দীর্ঘ এক দশকের গবেষণা ও প্রস্তুতির পর অবশেষে বাজারে আসতে চলেছে অ্যাপলের দুই হাজার ডলারের ফোল্ডেবল আইফোন। প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রতীক্ষিত এই ডিভাইসটি অ্যাপলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডিজাইন পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
২০২০ সালের দিকে এশিয়া সফরে গিয়ে স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো ব্র্যান্ডের ফোল্ডেবল ফোনের জনপ্রিয়তা দেখে অ্যাপলের তৎকালীন সিইও টিম কুক বেশ অনুপ্রাণিত হন।
চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ফোল্ডিং ডিভাইসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেখে তিনি অ্যাপলকে এই খাতে কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেন। তবে এর অনেক আগে থেকেই, অর্থাৎ ২০১৯ সালে প্রথম গ্যালাক্সি ফোল্ড আসার আগে থেকেই অ্যাপলের গোপন হার্ডওয়্যার টিম ফোল্ডেবল ডিসপ্লে ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিল।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ফসল হিসেবে অ্যাপল তাদের প্রথম ফোল্ডেবল ফোনটি উন্মোচন করতে যাচ্ছে। এটি সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সিইও জন টার্নাসের জন্য একটি বড় অভিষেক হতে চলেছে। অন্যদিকে টিম কুক বর্তমানে এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দর্শকসারিতে বসে এই উন্মোচন উপভোগ করবেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফোল্ডেবল ডিভাইসটি একটি আইপ্যাড মিনির মতো ভাবা হয়েছিল, যা খুলে বড় ট্যাবলেটে পরিণত হবে। কিন্তু টিম কুকের হস্তক্ষেপে তা মূলধারার ফোল্ডেবল আইফোন তৈরির দিকে মোড় নেয়।
ফাইনান্স ও সাপ্লাই চেইন নিয়ে ব্যস্ত থাকা কুকের সরাসরি এমন প্রোডাক্ট ডিজাইনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ছিল বেশ বিরল। তার এই জোরালো সমর্থনই অ্যাপলের ইতিহাসের অন্যতম জটিল হার্ডওয়্যার প্রজেক্টটিকে আলোর মুখ দেখাতে সাহায্য করেছে।
এ বিষয়ে অ্যাপল কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বাজার এখনও ছোট হলেও এটি দ্রুত বাড়ছে। আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক ফোল্ডেবল বাজার ১৩ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ২৯ লাখ ইউনিটে পৌঁছাবে, যেখানে মোট স্মার্টফোনের বাজার ১০০ কোটির বেশি।
অ্যাপলের অভ্যন্তরে এই ডিভাইসের প্রজেক্ট কোডনেম ভি ৬৮, যা অনেকের কাছে আইফোন আল্ট্রা নামে পরিচিত। শুরু থেকেই এটিকে একটি প্রিমিয়াম পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় এর মূল্য ১,৯৯৯ ডলার নির্ধারণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, ঠিক যেমন ২০১৭ সালে ৯৯৯ ডলারে আইফোন এক্স বাজারে আনা হয়েছিল।
তবে সম্প্রতি মেমরি সংকটের কারণে এর সম্ভাব্য দাম বেড়ে ২,১৯৯ ডলার হতে পারে। এমনকি স্টোরেজ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ডিভাইসটির সর্বোচ্চ কনফিগারেশনের দাম ৩,০০০ ডলার পর্যন্ত ছুঁতে পারে।
বর্তমানে বাজারে সাধারণ আইফোনের দাম শুরু হয় ৭৯৯ ডলারে এবং আইফোন ১৭ প্রো পাওয়া যায় ১,০৯৯ ডলারে।
ক্রেতাদের জন্য এই উচ্চমূল্য কিছুটা ধাক্কা হতে পারে। তবে অ্যাপল মনে করে, তাদের প্রো মডেলগুলো ইতোমধ্যেই প্রায় দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি বিক্রি হচ্ছে। অ্যাপল আপগ্রেড সাবস্ক্রিপশন, ট্রেড ইন অফার এবং কিস্তি সুবিধা ক্রেতাদের এই ফোন কিনতে সাহায্য করবে। তাছাড়া স্যামসাং ও গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রয়েড ফোল্ডেবল ফোনগুলোর দামও শুরু হয় প্রায় ১,৮৯৯ ডলার থেকে।
ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশনের দিক থেকেও ফোনটি হবে বেশ আলাদা। এর ভেতরের ডিসপ্লে ৭.৮ ইঞ্চি, যা অন্যান্য ফোল্ডেবলের তুলনায় বেশ চওড়া। ২০২৩ সালের পিক্সেল ফোল্ড বা গ্যালাক্সি জি ফোল্ড ৮ এর ডিজাইনের মতো এটি ভিডিও দেখা ও মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য দারুণ। আর বাইরের স্ক্রিন হবে ৫.৫ ইঞ্চি, যা পকেটে রাখা ও সহজে ধরার জন্য সুবিধাজনক।
