ডোনাল্ড ট্রাস্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা একটি ‘‘এক্সপ্লেইনার’’ এ তথ্য জানা যায়।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েল অন্তত ৯৬৯ বার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই সময়ের মধ্যে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সরাসরি গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখা হয়।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, ইসরায়েল ২৯৮ বার বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে। ৫৪ বার ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। ৪৫৫ বার গাজায় বোমা ও গোলাবর্ষণ করেছে এবং ১৬২ বার মানুষের সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া গত এক মাসে গাজা থেকে ৪৫ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
পাশাপাশি, ইসরায়েল গাজা উপত্যকাজুড়ে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশেও বাধা দিয়ে যাচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস অব্যাহত রেখেছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত কী ছিল?
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধ, উপত্যকায় আটক থাকা বাকি বন্দিদের মুক্তি অবরুদ্ধ এলাকায় পূর্ণমাত্রায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের তিন ধাপের রূপরেখা তুলে ধরে একটি ২০ দফা প্রস্তাব প্রকাশ করে।
চলমান প্রথম ধাপের কয়েকটি প্রধান শর্ত ছিল:
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজায় সব ধরনের সংঘর্ষের অবসান
ইসরায়েলের মাধ্যমে গাজায় সব ধরনের সহায়তা অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সহায়তা বিতরণে হস্তক্ষেপ বন্ধ
হামাসের হাতে থাকা সব বন্দির (জীবিত বা মৃত) মুক্তি
ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি ও নিখোঁজ ব্যক্তির মুক্তি
ইসরায়েলি বাহিনীর ‘ইয়েলো লাইন’-এ প্রত্যাহার

মিসর, কাতার ও তুরস্কসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সহায়তায় গত বছরের ১৩ অক্টোবর প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে ইসরায়েল ও হামাস দুই পক্ষই সেখানে অনুপস্থিত ছিল, এতে যুদ্ধের অবসান ও ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং ১৮ বছরের গাজা অবরোধের মতো মূল ইস্যু সমাধানে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
ইসরায়েল ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ব্যাপক অস্ত্র সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছে যদিও গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে কেবল অস্পষ্ট বক্তব্যই দিয়েছে।
প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির ৮৯ দিনের মধ্যে ৭৪ দিনই ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিন এমন ছিল, যখন কোনো সহিংসতা, নিহত বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি। ক্রমাগত হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে, যুদ্ধবিরতি এখনো “কার্যকর” রয়েছে।
ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ড অব্যাহত
১০ অক্টোবর দুপুরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল অন্তত ৪২৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ১,১৯৯ জনকে আহত করেছে বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে। ১৯ ও ২৯ অক্টোবর ছিল যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুই দিন। এই দুই দিনে মোট ১৫৪ জন নিহত হয়েছে।
১৯ অক্টোবর রাফায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর হামাসকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ইসরায়েল গাজাজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়, এতে ৪৫ জন নিহত হন।
হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেডস জানায়, রাফা এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি যোদ্ধার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না।
২৯ অক্টোবর রাফায় গোলাগুলির ঘটনায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল ৫২ শিশুসহ ১০৯ জনকে হত্যা করে।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালিয়েছে, আর তাদের তা করা উচিত ছিল। তিনি ইসরায়েলের হামলাকে সেনা নিহত হওয়ার ‘প্রতিশোধ’ বলে আখ্যা দেন।
২২ নভেম্বর উত্তর ও মধ্য গাজায় ইসরায়েলি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং আরও বহু মানুষ আহত হন।

সামগ্রিক হতাহতের হিসাব
গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহত অন্তত ৭১,৩৯১ জন। এর মধ্যে ২০,১৭৯ শিশু। আহত অন্তত ১,৭১,২৭৯ জন।
সহায়তা এখনও আটকে দিচ্ছে ইসরায়েল
যুদ্ধবিরতিতে বলা হয়েছিল, “অবিলম্বে পূর্ণমাত্রায় সহায়তা গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করবে।” কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, ১০ অক্টোবর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বরাদ্দ ৪৮ হাজার ট্রাকের মধ্যে মাত্র ১৯, ৭৬৪টি ট্রাক গাজায় ঢুকতে পেরেছে। গড়ে প্রতিদিন ঢুকেছে ২৫৩টি ট্রাক, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৪২ শতাংশ।
ট্রাকচালকদের মতে, ইসরায়েলি তল্লাশির কারণে সহায়তা পৌঁছাতে অস্বাভাবিক দেরি হচ্ছে।
এ ছাড়া ইসরায়েল মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও সবজির মতো পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী আটকে দিচ্ছে, যা সুষম খাদ্যের জন্য অপরিহার্য। এর বদলে স্ন্যাকস, চকলেট, চিপস ও কোমল পানীয়ের মতো কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
হামাস কি সব বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে?
যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর হামাস গাজায় আটক থাকা বাকি ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দেয়। এর বিনিময়ে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদের সাজাপ্রাপ্ত ২৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি এবং৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর নিখোঁজ হওয়া ১, ৭০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়।
চুক্তির অংশ হিসেবে হামাসের আরও ২৮ ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, এর বিনিময়ে ইসরায়েল ৩৬০ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ ফেরত দেবে।
৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত হামাস ২৭ জন ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ ফিরিয়ে দিয়েছে। গাজায় এখনও একজনের মরদেহ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। হামাস বলেছে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ওই মরদেহ উদ্ধারে ভারী খননযন্ত্র প্রয়োজন।

এদিকে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ৩০০-র বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ ফেরত দিয়েছে, যার অনেকগুলোর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ও অঙ্গহানির লক্ষণ পাওয়া গেছে। বহু মরদেহ এখনও শনাক্ত করা যায়নি।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক গবেষনা সংস্থা লাইবার ইনস্টিটিউট-এর মতে, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য হলো সক্রিয় যুদ্ধ থামানো বা “সংঘাতকে স্থির অবস্থায় রাখা”। তবে আন্তর্জাতিক আইনে এর ব্যাখ্যা অনেক সময় অস্পষ্ট।
শত্রুতা স্থগিত রাখাকে মূলত সক্রিয় সামরিক অভিযানের অবসান হিসেবে বোঝা হয়। আবার সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হলে তা রাজনৈতিক চুক্তি লঙ্ঘন হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে, যদি না যুদ্ধবিরতিটি কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের অংশ হয়।









