ভারতে ইয়ারবাডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। মেট্রো, ক্যাব কিংবা রাস্তায় হাঁটার সময় অনেকের কানে দেখা যাচ্ছে ট্রু ওয়্যারলেস স্টেরিও (টিডব্লিউএস) ইয়ারবাড। গান শোনা, ফোনে কথা বলা, গেম খেলা কিংবা অনলাইনে ভিডিও দেখার মতো কাজে দীর্ঘ সময় ধরে এসব ডিভাইস ব্যবহার করছেন মানুষ। এতে শ্রবণশক্তির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বেঙ্গালুরুর অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ইএনটি, হেড-নেক ও এন্ডোস্কোপিক সার্জন ডা. পি হরিহারা মূর্তি বলেন, তার চেম্বারে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসা রোগীদের বয়স কমছে।
কানে শোঁ শোঁ বা গুঞ্জন শোনা, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া কিংবা কানে অস্বস্তি এখন শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়। কিশোর ও জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ব্যক্তিগত অডিও ডিভাইস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানান ডা. মূর্তি।
তার মতে, দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড বা হেডফোন ব্যবহারের সঙ্গে রাত জাগা ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম যুক্ত হওয়ায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর চাপ পড়ে। শ্রবণশক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বেশি, কারণ কানের শ্রবণব্যবস্থা প্রায় সারাক্ষণ সক্রিয় থাকে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না।
দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড ব্যবহারে প্রথমে কানে সাময়িক ক্লান্তি ও শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বছরের পর বছর এ অভ্যাস চলতে থাকলে কানে গুঞ্জন বা টিনিটাস এবং শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
টিনিটাস হলো আশপাশে কোনো শব্দ না থাকলেও কানে শব্দ শোনার অনুভূতি। ডা. মূর্তির মতে, দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড ও হেডফোন ব্যবহারে শ্রবণস্নায়ু প্রথমে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে এবং পরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কান পরিষ্কার করতে ইয়ারবাড ব্যবহার করতেও নিষেধ করছেন চিকিৎসকরা। এতে কানের ময়লা বা ওয়াক্স আরও ভেতরে ঢুকে কানের পর্দার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে টিনিটাস দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কানের পর্দা কিংবা এর পেছনে থাকা ক্ষুদ্র হাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চিকিৎসকের মতে, একটি জোরে গান শোনা বা একবার দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলার কারণে সাধারণত সমস্যা তৈরি হয় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ শব্দে এবং একটানা অডিও ডিভাইস ব্যবহারের ফলে ক্ষতি জমতে থাকে।
তাই একটানা দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে কানের শ্রবণস্নায়ুকে বিশ্রাম দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন এই বিশ্রাম না দিলে সাময়িক ক্লান্তি স্থায়ী ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। একবার স্থায়ী ক্ষতি হলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে।
পরিচিত পরিবেশে, এমনকি নিজের বাড়ি বা পরিচিত কোনো কক্ষেও অন্যের কথা স্পষ্টভাবে শুনতে সমস্যা হলে বিষয়টি অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. মূর্তি। এটি শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সতর্কসংকেত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ইয়ারবাড পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলছেন না চিকিৎসকেরা। তবে নিয়মিত ব্যবহারকারীদের বছরে অন্তত একবার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা, কম ভলিউমে অডিও শোনা এবং একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়ারবাড ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। দিনের কিছু সময় ইয়ারবাড ছাড়া থাকলে ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব।
ভারতে ইয়ারবাডের ব্যবহার যে শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্রবণতা নয়, বরং একটি নতুন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তা স্পষ্ট। এই অভ্যাস ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের বড় সমস্যা হয়ে উঠবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মানুষ এখন থেকে কীভাবে ও কতক্ষণ এসব ডিভাইস ব্যবহার করছে তার ওপর।









