গাজীপুরের একটা নিটওয়্যার কারখানার ছাদ। দেড় লাখ বর্গফুট, দুপুরে খালি পায়ে হাঁটা যায় না এমন গরম। নিচে লোডশেডিং হলেই ডিজেল জেনারেটর চালু হয়, মাসে তেলের বিল কয়েক লাখ টাকা। মালিক জানেন ছাদে রোদ পড়ছে, কিন্তু রোদ দিয়ে কী হয়, আর সেই রোদের সঙ্গে এক মাসের তেলের বিলের সমপরিমাণ টাকা একটু একটু করে কাজে লাগিয়ে বড় পরিবর্তন যে সম্ভব, সেই হিসাব মালিককে কেউ হয়তো দেখায়নি।
মিরপুরের একটা ছয়তলা বাড়ি। ছাদে কাপড় শুকায়, শীতে ব্যাডমিন্টন হয়। বাড়িওয়ালা প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল দেন সাত-আট হাজার টাকা, গরমে আরও বেশি। সেই ছাদেও রয়েছে বিরাট সুযোগ।
এই দুই ছাদের জন্যই ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ একটা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, ছাদে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ বসান, নিজের যা লাগে ব্যবহার করুন, উদ্বৃত্তটা জাতীয় গ্রিডে দিন, প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। টাকা যাবে ব্যাংক হিসাবে, তিন মাস পর পর।
৭ বছর আগে ভিয়েতনামের মানুষ প্রায় একই রকম একটা ঘোষণা পেয়েছিল। তারপর যা হয়েছিল, সেটা বাংলাদেশের বাড়িওয়ালা, কারখানার মালিক আর নীতিনির্ধারক, তিন পক্ষেরই জানা দরকার।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে ঠিক কী আছে
দামটা কীভাবে এল, দেখুন। বর্তমান বাজারদর আর বিদ্যুৎ বিভাগে আসা দরপত্র মিলিয়ে সরকার ধরেছে, ব্যাটারিসহ ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বানাতে খরচ প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা। এর ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা আর ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে দাম হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
একটা লাইন প্রজ্ঞাপনে আছে যেটা অনেকে খেয়াল করবেন না। কেউ যদি ওই ৮ টাকার চেয়ে কম খরচে সিস্টেম বসাতে পারেন, তাহলে যে টাকা বাঁচল সেটা তাঁরই লভ্যাংশ। মানে দরদাম করে, ভালো ইনস্টলার বেছে খরচ কমাতে পারলে পুরো লাভটাই গ্রাহকের।
শর্তগুলো:
- সিস্টেম বসাতে হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে। এরপর বসালে এই বিশেষ দাম নেই।
- যাঁরা সময়মতো বসাবেন, তাঁরা এই দাম পাবেন পরবর্তী ৩ বছর, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত।
- টাকা যাবে ব্যাংক হিসাবে, তিন মাস পর পর। নগদে নয়, কোনো অবস্থাতেই।
- প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটার, সব যন্ত্র বিএসটিআই আর শ্রেডার মান মেনে হতে হবে।
- বিতরণ সংস্থা হিসাব রাখবে কে কত ইউনিট গ্রিডে দিলেন।
- সাহায্যের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার, আর সব জেলা-উপজেলার বিতরণ অফিস।
