ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর চালকবিহীন ডুবযান (আনম্যানড সাবমার্সিবল) জব্দ করার দাবি করেছে। মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদমাধ্যম দ্যা এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের জটিল একটি অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম অত্যাধুনিক চালকবিহীন ডুবযানটি জব্দ করে ইরানে নিয়ে আসা হয়েছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ করা ডুবযানটি ‘ডাইভ-এলডি’। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি স্বায়ত্তশাসিত চালকবিহীন পানির নিচের যান। ২০২৫ সালে এটি প্রথম মার্কিন নৌবাহিনীর আনম্যানড আন্ডারসি ভেহিকল গ্রুপ-১-এর কাছে সরবরাহ করা হয়।
ইরানের প্রেস টিভি দাবি করেছে, ডুবযানটিতে বিশ্বের অন্যতম উন্নত পানির নিচের প্রযুক্তি রয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, জব্দ করা মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ছবির প্রমাণ ও বিস্তারিত ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালির ওপর একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের আকাশসীমায় ড্রোনটি শনাক্ত, অনুসরণ ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। পরে সেটি হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয়।
ইরানি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, দেশটির সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন নতুন ও অত্যাধুনিক একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেছেন, নৌ অবরোধের কারণে ইরান বড় ধরনের শাস্তি পেয়েছে। তিনি এই অবরোধকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর বলেও মন্তব্য করেন।
হোয়াইট হাউসের বাইরে স্টিল অ্যাক্রস আমেরিকা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। তারা বড় ধরনের শাস্তি পেয়েছে।
ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘তারা যে কাজ করছে তা অবিশ্বাস্য।’
ট্রাম্প আরও বলেন, অবরোধটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর হয়েছে। কেউ ভাবেনি এটি এত ভালোভাবে কাজ করবে।
এদিকে, ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬টি লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ২৭টি বিমান সংস্থা রয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট-এর আওতায় এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অস্ত্র, জনবল এবং অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহায়তা করছে।
ইরানের সক্রিয় বিমান সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দেশটিকে মার্কিন নির্মিত উড়োজাহাজ ও বিমান চলাচল প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তাকারী কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারীদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরান সরকারের আর্থিক সহায়তার পথ বন্ধ করা। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ইরানি বিমান সংস্থার সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পথ তৈরি হবে।
মঙ্গলবার জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগির সঙ্গে ফোনালাপে এ কথা বলেন আরাগচি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই মন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
আরাগচি বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করে বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
তিনি বলেন, সমাধান সহজ। ইসলামাবাদ সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি ও স্বাক্ষরের প্রতি ফিরে এসে তা মেনে চললে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার পথ তৈরি হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান আলোচনার বিষয়েও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন আরাগচি। তিনি জানান, প্রণালির মধ্য দিয়ে অস্থায়ী একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে তা নিয়েও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা পুনরায় শুরু হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মোতেগি দ্রুত উত্তেজনা প্রশমন এবং যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এড়াতে ইরানকে সর্বোচ্চ নমনীয়তা দেখানোর আহ্বানও জানান তিনি।
বেসামরিক জাহাজে ইরানের অব্যাহত হামলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানান মোতেগি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য হরমুজ প্রণালিতে অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই দ্রুত অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপকূলীয় দেশ, এই জলপথ ব্যবহারকারী রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আলোচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে সংযত থাকার আহ্বান জানাতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানান জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় গত জুনে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এতে শত্রুতা বন্ধ এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার কাঠামোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে ইরানের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবায়ন করেনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইরান সবসময় যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তবে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় কোনো দ্বিধা করবে না এবং শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ শক্তি’ দিয়ে প্রতিরোধ করবে।
তিনি বলেন, ইরান সংঘাত উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকাকেই জনগণের স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষায় দেশটি দৃঢ় থাকবে।
এমন বক্তব্যের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমানা থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ‘সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা অঞ্চল’ চালুর বিস্তারিত শিগগিরই জানানো হবে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইও দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধের জবাব পারস্য উপসাগরজুড়ে সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা অঞ্চল দিয়ে দেওয়া হবে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক অবস্থান নতুন করে সাজানো হয়েছে।
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ ইবনে আল-রেজাও বলেছেন, অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকরে নিয়োজিত মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। এর ফলাফল সামনে স্পষ্ট হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের কাছে এখনও এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।