ভাঁজ করা অবস্থায় এটি পাসপোর্টের মতো এবং খুললে অ্যাপলের ম্যাজিক ট্র্যাকপ্যাডের মতো দেখাবে। ফোনটি ব্যবহার করতে প্রতিবার খুলতে হবে, প্রচলিত আইফোনের চেয়ে এটি তুলনামূলক কম টেকসই, ক্যামেরা সিস্টেম কিছুটা দুর্বল এবং ব্যাটারি লাইফও কম হতে পারে।
এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ওয়াল স্ট্রিটের (বাজার বিশ্লেষক) ধারণা, অ্যাপল এ বছর ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ইউনিট ফোল্ডেবল আইফোন বিক্রি করবে।
ইন্টারন্যাশনাল ডেটা কর্পোরেশন (আইডিসি) গবেষক নাবিলা পোপালের মতে, উচ্চমূল্য সত্ত্বেও এটি চীনে স্মার্টফোনের বার্কিন (হার্মিসের বিলাসবহুল ব্যাগ) হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পাবে।
টার্নাসের নেতৃত্বে এই ফোনটির মাধ্যমে অ্যাপল আগামী কয়েক বছরের জন্য একাধিক নতুন পণ্যের সূচনা করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে টাচ স্ক্রিন ম্যাকবুক, টেবিলটপ রোবট, স্মার্ট গ্লাস, ক্যামেরাযুক্ত এয়ারপডস এবং ভিডিও রেকর্ডিংবিহীন নতুন হোম সিকিউরিটি সিস্টেম।
সাবেক হার্ডওয়্যার প্রধান ড্যান রিসিওর অধীনে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টটিকে টার্নাস ও কুক মিলেই চূড়ান্ত রূপ দিয়েছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যাপলের সামনে চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল : ভাঁজের দাগ কমানো, হিঞ্জের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, ফ্লেক্সিবল কাভার গ্লাস তৈরি এবং স্ক্রিনের নিচে ক্যামেরা বসানো। অ্যাপল শেষ পর্যন্ত কর্নিংয়ের সাথে মিলে একটি উন্নত টাইটানিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম হিঞ্জ সিস্টেম এবং কাস্টম গ্লাস তৈরি করেছে, যা ভাঁজের দাগকে অনেকটাই অদৃশ্য করে তুলবে।
যদিও ডিভাইসটি আইফোন ১৮ প্রো লাইন এবং অন্যান্য সাম্প্রতিক মডেলের তুলনায় কম টেকসই হতে পারে, অ্যাপল বিশ্বাস করে যে এর নির্মাণের গুণমান ফোল্ডেবল বাজারের জন্য শীর্ষস্থানীয় হবে।
এ লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের অ্যাপলের বিভিন্ন অ্যাপ হালনাগাদের দায়িত্ব দিয়েছে, যাতে বড় ও প্রশস্ত ডিসপ্লেতে সেগুলো আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি, বিভিন্ন আকারের স্ক্রিনে অ্যাপগুলো আরও কার্যকরভাবে চালানোর জন্য আইওএস অপারেটিং সিস্টেমেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ফোনটির নকশাগত সীমাবদ্ধতাগুলো পুষিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট আকর্ষণ তৈরি করা। ২০২৩ সালের দিকে অ্যাপলের ডিজাইন টিম তুলনামূলক ছোট ও প্রশস্ত নকশার দিকেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তাদের ধারণা ছিল, এই নকশা আইফোনকে বাজারে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেবে এবং গ্রাহকদের সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো উপেক্ষা করার মতো যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি করবে।
এ জন্য অ্যাপলকে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়েছে, যাতে সেগুলো বাস্তব ব্যবহারে যথেষ্ট কার্যকর হয়। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি ও নকশার এই সমন্বয়ই অ্যাপলকে ফোল্ডেবল আইফোনের ধারণাটি বাস্তবায়নের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
ফোল্ডেবল প্রযুক্তির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার পর এবার অ্যাপল মনে করছে, এই ডিভাইস বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত গ্রাহকদের বাইরেও নতুন ক্রেতারা এই ফোন কিনতে আগ্রহী হবেন, এমনকি এর জন্য ঐতিহাসিকভাবে বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত থাকবেন।