এর আগে ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকায় সুযোগ এসেছিল। আগে নিজের সংযুক্ত লোডের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম বসানো যেত, এখন ১০০ শতাংশ। আগে শুধু থ্রি-ফেজ গ্রাহক পেতেন, এখন সিঙ্গেল-ফেজ গ্রাহকও পাবেন। মানে সাধারণ বাসাবাড়ি এই প্রথম সত্যিকারের বিদ্যুত ব্যবসায় ঢুকল।
ভিয়েতনামের ছাদে যা ঘটেছিল
২০১৯ সালে ভিয়েতনাম সরকার ঘোষণা দিল, ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ২০ বছর ধরে ৮-৯ সেন্টে কিনবে। আজকের টাকায় সেটা প্রায় ১০ টাকা, বাংলাদেশ এখন যা দিচ্ছে তার কাছাকাছি।

ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির দোকানদার, দা নাংয়ের হোটেল মালিক, ডং নাইয়ের কারখানা, সবাই ছাদে প্যানেল তুলতে লাগল। এক বছরে যুক্ত হলো সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেকের বেশি, শুধু ছাদ থেকে, এক বছরে। দুই বছরে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। মানুষ এগিয়ে এসেছিল কারণ হিসাবটা সোজা ছিল। রোদ ফ্রি, প্যানেল একবার কিনলে ২৫ বছর চলে, আর সরকার লিখিত দিয়েছে কত টাকায় কিনবে, কত বছর কিনবে।
ভিয়েতনামের ছাদগুলো এত দ্রুত বিদ্যুৎ দিতে শুরু করল যে বিতরণ লাইন আর সাবস্টেশন সেই গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। নিং থুয়ান প্রদেশে দুপুরবেলা এত বিদ্যুৎ তৈরি হতো যে লাইনে জায়গা হতো না, কিছু প্রকল্পকে তাই কম উৎপাদন করতে বলা হয়। মানুষের সামর্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না, প্রশ্নটা ছিল রাষ্ট্রীয় বিতরণ ব্যবস্থা আর সাবস্টেশন নিয়ে। যাঁরা বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয়ের হিসাবে বড় বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের হিসাবে কিছু এলোমেলো হলো। আর যারা নিজের বিল কমানোর জন্য বসিয়েছিলেন, তাদের কিছুই হলো না, কারণ তাদের বিদ্যুৎ ঘরেই খরচ হয়ে যেত।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ভিয়েতনাম ২০২৫-২৬ সালে নিয়ম নতুন করে সাজিয়েছে। এখনকার সুর একটাই: আগে নিজে ব্যবহার, পরে বাড়তিটা বিক্রি। গ্রিডে পাঠানোর সীমা প্রথমে ছিল মাসিক উৎপাদনের ২০ শতাংশ, জুন ২০২৬ থেকে ৫০ শতাংশ, আর যেখানে স্থানীয় গ্রিডের সামর্থ্য আছে সেখানে আরও বেশি। সঙ্গে চলছে তার আর সাবস্টেশনের কাজ। মানুষ এই নিয়মে ফিরেছে: ২০২৫ সালে ৬ হাজার নতুন গ্রাহক ১ হাজার মেগাওয়াট বসিয়েছেন, শুধু ২০২৬-এর জুলাই মাসেই উত্তর ভিয়েতনামে যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮১ জন।
দেশের বাড়িওয়ালার হিসাব
মিরপুরের ওই ছয়তলা বাড়িতে ফিরি। ছাদে ৫ কিলোওয়াটের সিস্টেম বসে অনায়াসে, জায়গা লাগে হাজারখানেক বর্গফুট। ব্যাটারিসহ খরচ মোটামুটি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের রোদে ৫ কিলোওয়াট দিনে গড়ে ১৮-২০ ইউনিট দেয়, মাসে ৫৫০-৬০০। এখন যে বিদ্যুৎ ওপরের স্ল্যাবে ১২-১৪ টাকায় কিনতে হয়, সেটা আর কিনতে হবে না। মাসে বাঁচে চার-পাঁচ হাজার টাকা। উদ্বৃত্ত যা যায় গ্রিডে, তার জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে তিন মাস অন্তর ব্যাংকে আসে।
