২১ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৭। দিল্লীর আকাশে তখন বারুদের ধোঁয়া। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত। লাল কেল্লার যে সিংহাসন থেকে একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হতো, সেখানে তখন ব্রিটিশ বুটের শব্দ। ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী দিনে পরিণত হলো এই ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান ঘটল প্রায় তিনশত বছরের গৌরবময় মুঘল সাম্রাজ্যের। ব্রিটিশ বাহিনীর চাপের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন।
১৮৫৭ সালের মে মাসে মীরাটের সিপাহীরা যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিল্লীতে প্রবেশ করে, তখন তারা ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধ কবি-সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের সার্বভৌম শাসক ও বিদ্রোহের নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। বৃদ্ধ সম্রাট যুদ্ধ পরিচালনার জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত না থাকলেও, দেশের স্বাধীনতা এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। ফলে দিল্লী হয়ে ওঠে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র লড়াইয়ের পর ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটিশ বাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দিল্লী পুনর্দখলের জন্য মরিয়া আক্রমণ চালায়। একে একে দিল্লীর কাশ্মীরি গেটসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থান ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে দিল্লীর পতন যখন অবধারিত, তখন বৃদ্ধ সম্রাট তার পরিবারসহ লাল কেল্লা ত্যাগ করে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন।
২১ সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হাডসন একদল ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে হুমায়ুনের সমাধি ঘেরাও করে। সম্রাটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক হাকিম আহসানুল্লাহ খানের মধ্যস্থতায় হাডসনের কাছে সম্রাট একটি শর্ত পাঠান: যদি তার ও তার পরিবারের প্রাণ রক্ষা করা হয়, তবেই তিনি আত্মসমর্পণ করবেন। হাডসন সম্রাটের এই শর্ত মেনে নিয়ে তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। অবশেষে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, সাম্রাজ্য ও স্বাধীনতা হারানোর সীমাহীন বেদনা বুকে চেপে ক্যাপ্টেন হাডসনের সামনে আত্মসমর্পণ করেন জরাজীর্ণ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর।
ইতিহাসের নির্মমতা এখানেই শেষ হয়নি। আত্মসমর্পণের পরদিন, অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন হাডসন দিল্লির ‘খুনি দরওয়াজা’র সামনে সম্রাটের দুই পুত্র মির্জা মুঘল ও মির্জা খিজির সুলতান এবং পৌত্র মির্জা আবু বকরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বলা হয়ে থাকে, শাহজাদাদের কাটা মাথা থালায় সাজিয়ে বন্দি সম্রাটের সামনে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
আত্মসমর্পণের পর ব্রিটিশরা সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব ও প্রহসনমূলক বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৮৫৮ সালের ২৭ জানুয়ারি লাল কেল্লার ঐতিহাসিক ‘দিওয়ান-ই-খাস’-এ এই বিচার কাজ শুরু হয়, যা দীর্ঘ দুই মাস ধরে চলে। যে লাল কেল্লা একসময় মুঘল ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল, সেখানেই একজন স্বাধীন সম্রাটকে বন্দি হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক কমিশন সম্রাটের বিরুদ্ধে মূলত কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়া এবং নিজেকে ভারতের সার্বভৌম শাসক হিসেবে ঘোষণা করার অভিযোগ আনে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিচার ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ, কারণ বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন ভারতের বৈধ সম্রাট এবং কোম্পানি ছিল কেবলই দেওয়ানি লাভ করা একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে একজন সম্রাটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার কোনো আইনগত ভিত্তি কোম্পানির ছিল না। কিন্তু সমস্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্রাটকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ক্যাপ্টেন হাডসনের দেওয়া জীবন রক্ষার প্রতিশ্রুতির কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে রেঙ্গুনে নির্বাসনের রায় দেওয়া হয়।
