প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আলঝেইমার দিবস। আলঝেইমার ও অন্যান্য ধরনের ডিমেনশিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিনের প্রধান লক্ষ্য।
সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
আলঝাইমার মূলত একটি প্রগতিশীল স্নায়বিক রোগ। এটি মস্তিষ্ককে ছোট করে দেয়, মস্তিষ্কের কোষ ধীরে ধীরে মরে যায়। এতে স্মৃতি, চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক দক্ষতা কমে যায়। এই অবনতি স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করে।
২০২৬ সালের বিশ্ব আলঝেইমার দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘দ্য আর্লিয়ার ইউ নো, দ্য মোর ইউ ক্যান ডু: এ ডিমেনশিয়া ডায়াগনোসিস ম্যাটার্স’। অর্থাৎ, যত দ্রুত জানা যায়, তত বেশি কিছু করার সুযোগ থাকে। এ বছরের প্রচারে রোগটি দ্রুত শনাক্ত ও নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘুমের সঙ্গে আলঝেইমারের সম্পর্ক
দীর্ঘদিনের অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত ঘুম আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এক রাত খারাপ ঘুম হলেই আলঝেইমার হবে, এমন নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমানের ঘুম বা রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুম ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু পরদিন ক্লান্তি বা বিরক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা মস্তিষ্কে কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এসব পরিবর্তন আলঝেইমার রোগীদের মস্তিষ্কেও দেখা যায়।
ভালো ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কে জমে থাকা বিপাকীয় বর্জ্য পরিষ্কারের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে।
এর মধ্যে বিটা অ্যামিলয়েড নামের একটি প্রোটিনও রয়েছে। আলঝেইমারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে এই প্রোটিন জমে প্লাক তৈরি করতে পারে খারাপ ঘুমের সঙ্গে মস্তিষ্ক থেকে এসব বর্জ্য পরিষ্কারের প্রক্রিয়া কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে স্মৃতি ও মস্তিষ্কের সুস্থতার সঙ্গে জড়িত কিছু প্রক্রিয়ার পরিবর্তনও হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, খারাপ ঘুম সরাসরি আলঝেইমার রোগ সৃষ্টি করে। আলঝেইমার একটি জটিল রোগ। এর পেছনে বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য, হৃদযন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং জীবনযাপনসহ বিভিন্ন কাজ করে।
ঘুমের সমস্যা আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আবার নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ঘুম ও আলঝেইমারের সম্পর্ককে দুই দিক থেকেই দেখা হয়।
শুধু ঘুমের সময় নয়, মানও গুরুত্বপূর্ণ
ঘুমের ক্ষেত্রে শুধু কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘুমের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং ঘুমে ব্যাঘাত হলে মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না। পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলেও একই সমস্যা হতে পারে।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ সমস্যায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রায় ওঠানামা হয়। এতে ঘুমের মানও খারাপ হয়ে যায়।
কেউ যদি জোরে নাক ডাকেন, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠেন বা শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?
বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ভালো মানের ঘুমের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস করা উপকারী। নিয়মিত শরীরচর্চাও ঘুমের মান ভালো করতে পারে।
দিনের শেষ দিকে ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো উচিত। অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাও জরুরি। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকানো থেকেও বিরত থাকা ভালো। শোবার ঘর অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখলে ঘুম ভালো হতে পারে।
এ ছাড়া স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা দরকার। শুধু ঘুমের সমস্যা মনে করে এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা ঠিক নয়।দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায় এমন ভুলে যাওয়া, পরিচিত কাজ করতে সমস্যা হওয়া বা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মস্তিষ্কের সুস্থতায় ঘুম গুরুত্বপূর্ণ
মূল কথা হলো, দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভালো ঘুম আলঝেইমার থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।
তবে দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যা শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্থতা ধরে রাখতে এটি একটি পরিবর্তনযোগ্য বিষয় হিসেবে কাজ করতে পারে।









