক গতির কারণে সেই সময়ের হিসাব প্রতিদিনই একটু একটু করে বদলাচ্ছে। আজকের প্রায় সমান দিন-রাতও সেই বিশাল মহাজাগতিক ছন্দেরই একটি অংশ।
ফলে পৃথিবী তার কক্ষপথে ছুটতে ছুটতে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সূর্যের আলো উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধকে প্রায় সমানভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
বদলাবে আপনার দিনের রুটিনও
সেপ্টেম্বর বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এবং রাত দীর্ঘ হতে থাকবে। ঢাকাতেও সেই পরিবর্তন প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়ে দেখা যাবে। অর্থাৎ আজকের প্রায় সমান দিন-রাত আসলে একটি পরিবর্তনের সূচনা। প্রকৃতি ধীরে ধীরে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে-আলোর সময় কমছে, রাতের সময় বাড়ছে।
তাই আজকের দিনটি শুধু ‘দিন-রাত প্রায় সমান’ হওয়ার জন্যই বিশেষ নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়-পৃথিবীর মতো আমাদের জীবনেও ভারসাম্য জরুরি। কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম, ব্যস্ততার পাশাপাশি নিজের জন্য সময়, আর স্ক্রিনের পাশাপাশি একটু প্রকৃতির আলো গ্রহণ করে জীবনযাত্রাকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।









