ইসরায়েলি হয়েও ফিলিস্তিনের উপর নির্মম আক্রমণের সত্যতা তুলে ধরে সিনেমা বানিয়ে আলোচনায় নির্মাতা ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর। সম্প্রতি তাদের সিনেমা ‘নাজা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জয় করে রীতিমত তোপের মুখে!
ভেনিসে পুরস্কার জয়ের পর ‘নাজা’ এখন শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সিনেমাটি নিয়ে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তার অভিযোগ, সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ‘ইহুদিবিদ্বেষী উসকানি’ ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলা ও বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’। গত শনিবার ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার জেতে সিনেমাটি।
পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই সিনেমাটির নির্মাতা ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দেশটির কয়েকজন মন্ত্রী। এবার সেই সমালোচনায় সরাসরি যুক্ত হলেন নেতানিয়াহুও।
সোমবার টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, “এটি অত্যন্ত হতবাক করার মতো বিষয়। আমরা বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষী উসকানির বিরুদ্ধে লড়ছি। আর যখন সেটি আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই আসে, তখন তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “দুই ইসরায়েলি পরিচালক ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং এ জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তারা করতালি পাচ্ছেন।”
কী আছে আলোচিত ‘নাজা’তে?
প্রায় ৮০ মিনিটের ‘নাজা’ তথ্যচিত্রে গাজায় ইসরায়েল কীভাবে সামরিক হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করে, সেই প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুকে কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সিনেমাটির নির্মাতারা প্রায় তিন বছর ধরে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ২৪ জন কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যের গোপন সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাদের পরিচয় গোপন রাখতে সাক্ষাৎকারগুলো রাতে তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে ধারণ করা হয়। পরে তাদের মুখ ও কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতারা দাবি করেছেন, গাজার এমন এলাকাতেও ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতির বিষয়ে সামরিক বাহিনী আগে থেকেই অবগত ছিল।
সিনেমাটির নাম ‘নাজা’ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত একটি শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে বলে নির্মাতারা জানিয়েছেন। কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য কতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারেন, সেই সংখ্যাকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
সিনেমায় সাক্ষাৎকার দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেন, মাত্র একজন হামাস সদস্যকে লক্ষ্য করে একটি হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যদিও ওই হামলায় প্রায় ৫০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
‘নাজা’ নির্মাতাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার দাবি
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আগে ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানান। তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তোলেন তিনি।
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও দুই নির্মাতার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের ‘লজ্জা ও বিব্রতকর’ বলে মন্তব্য করে দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এদিকে সিনেমাটি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়াল জামির। ‘নাজা’তে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে আইনি তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ভেনিসে রেকর্ড করতালি
এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘নাজা’ ছিল সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি। প্রদর্শনীর পর দর্শকদের প্রায় সাড়ে ২৪ মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) পায় সিনেমাটি। এ সময় দর্শকদের অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা।
তথ্যচিত্রটির প্রশংসা করেছেন উৎসবের জুরি সদস্য ও তিউনিসীয় নির্মাতা কাউথার বেন হানিয়া। পুরস্কার দেওয়ার পর তিনি বলেন, পরিচয় গোপন রেখেও দুই নির্মাতা যেভাবে সাক্ষাৎকারগুলো ধারণ করেছেন, তা অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ।
বেন হানিয়ার ভাষায়, সিনেমাটি শুধু নির্মাতাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে নয়; বরং একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার ভেতরে থাকা মানুষদের বক্তব্য সামনে এনেছে। তার মতে, অস্বীকারের সময়ে এ ধরনের কাজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
পুরস্কার গ্রহণের সময় ইউভাল আব্রাহামও বলেন, সিনেমাটি ইসরায়েলের মানুষের দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো অপরাধ অস্বীকার করা হলে সেটিই অপরাধকে চলমান রাখতে সহায়তা করে।
তিনি গাজায় কাজ করা ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদেরও বিশেষভাবে স্মরণ করেন। আব্রাহামের দাবি, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করে আসছেন।
‘নাজা’ প্রযোজনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান ও জেমস উইলসন। সিনেমাটির নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর অস্কারজয়ী পরিচালক জোনাথন গ্লেজার।









