এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক ধারা থেকে সরিয়ে প্রতিরোধ, রোগের আগাম শনাক্তকরণ ও ধারাবাহিক সেবার ওপর নতুন করে সাজানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেন, মানুষের বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী করা হচ্ছে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ব্যবস্থা। এ রূপান্তরের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে নারী ও শিশুদের।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ: প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেন ডা. জুবাইদা রহমান। বাংলাদেশ, সুইডেন ও ইউএনএফপিএর অংশীদারত্বে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘সুস্থ বাংলাদেশের আমাদের লক্ষ্য হলো চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে এমন একটি ব্যবস্থায় যাওয়া, যেখানে প্রতিরোধ, আগাম শনাক্তকরণ ও ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং মানুষের বাড়ির কাছাকাছি সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, গ্রামীণ ইউনিয়ন থেকে শহরের ওয়ার্ড পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে থাকবে শক্তিশালী মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে জানিয়ে ডা. জুবাইদা বলেন, শুধু মিডওয়াইফের সংখ্যা বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য নয়। তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতাসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের সঙ্গে যুক্ত করাই মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, গর্ভধারণের আগের সময় থেকে শুরু করে গর্ভকাল, প্রসব, প্রসব-পরবর্তী সময় এবং নবজাতকের সেবা পর্যন্ত একজন নারীকে ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মিডওয়াইফরা কাজ করবেন।
ডা. জুবাইদা বলেন, আলোচনায় উপস্থাপিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মডেলে মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পুরো যাত্রায় মিডওয়াইফদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে খণ্ডিত স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় পরিবার ও কমিউনিটিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। প্রয়োজন হলে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও বিশেষায়িত পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
তার মতে, মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশের জন্য তিনটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি আনতে পারে—স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, চিকিৎসাব্যয়ে আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং স্বাস্থ্যসেবার অর্থনৈতিক মূল্য বাড়ানো।
তিনি বলেন, এতে নারীদের প্রয়োজনীয় সেবা আরও কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমবে এবং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় মর্যাদাপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, নারীর স্বাস্থ্যসেবা যেন জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে না হয়, বরং মাতৃত্বকালীন পুরো সময়ে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায় এটাই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য।
‘প্রত্যেক নারী যেন তার বসবাসের কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অংশ হিসেবে একজন দক্ষ পেশাদার মিডওয়াইফের সেবা পান’ এ লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এ উদ্যোগের একটি উদ্দেশ্য। তবে প্রতিটি দেশকে নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর সমাধান তৈরি করতে হবে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘পেশাদার মিডওয়াইফ জীবন রক্ষা করেন। এখন আমাদের কাজ হলো এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে তারা কার্যকরভাবে, সমতার ভিত্তিতে এবং টেকসইভাবে এই কাজ করতে পারেন।’
স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই রূপান্তরকে বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত করতে বিভিন্ন দেশের সরকার, জাতিসংঘের সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী সংগঠন ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ চালিয়ে যেতে চায় বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সিয়েরা লিওন, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।