মোটা হিসাবে সাত-আট বছরে টাকা উঠে আসে, তারপর ১৭ বছর প্যানেল চলে প্রায় বিনা খরচে। লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় ব্যাটারিতে বাতি-পাখা চলে, আইপিএস কেনার সেই ৩০-৪০ হাজার টাকাও বাঁচল।
বাড়ি বা ছোট মার্কেটের মালিকদের জন্য তিনটে কথা মনে রাখা ভালো।
এক, আসল লাভ নিজে ব্যবহার করায়। যে ইউনিট নিজে ব্যবহার করলেন, তাতে বাঁচল ১২-১৪ টাকা। যেটা বিক্রি করলেন, তাতে পেলেন ১০.৫০। ছাদ ভরে প্যানেল বসিয়ে বেশি বিক্রির লোভ না করে নিজের বিল শূন্য করার মাপে সিস্টেম নিন। ভিয়েতনামে যাঁরা বিক্রির হিসাবে বড় সিস্টেম বসিয়েছিলেন, তাঁরাই পরে সবচেয়ে বিপদে পড়েছিলেন।
দুই, ১০.৫০ টাকার মেয়াদ তিন বছর, ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর কী দাম হবে, প্রজ্ঞাপনে নেই। তাই যে হিসাবে টাকা ফেরত আসে, সেটা মূলত বিল সাশ্রয়ের ওপর দাঁড়াবে, বিক্রির টাকার ওপর নয়। এই কথাটা মাথায় রেখেই সিস্টেমের মাপ ঠিক করুন।
তিন, দরদাম করুন। প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, ৮ টাকা প্রতি ইউনিট খরচের চেয়ে কম খরচে বসাতে পারলে সাশ্রয়টা আপনার লভ্যাংশ। মানে তিন-চারটা ইনস্টলারের দর নিয়ে তুলনা করলে যা বাঁচবে তা পুরোটাই আপনার। শুধু দেখে নিন যন্ত্রপাতি বিএসটিআই আর শ্রেডার মান মানছে কি না, নইলে প্রণোদনাই মিলবে না।
কারখানার মালিকের হিসাব
গাজীপুরের ওই দেড় লাখ বর্গফুট ছাদে ১ মেগাওয়াটের বেশি বসে। খরচ ৫ কোটি টাকার আশপাশে। শুনতে বড় অঙ্ক। উল্টো দিকটা দেখুন। বাংলাদেশের রোদে ১ কিলোওয়াট প্যানেল দিনে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার ইউনিট দেয়। ১ মেগাওয়াট মানে ১ হাজার কিলোওয়াট, তাই বছরে দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ ইউনিট। শিল্পের বিদ্যুৎ ইউনিটপ্রতি ১০-১১ টাকা ধরলে বছরে বাঁচে সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা। চার-পাঁচ বছরে টাকা উঠে আসে, ডিজেলের বিল আলাদা হিসাব।
একটা সিদ্ধান্ত অবশ্য আছে। প্রণোদনার ১০ টাকা ৫০ পয়সা পেতে ব্যাটারি বসাতেই হবে, আর মেগাওয়াট আকারে ব্যাটারি খরচ অনেকটা বাড়ায়। অথচ কারখানা চলে দিনে, উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই নিজের কাজে লেগে যায়, গ্রিডে পাঠানোর উদ্বৃত্তই থাকে না। এক শিফটের কারখানার জন্য তাই ব্যাটারি ছাড়া হিসাবটাই বেশি লাভজনক হতে পারে।
কারখানার জন্য সুবিধাটা বাড়িওয়ালার চেয়ে বেশি। তিন বছরের মেয়াদ নিয়ে যে দুশ্চিন্তা বাড়িওয়ালার, কারখানার সেটা অনেক কম।

