ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুহেসতাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্ত দাবি করেছে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংগঠনটির দাবি, হামলায় অন্তত চারজন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বুধবার ২ সেপ্টেম্বর আইসিসিতে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট জানায়, বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলটি বেসামরিক মানুষের স্থান হওয়ায় হামলার ঘটনায় ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর তদন্ত’ হওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনটি জানায়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হামলাটি চালানো হয়। নিহত চারজনের মধ্যে দুই নারী ও দুই শিশু রয়েছে। শিশু দুটির বয়স ৪ ও ১৬ বছর। আহতদের বেশির ভাগও নারী ও শিশু বলে জানিয়েছেন ইরানের এক কর্মকর্তা।
রেড ক্রিসেন্টের মতে, এই হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক মানুষ বা বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো নিষিদ্ধ। একইভাবে কোনো হামলায় বেসামরিক মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও তা চালানো নিষিদ্ধ।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হামলার খবর সম্পর্কে তারা অবগত। তবে তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
ওয়াশিংটনের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইরাক ও আফগানিস্তানে বেসামরিক মানুষের ওপর অতীতের মার্কিন হামলার কথা উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বাস্তবতা এতটাই ভয়াবহ যে মার্কিন প্রচারমাধ্যমও সেন্টকমের বর্তমান দাবি করার সাহস কখনো করেনি। তিনি বলেন, ‘সিরিক কোনো গল্প নয়। বেসামরিক মানুষ বাস্তব। নিহতরাও বাস্তব।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো দেশই আইসিসির রোম সংবিধির সদস্য নয়। তবে মানবাধিকার সংগঠন ডন জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময় থেকে ইরানের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে আইসিসির বিশেষ এখতিয়ার গ্রহণের সুযোগ দেশটির রয়েছে। সংগঠনটির মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় থেকে এমন ঘোষণা দিলে ইরানের ভূখণ্ডে সংঘটিত প্রতিটি হামলার বিষয়ে আইসিসি এখতিয়ার পেতে পারে।
কুহেসতাকে হামলাটি এমন সময় হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান ওই জলপথে মার্কিন সেনা ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবারের হামলাগুলোতে অন্তত ১৮ জন নিহত ও ১৪২ জন আহত হয়েছেন।
কুহেসতাকের হামলার নিন্দা জানাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি গোলামহোসেইন দারজি।
তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতির গুরুতর লঙ্ঘন এবং এটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া যুদ্ধের প্রথম ধাপে অন্তত ৩ হাজার ৪৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এরপর ২৭ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার সংঘাতে আরও ৫৯ জন নিহত ও ৬৬৬ জন আহত হন।
যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলাকে বেসামরিক হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে ইরান। ওই হামলায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জন শিশু ছিল। একই দিনে লামার্দের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে পৃথক হামলায় চার শিশুসহ ২১ জন নিহত হন।
ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে তেল ও গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি মজুতকেন্দ্র, ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা, বিমানবন্দর, বন্দর, সেতু, বিদ্যুৎ স্থাপনা, চিকিৎসাকেন্দ্র ও পানি সরবরাহ অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।









