বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। শুধু একজন লেখক বা সম্পাদক হিসেবে নয়, কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্যদের কাছে আমীরুল ইসলাম ছিলেন একান্ত আপনজন- একজন অন্তরঙ্গ সুহৃদ। সেই প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে শুক্রবার বিকেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সামনে জড়ো হয়েছিলেন কেন্দ্রের পুরনো ও নতুন সদস্যরা।
বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলামের মরদেহ বাংলা একাডেমি থেকে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নেওয়ার পথে বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে প্রায় ১৫ মিনিটের জন্য যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। মরদেহবাহী গাড়িটি কেন্দ্রের সামনে পৌঁছাতেই সেখানে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
চিরচেনা সেই প্রাঙ্গণে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে মরদেহবাহী গাড়িটি। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমীরুল ইসলামের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাকে শেষবারের মতো দেখতে এবং বিদায় জানাতে সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিভিন্ন বয়সী সদস্যরা।
এ সময় কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ কেন্দ্রের নতুন-পুরনো সদস্যরা আমীরুল ইসলামকে স্মরণ করেন। তাদের কথায় উঠে আসে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে তার দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নানা স্মৃতি। তারা তাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘অন্তরঙ্গ সুহৃদ’ হিসেবে উল্লেখ করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় জানান।
প্রায় ১৫ মিনিট পর আমীরুল ইসলামের মরদেহ নিয়ে গাড়িটি মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। এরপর মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার মায়ের কবরে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় আমীরুল ইসলামের। জুমার নামাজের পর দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে দীর্ঘদিনের কর্মস্থলে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে রাখা হয়। সেখানে বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। এরপর আসর নামাজের পর মিরপুরের গোলারটেক ঈদগাহ মাঠে হয় তার তৃতীয় জানাজা।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন আমীরুল ইসলাম। চার দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া আমীরুল ইসলাম শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ‘খামখেয়ালি’ ছড়াগ্রন্থের জন্য অল্প বয়সেই অর্জন করেন শিশু একাডেমির অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার। পরবর্তী সময়ে এই পুরস্কার আরও পাঁচবার পান তিনি।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার, নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ছোটদের পত্রিকা পুরস্কার, ছোটদের মেলা পুরস্কার, শামসুর রাহমান সাহিত্য পুরস্কার, হাবীবুর রহমান শিশুসাহিত্য পুরস্কার, লাটাই ছড়াসাহিত্য পুরস্কার এবং কলকাতার অন্নদাশঙ্কর সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
তিন শতাধিক বইয়ের লেখক আমীরুল ইসলাম শিশুদের জন্য গল্প, ছড়া ও নানা ধরনের সৃজনশীল লেখা লিখেছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কিশোর-তরুণদের উৎকর্ষধর্মী মাসিক ‘আসন্ন’-এর সম্পাদক হিসেবে প্রায় ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার ছোটদের জন্য প্রকাশিত প্রথম চার রঙের কিশোর পাতাও সম্পাদনা করেন পাঁচ বছর।