তার চেয়েও বড় কথা, বিদেশী ক্রেতারা এখন জিজ্ঞেস করছেন। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, প্রাইমার্ক, সবাই জানতে চাইছে কারখানা কত ভাগ গ্রিন এনার্জি বা সৌর বিদ্যুতে চলে। ভিয়েতনামে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স জুন ২০২৬-এ সরাসরি একটা সোলার প্ল্যান্টের সঙ্গে বছরে ৭০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার চুক্তি করেছে, রাষ্ট্রীয় কোম্পানিকে মাঝখানে না রেখে। যে কারখানার ছাদে সৌর প্যানেল, সেই কারখানা অর্ডারের দৌড়ে এগিয়ে থাকবে, এটা এখন বাস্তব।
দেশে ৮ হাজারের বেশি ছোটবড় গার্মেন্টস কারখানা। ইডকলের হিসাবে শুধু কারখানার ছাদেই ৫ হাজার মেগাওয়াট সম্ভব। এখন বসেছে হাজারখানেক। বাকিগুলোর ছাদ রোদে গরম হচ্ছে শুধু।
কারখানার বাইরে আরেকটা বড় সুযোগ
শহরের ছয়তলা, দশতলা মার্কেটগুলো। নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার, জেলা শহরের বড় বিপণিবিতান, সবগুলোর বিদ্যুৎ খরচ চলে দিনের বেলায়, দোকানের বাতি, লিফট, শীতাতপ যন্ত্র সব মিলিয়ে। একটা মার্কেটে দুই-তিনশ দোকান থাকলে প্রত্যেকের ভাগে খরচ পড়ে সামান্য, অথচ পুরো ভবনের বিল কমে যায় বড় অঙ্কে। দোকান মালিক সমিতি বা ভবন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে ছাদটাই হয়ে যায় গোটা মার্কেটের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র। ঈদের আগে যে মাসগুলোয় লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি ভোগায়, ব্যাটারিসহ সিস্টেম থাকলে সেই দিনগুলোতেও দোকান খোলা রাখা যায়।
এমন যৌথ উদ্যোগের জন্য ইডকল বা ব্যাংকের আলাদা একটা ঋণ পণ্য থাকা দরকার, যেখানে ঋণ নেবে সমিতি বা ভবন কর্তৃপক্ষ, কিস্তি উঠবে দোকানভাড়া বা সার্ভিস চার্জের সঙ্গে। ভিয়েতনামে বিদ্যুৎ কোম্পানির হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ১ হাজার মেগাওয়াটের বড় অংশটাই এসেছে এমন ব্যবসায়িক ও শিল্প ভবনের ছাদ থেকে, বাসাবাড়ি থেকে নয়। বাংলাদেশেও দ্রুত মেগাওয়াট তুলতে চাইলে দৌড়টা শুরু হবে এই ছাদগুলো থেকেই।
বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতে এখন কোথায়
সরকারি হিসাবে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ৪১৮ মেগাওয়াট। আইইইএফএ ২৩৯টি প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছে ৬৬৭ মেগাওয়াট, ছোট সিস্টেমগুলো ধরলে সংখ্যাটা ১ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হতে পারে। একই সময়ে গ্রিডে যুক্ত সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ ৮৫৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ছাদ এর মধ্যেই মাঠের প্রকল্পকে ছাড়িয়ে গেছে, এটি অনেকেই খেয়াল করেনি।
সামনের লক্ষ্য বড়। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, অর্ধেকের বেশি আসার কথা ছাদ থেকে।

সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, ভিয়েতনাম ২০১৯ সালে যেখানে ছিল, বাংলাদেশ ২০২৬-এ প্রায় সেখানেই।
নীতিনির্ধারকদের জন্য ভিয়েতনামের ৫ বিষয় থেকে শিক্ষা
ভিয়েতনামে বিতরণ ব্যবস্থা ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতায় সাত বছরে কিছু সমস্যা হয়েছিল, বাংলাদেশ সেগুলো এড়াতে পারে।
