জরুরি ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও খাদ্যসামগ্রী আমদানির মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশে আনা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। গত অর্থবছরে সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে আসা শতাধিক চালানে ৭৫৩ কোটি টাকার মাদক আটক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কাগজপত্রে এসব পণ্যের মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। জাল ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে এসব অর্থ বিদেশেও পাঠানো হয়েছে।
এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই তথ্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাদক আমদানিতে ব্যবহার করা ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৩টির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। বাকি ৩৪টি প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। তদন্ত কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের খুঁজলেও একজনেরও সন্ধান পাননি।
মাদক আনতে ব্যবহার হচ্ছে শুল্কমুক্ত সুবিধা
শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ব্যবহারের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। চিকিৎসা খাতের যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ওষুধ আমদানিতেও রয়েছে রাজস্ব সুবিধা। এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে মাদক কারবারিরা।
এনবিআরের বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় মাদক আনা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক আমদানির প্রমাণ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বন্ড সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় রয়েছে বাড়িঘর, কোথাও দোকানপাট বা রেস্তোরাঁ। অথচ কাগজে-কলমে সেসব ঠিকানায় দেখানো হয়েছে শিল্পকারখানা।
চীন-দুবাই-ভারত থেকে বড় চালান
চট্টগ্রাম ও বেনাপোল বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি মাদক আটক করা হয়েছে। চীন, দুবাই ও ভারত থেকে এসেছে বড় অংশের চালান। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও মাদক আনার তথ্য পাওয়া গেছে। কনটেইনার বা কার্গো চালানের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে গোপন প্রকোষ্ঠ। কখনো মেশিনারিজের যন্ত্রাংশের ভেতরও লুকানো হয়েছে মাদক। এভাবে ইয়াবা, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইনজেকটিং মাদক দেশে ঢোকানোর চেষ্টা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে শুধু বাজার হিসেবে নয়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার করছে।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে কোটি কোটি টাকার মাদক
তদন্তে মেসার্স রইমা অ্যাকসেসরিজের নামে কাঁচামাল আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা ৮৯ কোটি টাকার মাদক এবং একমী লিমিটেডের চালানে ৫৯ কোটি টাকার মাদক আটক করা হয়। নওমী সোয়েটার ফ্যাক্টরির নামে আনা হয় ৭৪ কোটি টাকার যৌন উত্তেজক পণ্য। সোহান ও সুপ্তি ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের নামে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ঘোষণা দিয়ে আনা হয় ৭৭ কোটি টাকার মাদক। এ ছাড়া ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতির আড়ালে একতা ক্লিনিক, মোহন ডায়াগনস্টিক ও শতরুপা ক্লিনিকের নামে আনা আরও ১৮৭ কোটি টাকার মাদক আটক করা হয়েছে।
জড়িত কারা?
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি-বিদেশি মাদক চক্রের সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় পরিসরে এ ধরনের কারবার চালানো কঠিন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদের মতে, অতীতের তদন্তেও দেখা গেছে—এ ধরনের চক্র এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বন্দরের অসাধু ব্যক্তিদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ব্যবসায়ী পরিচয় ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি মিথ্যা ঘোষণায় মাদক আমদানির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে শুধু ব্যবসায়ী সমাজের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও জননিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে। তাদের মতে, মিথ্যা ঘোষণায় মাদক আমদানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এনবিআর, বন্দর, ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাড়ছে কৌশল, প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, লোকবল সংকটের কারণে অনেক সময় প্রতিটি চালানের সব কার্টন খুলে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল পণ্য খালাস ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তাও মোতায়েন করা হয়েছে।
এনবিআরের সুপারিশে আঞ্চলিক মাদক ও অর্থ পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।