১৮৫৮ সালের ৭ অক্টোবর ভোরবেলা, কড়া ব্রিটিশ পাহারায় একটি সাধারণ গরুর গাড়িতে করে নিজের প্রিয় শহর দিল্লী ত্যাগ করেন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। তার সাথে ছিলেন বেগম জিনাত মহল এবং দুই জীবিত পুত্র। তাদের নির্বাসনস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বার্মার রেঙ্গুন শহরকে। রেঙ্গুনে সম্রাটের নির্বাসিত জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অপমানজনক। তাকে শ্বেদাগন প্যাগোডার কাছে একটি সাধারণ কাঠের তৈরি ব্যারাকে রাখা হয় এবং বাইরের পৃথিবীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এই বন্দিদশায় তার একমাত্র সঙ্গী ছিল কলম আর কাগজ, কিন্তু জীবনের শেষ দিকে ব্রিটিশরা তাকে লেখার জন্য কাগজ-কালি দিতেও অস্বীকৃতি জানায়।
কথিত আছে, লেখার সামগ্রী না পেয়ে তিনি ঘরের দেয়ালে পোড়া কয়লা দিয়ে মনের সমস্ত আকুতি ও কবিতা লিখে রাখতেন।
নির্বাসিত জীবনে ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর, ৮৭ বছর বয়সে এই কবি-সম্রাট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ব্রিটিশরা এতটাই ভীত ছিল যে, সম্রাটের মৃত্যুর পরপরই সাধারণ মানুষের অলক্ষ্যে অত্যন্ত গোপনে তাকে সমাহিত করা হয় এবং কবরের ওপর মাটি সমান করে দেওয়া হয় যাতে কেউ তার সমাধি খুঁজে না পায়।
দীর্ঘদিন পর ১৯৯১ সালে একটি সংস্কার কাজের সময় তার প্রকৃত সমাধিস্থলটি আবিষ্কৃত হয়।
বন্দিদশায় তার লেখা একটি বিখ্যাত উর্দু শায়েরি আজও মানুষের মনে ইতিহাস আর যন্ত্রণার গভীর দাগ কেটে যায়: “কিতনা হ্যায় বদনসিব জাফর দাফন কে লিয়ে,
দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মে।” (অর্থাৎ, জাফর তুমি কতই না ভাগ্যহীন, প্রিয়তমার দেশে দাফনের জন্য দুই গজ জমিও তোমার ভাগ্যে জুটলো না।)
দিল্লি থেকে ঢাকা
দিল্লীতে শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহের আগুন সেসময় তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা ঢাকার লালবাগ কেল্লাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে লালবাগ কেল্লায় অবস্থিত ২২তম নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নামে স্বাধীনতার ডাক দেয়। কিন্তু ঢাকার এই বিদ্রোহ সফল হয়নি এবং ব্রিটিশ বাহিনী ও স্থানীয় অনুগত শক্তি সিপাহীদের পরাজিত করে।
এরপর ব্রিটিশরা এক চরম নৃশংসতার ইতিহাস তৈরি করে। বন্দি সিপাহীদের ধরে এনে সদরঘাটের কাছে অবস্থিত তদানীন্তন ‘আন্টাহর ময়দান’-এ নিয়ে আসা হয় এবং কোনো বিচার ছাড়াই তাদের একের পর এক গাছের ডালে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের মনে ভয় ধরাতে লাশগুলো বহু দিন ধরে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই আন্টাহর ময়দানের নাম বদলে রানী ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ রাখা হলেও, ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবর্ষ পূর্তিতে এই পার্কের নাম পরিবর্তন করে শেষ মুঘল সম্রাটের সম্মানে ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’ রাখা হয়।
ঢাকার এই পার্কটি আজও সিপাহী বিদ্রোহের সেই শহীদদের রক্ত এবং সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ট্র্যাজিক স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
১৮৫৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের সেই আত্মসমর্পণ কেবল একজন সম্রাটের পতন ছিল না, এটি ছিল ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক দাসত্বের শৃঙ্খলে পুরোপুরি আবদ্ধ হওয়ার এক কালো দলিল। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ট্র্যাজিক পরিণতি আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের নাম।









