এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
কারাগারে থাকা স্বজনকে নিয়ে উৎকণ্ঠা এই দুর্বলতাকেই পুঁজি করে নতুন কৌশলে প্রতারণায় নেমেছে একটি চক্র। কখনো জেল সুপার, কখনো কারা চিকিৎসক, আবার কখনো পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে বন্দির পরিবারের কাছে ফোন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কারাগারে থাকা স্বজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর বিকাশ, নগদ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠাতে বলা হচ্ছে টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনার তথ্য চ্যানেল আই অনলাইনের সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগারে থাকা স্বজনকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ ও মানসিক দুর্বলতাকেই প্রতারকরা কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে। অপরাধীরা আগে থেকেই বন্দির নাম, কারাগারের তথ্য কিংবা পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে। এরপর অসুস্থতা বা জরুরি চিকিৎসার কথা বলে আতঙ্ক তৈরি করে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেয়।
সুস্থ বন্দিকে ‘স্ট্রোক’, হাতিয়ে নিল ১ লাখ ৩৫ হাজার
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের শুকুর আলী কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৮ জুলাই তাঁর পরিবারের কাছে খবর আসে, কারাগারে তিনি স্ট্রোক করেছেন। স্থানীয় এক গ্রাম পুলিশ পরিবারের সদস্যদের জানান, জেল সুপার ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
এরপর চিকিৎসক পরিচয়ে ফোন করে বলা হয়, শুকুর আলীকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা পাঠাতে হবে। সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হবে, বাকি টাকা পরিবারকে দিতে হবে; এমন কথাও বলা হয়।
পরিবারটি প্রবাসী স্বজনের মাধ্যমে তিন দফায় মোট এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা পাঠায়। টাকা পাওয়ার পর ফোন নম্বরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যরা সরাসরি সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে গিয়ে শুকুর আলীর সঙ্গে দেখা করেন। তখনই বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা: তিনি সুস্থ আছেন, অসুস্থ হওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
কারা কর্তৃপক্ষও পরিবারকে জানায়, চিকিৎসার খরচের জন্য কারাগার থেকে কোনো ফোন করা হয়নি। পরে এ ঘটনায় গ্রাম পুলিশ মিলনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হার্টে রিং পরানোর কথা বলে ৩০ হাজার টাকা
চলতি বছরের জানুয়ারিতেও রংপুরে প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটে। কারাগারে থাকা সামছুলের পরিবারের কাছে ফোন করে বলা হয়, তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এবং দ্রুত হার্টে রিং পরাতে হবে। চিকিৎসার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ প্রতারণার কৌশল একই: প্রথমে ভয় তৈরি, এরপর জরুরি চিকিৎসার গল্প, তারপর টাকা পাঠানোর চাপ।
শুধু চিকিৎসা নয়, জামিনের আশ্বাসেও ফাঁদ
কারাবন্দির পরিবারকে টার্গেট করে প্রতারণা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবনায় মামুন হোসেন ও ইমরান হোসেন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। অভিযোগ ছিল, তারা কখনো জেল সুপার, কখনো পুলিশ কর্মকর্তা আবার কখনো আইনজীবী পরিচয়ে কারাবন্দিদের স্বজনদের ফোন করতেন।
জামিন কিংবা মামলার নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত চত্বর ও কারাগারের আশপাশে অপেক্ষমাণ স্বজনদের টার্গেট করত চক্রটি।
কীভাবে নম্বর যাচ্ছে প্রতারকদের হাতে?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারাগারে থাকা একজন বন্দির পরিবারের মোবাইল নম্বর প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে কীভাবে?
