যুক্তরাজ্যে তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক দশক আগের তুলনায় এখন ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু নেই এমন তরুণের সংখ্যা বেড়েছে পাঁচ গুণ। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। গবেষণাটি করেছে ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ (আইপিপিআর)।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে বর্তমানে প্রতি ২০ জন তরুণের মধ্যে একজন জানিয়েছেন, তাদের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। ২০১৪ সালে এই হার ছিল প্রতি ১০০ জনে একজন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২১ বছর বয়সীদের মধ্যে অন্তত তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ১৪ ও ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে নিজেদের বন্ধুত্ব নিয়ে সন্তুষ্টির হারও এক দশক আগের তুলনায় কমেছে।
আইপিপিআর বলছে, বর্তমান প্রজন্মের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা অনেকটাই ‘বিচ্ছিন্নতা’ দিয়ে চিহ্নিত হচ্ছে। তরুণরা নিজেদের, একে অপরের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা, করোনাভাইরাস মহামারি এবং দীর্ঘদিনের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির প্রভাব তরুণদের সামাজিক জীবনে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়া এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশের বাড়তি চাপ।
প্রতিবেদনে ‘ডুমস্ক্রলিং’কেও তরুণদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী তরুণরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা অনলাইনে কাটাচ্ছে। ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটে তাদের বড় একটি সময় ব্যয় হচ্ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া এক তরুণ নিজের দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ টিকটক দেখা। খাওয়া ও গোসলের সময়ও টিকটক দেখেন এবং বাসে ওঠার পরও একই কাজ করেন।
তরুণদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে মানসিক চাপও বাড়ছে। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং একই বয়সী পুরুষদের ৩৬ শতাংশ এখন মানসিকভাবে চাপে থাকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করছেন।
এর প্রভাব পড়ছে তাদের কর্মক্ষমতার ওপরও। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ জানিয়েছিলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে তারা আগের মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কম কাজ করতে পেরেছেন। বর্তমানে এই হার বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় চার গুণ।
আইপিপিআর ১৫০ তরুণের সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করেছে।
সংস্থাটির সহযোগী পরিচালক আভনি মরজারিয়া বলেন, তরুণদের এই পরিস্থিতিকে তাদের দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃচ্ছ্রসাধন, মহামারি ও ডিজিটাল বিপ্লবের মধ্যে একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। একই সময়ে বাড়ি কেনা ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশের খরচও বেড়েছে।
আইপিপিআরের শিশু ও তরুণবিষয়ক প্রধান এলি হ্যারিস বলেন, পটভূমি যাই হোক না কেন, অনেক তরুণই প্রতিটি পর্যায়ে মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। শুধু শিক্ষা খাতে নতুন উদ্যোগ বা আরও কিছু পেশাজীবী নিয়োগ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে তরুণদের অনলাইন নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাজ্য ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়াও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রথম দেশ হিসেবে এমন পদক্ষেপ নেয়।