তিন বছর আর সাত বছরের ফারাক: ভিয়েতনাম ২০ বছরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে রাখতে পারেনি, ফল ১৩ বিলিয়ন ডলারের বিরোধ। বাংলাদেশ উল্টো পথে গেছে, মেয়াদ মাত্র তিন বছর, ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি ভাঙার ঝুঁকি কম, ভালো কথা। কিন্তু সিস্টেমের টাকা উঠতে লাগে সাত-আট বছর, ব্যাংক ঋণ দেয় পাঁচ-সাত বছরের। যে ঋণ পাঁচ বছরের, তার আয়ের নিশ্চয়তা যদি তিন বছরের হয়, ব্যাংক হিসাব মেলাতে পারবে না। ২০৩০-এর পর কী হবে, সেই ইঙ্গিতটুকু এখনই দেওয়া গেলে ঋণের দরজা খুলবে।
বিতরণ লাইন আগে, প্যানেল পরে: ভিয়েতনামের প্যানেল অকেজো পড়ে ছিল লাইন না থাকায়। বাংলাদেশে বিপদটা পাড়ার ট্রান্সফরমারে। একই ট্রান্সফরমারের নিচে বিশটা বাড়ি দুপুরে বিদ্যুৎ লাইনে যুক্ত করতে শুরু করলে ভোল্টেজ বেড়ে যায়। বিতরণ কোম্পানিগুলো এখনই বলে দিক, কোন এলাকায় কত মেগাওয়াট নেওয়া হবে। ভিয়েতনাম ২০২৬-এ ঠিক এটাই করছে।
১৫ দিনের মিটার: ধরুন ধানমন্ডির একজন গ্রাহক অক্টোবরে সিদ্ধান্ত নিলেন, ছাদে প্যানেল বসাবেন। ইনস্টলার ঠিক করতে এক মাস, বসাতে আরও এক মাস, ডিসেম্বরের মধ্যে সিস্টেম তৈরি। এবার দরকার নেট মিটার, যেটা ছাড়া গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠানোও যায় না, প্রণোদনার টাকাও আসে না। নিয়মে বলা আছে আবেদনের ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সংযোগ দিতে হবে। বাস্তবে অনেকের লেগে যায় তিন-চার মাস। তাহলে মিটার বসল এপ্রিলে, আর প্রণোদনার শেষ তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি। সিস্টেম ছাদে বসে আছে, প্রণোদনা হাতছাড়া। এই এক জায়গায় দেরি হলে পুরো কর্মসূচির ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার ভালো কাজ করছে কি না, তা মাপার একটাই সহজ হিসাব: আবেদন জমা দেওয়ার পর মিটার বসতে গড়ে কত দিন লাগছে।
সময়ের সীমাবদ্ধতা সমস্যা বাড়ায়: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর প্রণোদনা একেবারে বন্ধ, এতে ছয় মাসের হুড়োহুড়ি হবে, আর হুড়োহুড়িতে সস্তা প্যানেল ঢুকবে। ভিয়েতনামের সময়সীমা ঠিক এই কাজটাই করেছিল। বিকল্প হলো ধাপে ধাপে কমানো: প্রথম দফায় ১০.৫০, পরের দফায় একটু কম, তারপর বাজারদর। সুযোগ রাখতে হবে কমবেশি সারা বছর, যাতে করে নতুন নতুন বাড়ি, মার্কেট আর কারখানা বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হতে পারে।
কারখানা আর মার্কেটের জন্য আলাদা দরজা: এই খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিটা হলো ছাদের আকার, আর সেই ছাদের নিচে দিনের বেলার চাহিদা। ছোট গ্রাহকের জন্য নেট মিটারিং যথেষ্ট, কিন্তু বড় শিল্পগোষ্ঠীর দরকার সরাসরি চুক্তির ব্যবস্থা, যেখানে কারখানা আর বিদ্যুৎ উৎপাদক নিজেরাই দাম ঠিক করে নেবে। ভিয়েতনামে এই ব্যবস্থা চালু হতে সাত বছর লেগেছে, বাংলাদেশ শুরু থেকেই দুটো দরজা একসঙ্গে খুলতে পারে।
