একসময় সকাল হলেই বাগেরহাট সদর উপজেলার তালেশ্বর কুমারপাড়ায় শোনা যেত মাটির চাকায় ঘোরার শব্দ। বাড়ির উঠানে সারি সারি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, সরা, মটকা ও ফুলের টব শুকাত রোদে। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই মিলে মাটি দিয়ে তৈরি করতেন নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। সেই মাটির চাকার সঙ্গে ঘুরত শত শত পরিবারের জীবন-জীবিকা।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চিত্র। মানুষের ঘরে জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক, মেলামাইন, অ্যালুমিনিয়ামসহ নানা আধুনিক পণ্য। কমেছে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার। পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদন খরচ, কমেছে লাভ। ফলে একসময় জমজমাট থাকা তালেশ্বর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, একসময় তালেশ্বর কুমারপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১৫ পরিবারে। অনেকে পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন। যারা এখনও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন, তাদের চোখেমুখে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে তালেশ্বর কুমারপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি বাড়িতে এখনও মাটির কাজ চলছে। কেউ চাকায় মাটি তুলে থালা-বাটি বানাচ্ছেন, কেউ তৈরি করা পণ্য রোদে শুকাচ্ছেন। আবার কেউ আগুনে পুড়িয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করছেন। তবে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই। অনেক বাড়ির মাটির চাকা পড়ে আছে একপাশে।
প্রবীণ মৃৎশিল্পী রবিন পাল বলেন, ‘আগের মতো আর মাটির জিনিস চলে না। আগে প্লাস্টিক আর অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য এত বেশি ছিল না। তখন মাটির কলসি, হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মটকা সবকিছুরই ভালো চাহিদা ছিল। এখন বাজার প্লাস্টিক-অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যে ভরে গেছে। দামও কম। তাই মানুষ সেগুলোই বেশি ব্যবহার করছে।’
তিনি বলেন, প্রথমে মাটি সংগ্রহ করতে হয়। এরপর সেই মাটি প্রস্তুত করে চাকায় বসিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হয়। পরে রোদে শুকানো, রঙ করা এবং আগুনে পোড়ানোর পর বাজারে নিতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াতেই অনেক শ্রম দিতে হয়।
রবিন পাল বলেন, ‘মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ করে কাজ করার পর লাভ থাকে মাত্র ৮ হাজার টাকার মতো। পরিবারের সবাই মিলে দিন-রাত পরিশ্রম করেও সংসারে তেমন কিছু থাকে না।’

অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটছে মৃৎশিল্পীদের। শিল্পী সুমন পাল বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা এই ব্যবসা এখনও কিছুটা ধরে রেখেছি। কামাল্লাসহ আশপাশের এলাকায় একসময় মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন আর তেমন নেই। তার ওপর মাটি থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বেড়েছে। কাজ করে এখন আর আগের মতো লাভ হয় না।’
মৃৎশিল্পী নমিতা রাণী পাল বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি। অন্য কোনো কাজও জানি না। অনেক কষ্ট করে জিনিস তৈরি করি। এরপর বিভিন্ন হাটে দোকান দিয়ে বসি। যা বিক্রি হয়, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছি।’
শুধু বাজার সংকট নয়, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবও মৃৎশিল্পীদের জন্য বড় সমস্যা। শিল্পী খগেন পাল বলেন, ‘বিদ্যুৎচালিত চাকা পেলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হতো। হাতে চালানো বড় চাকায় কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়। আমাদের এলাকায় কয়েকটি পরিবার বিদ্যুৎচালিত চাকায় কাজ করে। নতুন প্রজন্ম কষ্ট বেশি আর আয় কম দেখে এই কাজ শিখতে চায় না।’
এই শিল্পকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তুলতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলেও জানান তিনি।
তালেশ্বর গ্রামের দিপালী রানী প্রায় ৩০ বছর ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, আগের মতো মেলাতেও এখন বেচাকেনা হয় না। তবে ফুলদানি, ডিনার সেট, চায়ের কাপসহ সৌখিন মাটির পণ্যের কিছু চাহিদা রয়েছে। কিন্তু প্রচারের অভাবে সেগুলোও ভালোভাবে বিক্রি হচ্ছে না।
দিপালী রানী বলেন, ‘আমি এই পেশায় ৩০ বছর ধরে আছি। সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে অন্য পেশায় দিতে চাই। কারণ এই পেশার ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা অরিন্দম পাল বলেন, ‘মাটির তৈরি পণ্য একসময় আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। কালের বিবর্তনে এই শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও প্লাস্টিকের আধিপত্যে এই পণ্য হারিয়ে যাচ্ছে।’
মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা, কম সুদে ঋণ এবং পণ্য বাজারজাতকরণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও মেলামাইনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন।
এ বিষয়ে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, তালেশ্বর পালপাড়ায় এখনও কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্প ধরে রেখেছে। আধুনিকায়নের অভাবে অনেকে পেশাটি ছেড়ে দিচ্ছেন। তবে মাটির পণ্যের এখনও চাহিদা রয়েছে।
তিনি বলেন, শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে বিসিকের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ, ঋণ ও পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তার সুযোগ রয়েছে।
মৃৎশিল্পীরা জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় মাটির পণ্যের চাহিদা কমলেও ফুলদানি, চায়ের কাপ, ডিনার সেটসহ সৌখিন পণ্যের বাজার এখনও রয়েছে। আধুনিক নকশা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে এ শিল্পকে নতুন করে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে তালেশ্বর কুমারপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।









