বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক ঋতুর সাধারণ সমস্যা নয়, বরং এটি সারা বছরের এক জটিল ও নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোর উদ্বেগজনক মৃত্যুহার ও হাসপাতালের রোগীর উপাত্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রচলিত ফগিং বা কীটনাশক ছিটানোর ওপর ভরসা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, বছরের পর বছর ব্যবহৃত মেলাথিয়ন বা পারমেথ্রিন গোত্রের কীটনাশকের বিরুদ্ধে এডিস মশা ইতিমধ্যে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। এর ফলে একদিকে সিটি করপোরেশনগুলোর বিপুল বাজেট অপচয় হচ্ছে, বিষাক্ত রাসায়নিকে বায়ুদূষণ ঘটছে এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে; অন্যদিকে মশার প্রজনন বা ভাইরাসের বিস্তার কোনোটিই কমছে না। এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ কৌশল বদলে আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষিত ও পরিবেশবান্ধব বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল পদ্ধতির পথে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্বজুড়ে এই মুহূর্তে জৈবিক উপায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বৈপ্লবিক ও নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ‘ওয়োলবাকিয়া’ প্রযুক্তির প্রয়োগ। ওয়োলবাকিয়া একটি প্রাকৃতিক ও সম্পূর্ণ নিরীহ ব্যাকটেরিয়া, যা বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গের শরীরে আগে থেকেই বিদ্যমান। তবে মানুষের দেহে ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটানো প্রধান বাহক এডিস এজিপ্টি মশার দেহে এটি প্রাকৃতিকভাবে থাকে না। আধুনিক জিনতত্ত্ব ও কীটবিজ্ঞানের সাহায্যে গবেষণাগারে এডিস মশার কোষে এই ব্যাকটেরিয়া স্থাপন করা হয়। এই ব্যাকটেরিয়া দুটি সমান্তরাল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় কাজ করে।
প্রথমত, ওয়োলবাকিয়া সংক্রামিত মশার কোষে ডেঙ্গু ভাইরাস তার নিজস্ব প্রতিরুপ তৈরি করতে বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না; অর্থাৎ মশাটি ডেঙ্গু রোগীর রক্ত খেলেও পরবর্তী মানুষের দেহে সেই ভাইরাস ছড়াতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সাইটোপ্লাজমিক ইনকম্প্যাটিবিলিটি নামের একটি প্রাকৃতিক নিয়মে ওয়োলবাকিয়াযুক্ত পুরুষ মশা যখন প্রকৃতির স্বাভাবিক নারী এডিস মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সেই নারী মশার উৎপাদিত ডিমগুলো বন্ধ্যা হয়ে যায় এবং কোনো লার্ভা ফোটে না। যেহেতু পুরুষ মশা রক্ত পান করে না এবং মানুষকে কামড়ায় না, তাই প্রকৃতিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুরুষ মশা ছাড়লে কোনো ধরনের উপদ্রব তৈরি ছাড়াই কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এডিস মশার মোট সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
এই পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা কোনো তাত্ত্বিক অনুমান নয়, বরং আন্তর্জাতিক বহু পরীক্ষিত তথ্যে এটি সরাসরি প্রমাণিত। অস্ট্রেলিয়া এই ওয়োলবাকিয়া প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ও আধুনিক ল্যাব অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোকে সম্পূর্ণ ডেঙ্গুমুক্ত করতে পেরেছে এবং দেশটি আজ ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে শতভাগ নিরাপদ। একইভাবে আমাদের প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর তাদের অত্যন্ত জনবহুল হাউজিং এস্টেটগুলোতে নিজস্ব ব্রিডিং ল্যাবের মাধ্যমে ‘প্রজেক্ট উলবাকিয়া’ বাস্তবায়ন করে এডিস মশার বিস্তার প্রায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে এবং দেশটি আজ এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এই পদ্ধতির সফল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এই ধরনের ল্যাব স্থাপন করে স্থানীয় সংক্রমণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার জোগজাকার্তায় ও ব্রাজিলের মতো দেশেও হাসপাতালে ভর্তির হার প্রায় ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা গেছে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ, অপরিকল্পিত ও আর্দ্র জলবায়ুর মেগাসিটিতে এই আধুনিক বিজ্ঞান কার্যকর করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ল্যাব খুলে বসে থাকলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন জোন ও ওয়ার্ডভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত ল্যাব অবকাঠামো। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি প্রশাসনিক অঞ্চলে অন্তত একটি করে স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক বায়ো-সেফটি রিয়ারিং ল্যাব ও ব্রিডিং সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি আধুনিক ল্যাব এবং পুরুষ মশা আলাদা করার স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি স্থাপন করতে এককালীন আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার মতো খরচ হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এটি বড় অঙ্কের মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অত্যন্ত লাভজনক ও সাশ্রয়ী একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। প্রতি বছর সিটি করপোরেশনগুলো মশা নিধনের কীটনাশক কেনা, ফগিং ও স্প্রে বাবদ শত শত কোটি টাকার বাজেট ব্যয় করে, যার বেশিরভাগই দিনশেষে অপচয় হয়। অথচ প্রতিটি জোনে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একবার এই স্থায়ী ল্যাবগুলো প্রতিষ্ঠা করে নিলে প্রতি বছর ডেঙ্গু নিধনের পেছনে যে বিপুল বাজেট রাখা হয়, তা পরবর্তীতে নাটকীয়ভাবে অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এসব ল্যাবে স্থানীয় জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ওয়োলবাকিয়াযুক্ত মশার নিয়মিত বংশবৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে পিউপা অবস্থা থেকেই পুরুষ মশাকে আলাদা করার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু রোগীর ডেটাবেজ ও এন্টারমোলজিক্যাল সার্ভের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোকে চিহ্নিত করে নিয়মিত বিরতিতে পুরুষ মশা ছাড়ার বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী এবং নগর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সেল গঠন করে প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে এর পাইলট ট্রায়াল শুরু করা উচিত। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত তা পুরো ঢাকা এবং পরবর্তীতে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমেরিকার সফল মডেল অনুসরণ করে বিজ্ঞানের সহায়তায় প্রকৃতির নিয়মেই এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রতি বছর বিষাক্ত ধোঁয়ায় শত কোটি টাকার বাজেট অপচয় না করে আধুনিক বায়োটেক ল্যাব ও গবেষণায় এককালীন বিনিয়োগ করাই হবে একটি দূরদর্শী জনস্বাস্থ্য নীতি, যা বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে ডেঙ্গুমুক্ত করার কার্যকর পথ দেখাবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