ভিয়েতনামের বাইরে, ৪ দেশের ৪ শিক্ষা
ভারত: ভর্তুকি আর ঋণ একই সঙ্গে
২০২৪ সালে চালু ‘পিএম সূর্য ঘর’ কর্মসূচিতে বাড়ির মালিক ভর্তুকি পান সোজা ব্যাংক হিসাবে, ৩ কিলোওয়াট বা তার বেশি সিস্টেমে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার রুপি। বাকি টাকার জন্য সরকারি ব্যাংক জামানত ছাড়া ঋণ দেয় ৬-৭ শতাংশ সুদে, ১০ বছর মেয়াদে। ৩ কিলোওয়াটের সিস্টেমের দাম যেখানে ১ লাখ ৯০ হাজার রুপি, ভর্তুকির পর মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় হাজার-এগারোশ রুপি, যা বিদ্যুৎ বিলের সাশ্রয়ের প্রায় সমান। ঘর থেকে বাড়তি টাকা বের হয় না।
কর্মসূচির আগে ভারতে মাসে ছাদে সৌর বসত সাত হাজারের মতো, এখন তিন লাখেরও বেশি। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ৪৭ লাখ বাড়ি। শিক্ষাটা সোজা: ভর্তুকি আর ঋণ দুই অফিসে ঘুরে জোগাড় করতে হলে মানুষ যায় না, এক জায়গায় পেলে যায়।
পাকিস্তান: দ্রুত বৃদ্ধির পর হিসাব মেলানোর ধাক্কা
পাকিস্তানে বিদ্যুতের দাম ২০১৫ সালের ৯ রুপি থেকে ২০২৪-এ ৪৪ রুপিতে ওঠে, আর নেট মিটারিংয়ে ছিল এক-এর বদলে-এক হিসাব। ফল, ২০২০ সালের ১৯০ মেগাওয়াট ছয় বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াটে, যার দুই-তৃতীয়াংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের।
কিন্তু গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনা কমে যাওয়ায় বিতরণ কোম্পানির আয় এক বছরেই কমে ১০১ বিলিয়ন রুপি, অথচ লাইন-সাবস্টেশনের খরচ আগের মতোই। সেই বোঝা পড়ে যাঁরা প্যানেল বসাতে পারেননি তাঁদের বিলে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়ম বদলে গ্রিডে পাঠানো বিদ্যুতের দাম নামিয়ে আনা হয় জাতীয় গড় ক্রয়মূল্যে। শিক্ষা: নীতি করার সময় বিতরণ কোম্পানির আয়ের হিসাবটাও মেলাতে হয়, নইলে দুই-তিন বছর পর নিয়ম বদলাতে হয়, আর তখন মানুষের আস্থা নড়ে।
অস্ট্রেলিয়া: ব্যাটারির ছাড়ে সাড়া কতটা বাড়ে
অস্ট্রেলিয়ায় এখন ৪৩ লাখের বেশি বাড়ির ছাদে সৌর, প্রায় প্রতি তিন বাড়ির একটিতে। ২০১১ সাল থেকে ছাড় চলছে, ধাপে ধাপে কমছে, একেবারে বন্ধ হচ্ছে না। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্যাটারির জন্য আলাদা ছাড় চালু হয়, খরচের প্রায় ৩০ শতাংশ। আগে দশজন গ্রাহকের একজন ব্যাটারি নিতেন, এখন প্রায় সবাই নিচ্ছেন, প্রথম বারো মাসেই বসেছে ৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যাটারি। বাংলাদেশে ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিন্তু ব্যাটারির জন্য আলাদা সহায়তা নেই।
কেনিয়া: কিস্তির জন্য ব্যাংকে যেতে হয়নি
