জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘মানবাধিকার বিষয়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গণমাধ্যমের নিত্য চর্চার বিষয়। এ কারণে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের কাজ সমমুখী।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক শান্তি, সহাবস্থান, সহযোগিতা ও সর্বাত্মক কল্যাণের জন্যই যথার্থ মানবাধিকার চর্চা প্রয়োজন। মুক্ত গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সুরক্ষা একে অপরের পরিপূরক।
আজ মঙ্গলবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে মানবাধিকার বিষয়ক বিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিকের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘মানবাধিকার সুরক্ষায় গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা’ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিপ্রেক্ষিত এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ বোরহান কবীর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ইউএনডিপি’র বাংলাদেশের সহকারি আবাসিক প্রতিনিধি আনোয়ারুল হক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব সেবাষ্টিন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়ক উপস্থাপনা করেন পরিচালক কাজী আরফান আশিক।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কমিশন নিবিড়ভাবে করে থাকে। এ পর্যন্ত দেশের যে প্রান্তেই সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছে কমিশন সাথে সাথেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে’৷
কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন আরও বেশি জোড়ালো পদক্ষেপ নেবে। মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ দিচ্ছি। যেকোনো তথ্য চাইলে তা আমরা সরবরাহে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। সাংবাদিকদের উপর হামলা নির্যাতন, মামলায় আমরা সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছি। কথা বলেছি। সত্যের সন্ধানে কাজ করা সাংবাদিক গোলাম রব্বানীকে টার্গেট করেছিল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। যিনি একটি পার্টিরও নেতা। তখন সাংবাদিক ও কমিশনের জোড়ালো ভূমিকার কারণে আসামী ধরা পড়েছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা বেশি ঘটছে বলে মন্তব্য করে ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্যখাত ও এর সেবা যে নিম্নমুখি মানে পৌছে, শত শত হসপিটালের কোনো লাইসেন্স নাই। এর দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা আখের গুছানোর চেষ্টায় আছেন, কাজের কাজটা করছেন না। যে কারণে বেআইনিভাবে ও অননুমোদিতভাবে স্বাস্থ্যসেবা চলছে। এখানে গণমাধ্যম কর্মীদের মানবাধিকারের জায়গা থেকে কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রমের পরিসংখ্যান ভিত্তিক তুলে ধরে তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের সিদ্ধান্ত যে কাজে আসে না তা নয়। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশনে মোট অভিযোগ এসেছিল ২৮২টি। এরমধ্যে তদন্ত চলমান ১২৯টির। ১৩০টি অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে, ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেকে ইনিয়েবিনিয়ে বলছেন, পদে পদে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ গাজায় হাজার হাজার মানুষ হামলায় মরে গেলেও সেটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজা সুয়োমটো অভিযোগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, পত্রপত্রিকায় উঠে আসা খবরের সূত্র ধরে মানবাধিকার কমিশন স্বপ্রণোদিতভাবে ৫১টি ঘটনায় সুয়োমটো দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ১২টি ঘটনা নিষ্পত্তি হয়েছে। ৩৯টি ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান। বাল্যবিবাহ নিয়ে আমরা জোড়ালোভাবে কাজ করছি। নারী নির্যাতন, দারিদ্রবিমোচন নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্যিকার অর্থে আমরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কমিশনের যোগাযোগ বৃদ্ধির সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। কারণ গণমাধ্যম ছাড়া মানবাধিকারের সুরক্ষা সম্ভব না।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক সৈয়দ বোরহান কবীর বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে জনগণ। যে দেশে জনগণ মানবাধিকারের প্রশ্নে যতটা সচেতন সেই দেশ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় তত এগিয়ে। বিশ্বের সব মহান ও জনপ্রিয় নেতাই ছিলেন মানবাধিকারের পক্ষে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আব্রাহাম লিংকন ও নেলসন মেন্ডেলা কিংবা মহাত্মা গান্ধী তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ভোরের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, গণমাধ্যম ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কীভাবে এক হয়ে কাজ করলে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে নির্মাণ করতে পারি সে বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে৷
তিনি আরও বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ৯ মাসে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো। আবার ৭৫ এর আগস্টে জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। এ ঘটনাগুলো ইতিহাসে বর্বরোচিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত।
সভায় মানবাধিকারের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ, সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা, গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হয়৷ পাশাপাশি বক্তারা জনগণের মাঝে অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি, সংবিধান, আইন ও অধিকার সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞানের প্রসারে গণমাধ্যমকে সার্বিক উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানান। উক্ত মতবিনিময় সভায় একটি উম্মুক্ত আলোচনায় সাংবাদিকগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিজ নিজ মন্তব্য উপস্থাপন করেন।