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কর্মকর্তা বলেন, আদালত চত্বর ও কারাগারের ফটক থেকে স্বজনদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করত প্রতারকরা। পরে সেই নম্বরে ফোন করে কখনো জেল সুপার, কারা চিকিৎসক কিংবা কারাগারে কর্মরত ঊর্ধ্বতনের ভুয়া পরিচয় দেওয়া হতো।
জানাতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) থেকে সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের জেল সুপারের দায়িত্ব নেওয়া মো. জান্নাত-উল ফরহাদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘কারাগারে থাকা বন্দিদের আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের ফোন নম্বর প্রতারকরা কীভাবে সংগ্রহ করছে? এ ক্ষেত্রে কারাগারের ভেতরের কেউ জড়িত কি না, কারও সঙ্গে প্রতারকদের যোগসাজশ আছে কি না; সেটিও তদন্তের বিষয়। জড়িত থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। কোনো ভুক্তভোগী আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে মামলা করলে তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারে।’’
ভয়টাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
এই প্রতারণায় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র টাকা নয়: ভয়।
‘আপনার স্বজন মারা যেতে পারেন’, ‘এখনই টাকা না দিলে চিকিৎসা হবে না’, ‘জামিনের সুযোগ চলে যাবে’; এমন কথা শুনলে পরিবারের সদস্যরা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশেষ করে কারাগারে থাকা স্বজনের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ সম্ভব না হলে আতঙ্ক আরও বাড়ে।
প্রতারকরা সেই আতঙ্কের কয়েক মিনিটকেই কাজে লাগায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘প্রতারকরা মানুষের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেই তাদের কৌশল সাজায়। তাই প্রতারণা ঠেকাতে শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নয়, মানুষের সচেতনতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধও জরুরি। প্রতারণা শুধু একটি ফোনকল বা একটি মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে হয় না; এর পেছনে মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগানোর একটি পরিকল্পিত কৌশল থাকে।’’
তিনি বলেন, ‘‘প্রতারকরা অনেক সময় নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন তারা ভুক্তভোগীর উপকার করতে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি বিপদের কথা বলে ভয় তৈরি করে, ফলে ভুক্তভোগী চিন্তা করার বা তথ্য যাচাই করার সময়টুকুও পান না।’’
কারা কর্তৃপক্ষের নামেই যখন প্রতারণা
কারা বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, বন্দির চিকিৎসা, জামিন, সাক্ষাৎসহ কারাগারের সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয় এবং বিকাশ বা মোবাইলে টাকা দাবি করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ও কারা কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের প্রকৃত যোগাযোগের নম্বরও সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা থাকে। যেমন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নাগরিক সনদে বন্দির জামিন ও অন্যান্য সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
মো. জান্নাত-উল ফরহাদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমরা স্থানীয় প্রেস ক্লাব, কমিউনিটি রেডিও এবং কারাগারে আসা বন্দিদের শুরুতেই জানিয়ে দিই: কারাগারে থাকতে কোনো টাকার প্রয়োজন হয় না। কারাগারের ভেতরে বিকাশ, নগদ বা উপায়ের মতো কোনো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসও নেই। মূলত এসব তথ্য জানিয়ে আমরা সাধারণ মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করি।
তিনি আরও বলেন, ‘‘এ ধরনের প্রতারণার কোনো ঘটনা আমাদের নজরে এলে সংশ্লিষ্ট থানাকেও অবহিত করা হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা এই প্রতারণার ভুক্তভোগী নই; সাধারণ মানুষই এর শিকার হচ্ছেন। তাই ভুক্তভোগীদের উচিত থানায় গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ করা।’’
পেছনের চক্র শনাক্তে জোর বিশেষজ্ঞদের
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ রাজ্জাক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘চক্রটি কীভাবে যোগাযোগ করে এবং পেছনে থাকা ব্যক্তিরা কারা আগে তাদের শনাক্ত করতে হবে। শুধু দু-একজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে দোষীদের দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব; সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি বা ব্যর্থতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’’
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘কারাগারে থাকা বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় মানসিকভাবে চাপে থাকেন। প্রতারকরা এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে পরিবারের সদস্যদের সচেতনতার পাশাপাশি কারাগার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও বন্দির পরিবারকে নিয়মিতভাবে জানানো প্রয়োজন: কারাগারের ভেতরে চিকিৎসা, বন্দির নিরাপত্তা বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে টাকা চাওয়ার নিয়ম নেই।’’
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ধরনের প্রতারণাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সংঘবদ্ধ অপরাধের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বিশেষ করে জেল সুপার, কারা চিকিৎসক, কারারক্ষী কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে ফোন করার ঘটনায় প্রতারকরা বন্দির নাম, কারাগারের অবস্থান এবং পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর কোথা থেকে সংগ্রহ করছে; তা খুঁজে বের করা জরুরি। কারাগারের অভ্যন্তরীণ কোনো তথ্য বাইরে পাচার হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে প্রতারকদের যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।’’