কেনিয়ায় এম-কোপার মতো কোম্পানিগুলো সৌর ব্যবস্থা বেচে মোবাইল টাকায় দৈনিক বা সাপ্তাহিক কিস্তিতে। ব্যাংক হিসাব লাগে না, জামানত লাগে না। কিস্তি বাকি পড়লে সিস্টেম দূর থেকে বন্ধ, টাকা দিলে আবার চালু। ব্যাংকের চোখে যাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁরাও এভাবে গ্রাহক হয়েছেন। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক কেনিয়ার চেয়ে অনেক বেশি, আর গ্রামে গিয়ে কিস্তি তোলার অভিজ্ঞতাও ইডকল-গ্রামীণ শক্তির আছে।

দেশে টাকা কোথা থেকে আসবে
মিরপুরের বাড়িওয়ালার হাতে ৫-৬ লাখ টাকা নগদ নেই। গাজীপুরের কারখানার মালিকের ৫ কোটি আছে, কিন্তু সেটা তিনি কাঁচামালে খাটাতে চান। প্রণোদনা যতই ভালো হোক, এই দুই মানুষের হাতে টাকা পৌঁছানোর রাস্তা না থাকলে ছাদ খালিই থাকবে। আর হাতে সময় ছয় মাস।
সুখবর হলো, বাংলাদেশের নিজের ঘরেই একটা প্রমাণিত মডেল আছে। ২০০৩ সাল থেকে ইডকল গ্রামীণ শক্তি, ব্র্যাকসহ কয়েক ডজন সংস্থার মাধ্যমে ৬০ লাখের বেশি বাড়িতে সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে দিয়েছে। গ্রামের মানুষ নগদে কেনেননি, মাসে মাসে কিস্তি দিয়েছেন। সংস্থার কর্মী বাড়ি গিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন, নষ্ট হলে সারিয়ে দিয়েছেন। কিস্তি আদায়ের হার ছিল ব্যাংকের চেয়ে ভালো। এই যন্ত্রটাকে শহরের ছাদে নেওয়া মানে নতুন কিছু আবিষ্কার নয়, পুরোনো যন্ত্রে নতুন কাজ।
কয়েকটা প্রস্তাব:
বাড়ির জন্য: ইডকল তার পুরোনো সহযোগী সংস্থাগুলো নিয়ে শহরের বা গ্রামের ছাদে নেমে পড়ুক। ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াটের সিস্টেম, জামানত ছাড়া, ৫ থেকে ৭ বছরের কিস্তি, সুদ ৬-৭ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে টাকা এলে বাণিজ্যিক ব্যাংকও একই হারে দিতে পারে। ভারতের কর্মসূচি এভাবেই দেড় বছরে দশ লাখ বাড়ি সৌরবিদ্যুতে এনেছে।
কিস্তির টাকা যেখান থেকে আসতে পারে: প্রণোদনার টাকা আসবে ব্যাংক হিসাবে, তিন মাস অন্তর। ঋণের কিস্তিও যদি একই হিসাব থেকে একই তালে কাটা যায়, গ্রাহকের পকেটে হাত দিতে হয় না। আর বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তি জুড়ে দেওয়ার ব্যবস্থাটাও ভেবে দেখার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে এভাবেই চলে, বিল কমে যা বাঁচে কিস্তি তার চেয়ে কম রাখা হয়, ফলে প্রথম মাস থেকেই গ্রাহকের হাতে টাকা থাকে। ডেসকো, ডিপিডিসি, পল্লী বিদ্যুৎ, সবার বিল আদায়ের ব্যবস্থা তৈরিই আছে।
কারখানার জন্য: ১০০ কারখানাকে আলাদা ঋণ দেওয়ার চেয়ে সহজ, যে কোম্পানিগুলো নিজের টাকায় ছাদে প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ বেচে, ইডকল তাদের টাকা দিক। একটা কোম্পানি একসঙ্গে ১০০ ছাদে কাজ করতে পারে। বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহকারীদের সবুজ বিদ্যুতের জন্য নিজেরাই তহবিল রাখছেন, সেই টাকা ইডকলের ঋণের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায়।
স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, উপজেলা ভবনের জন্য: ঋণের দরকারই নেই। তৃতীয় পক্ষ বসাবে, প্রতিষ্ঠান শুধু গ্রিডের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ কিনবে। বিল যা কমে, সেটাই লাভ।

ব্যাংকের ভয় কাটাবে, দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে: ব্যাংক ঋণ দেয় জামানত দেখে, জমি, দোকান, গাড়ি, এফডিআর। ছাদের সোলার প্যানেল এই তালিকায় নেই। তাই ব্যাংকের কাছে এই ঋণ মানে জামানতহীন ঋণ, আর জামানতহীন ঋণে ব্যাংক হয় সুদ বাড়ায়, নয় ফাইল ফেরত দেয়। এই ভয়টা কাটাতে দরকার একটা যৌথ তহবিল, যেখানে টাকা রাখবে সরকার বা উন্নয়ন সহযোগীরা। আর বাড়ির ওইসব কাজে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা আর সিটি কর্পোরেশন এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করা যেতে পারে কিস্তি তোলা থেকে শুরু করে কাজের তদারকিতে।
ধরুন একটা ব্যাংক এক হাজার বাড়িকে ২ লাখ টাকা করে ঋণ দিল, মোট ২০ কোটি। এর মধ্যে কিছু গ্রাহক কিস্তি দেবেন না, ধরা যাক ৩ কোটি টাকার মতো। এই ৩ কোটির ক্ষতি ব্যাংক একা বহন না করে তহবিল থেকে আসবে, আগে থেকে ঠিক করা একটা সীমা পর্যন্ত। ব্যাংক জানবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও তার লোকসান কতটুকু, আর সেই নিশ্চয়তা পেলে সুদও কম রাখতে পারবে। ভারত আর কেনিয়া, দুই জায়গাতেই এমন তহবিল ব্যাংককে নামতে সাহস দিয়েছে।
দ্বিতীয় সুরক্ষাটা গ্রাহকের নিজের জন্য। ঝড়ে প্যানেল উড়ে গেলে বা চুরি হলে যন্ত্র নেই, অথচ ঋণের কিস্তি রয়ে গেল, এই পরিস্থিতি এড়াতে সিস্টেমের বিমা দরকার। প্রিমিয়ামটা ঋণের সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া যায়, যাতে আলাদা করে বিমা কোম্পানির খোঁজে যেতে না হয়। উপকূল আর হাওর এলাকার জন্য এটা বিশেষ করে জরুরি।
শেষ কথাটা আবার ভিয়েতনামেরই। সেখানে ব্যাংক ২০ বছরের সরকারি চুক্তি দেখে ঋণ দিয়েছিল। বাংলাদেশে সমস্যাটা আসলে চুক্তি মাত্র তিন বছরের, ঋণের মেয়াদ হতে পারে পাঁচ-সাত বছরের। ইডকল বা যে ব্যাংকই এই খাতে নামুক, তাদের প্রথম দাবি হওয়া উচিত ২০৩০ সালের পরের ছবিটা এখনই দেখানো।
ছাদ থেকে দেখা ২০৩০
ভিয়েতনাম ২০২৬ সালে লক্ষ্য ধরেছে, ১০ শতাংশ সরকারি দপ্তর আর ১০ শতাংশ পরিবারের ছাদে সৌর। হ্যানয় বাসাবাড়ির ব্যাটারিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এসব হয়েছে একবার হোঁচট খাওয়ার পর।
বাংলাদেশের হোঁচট খাওয়ার দরকার নেই। মিরপুরের বাড়িওয়ালা, গাজীপুরের কারখানা, সিরাজগঞ্জের কলেজের ছাদ, উপজেলা পরিষদের ভবন, সব মিলিয়ে কোটি ছাদ খালি পড়ে আছে। তেলের দাম যখন হরমুজ প্রণালির ওঠানামায় ঝুলছে, তখন এই ছাদগুলোই দেশের সবচেয়ে সস্তা আর সবচেয়ে নিরাপদ বিদ্যুৎকেন্দ্র।
প্রজ্ঞাপন দরজাটা খুলেছে, তবে ছয় মাসের জন্য। ভিয়েতনামের মানুষ ২০১৯-এ এই দরজা দিয়ে ঢুকে দুই বছরে ১৬ হাজার মেগাওয়াট তুলেছিল। বাংলাদেশের সবাই মিলে চেষ্টা করলে দেশেও এরকম অবশ্যই সম্ভব।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









