(লিওনেল মেসি বিশ্বের কোটি অনুরাগীর হৃদয় ভেঙে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ের অপার এক বিস্ময় তিনি। মাঠে শুধু সাফল্য-শিহরণ নয়, অপ্রাপ্তিও আছে তার। মেসিকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে ৬ পর্বের বিশেষ লেখায় সেসব গল্পই তুলে আনছেন ফুটবল লেখক-বিশ্লেষক জাহিদ রহমান। আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব)
আশির দশকে ফুটবল মানেই ম্যারাডোনা। চারিদিকে দারুণ উন্মাদনার ঝড়। মাঠে ম্যারাডোনার প্রতিটি স্পর্শে ফুটে উদ্বেলিত হয় কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন আর আবেগ। ম্যরাডোনার পায়ে বল গেলেই পুরো মাঠ হয় আলোকিত । ‘৮৬তে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তার অনবদ্য নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়, তাকে নিয়ে যায় সর্বোচ্চ উচ্চতায়। কিন্তু আলো আর অন্ধকারে সহাবস্থান ছিল তার। বহুবিধ বিতর্ক তাকে ঘায়েল করে ফেলে। তারপরেও সব বিতর্ক ছাপিয়ে ফুটবলের এক অনন্য শিল্পী হিসেবে ম্যারাডোনা এখনও সবার উপরে।
পড়ুন পর্ব-১: চে গুয়েভারা থেকে মেসি: রোজারিওর দুই কিংবদন্তি
পর্ব-২: মেসি: এক উল্কার ছুটে চলা
ম্যারাডোনা যুগের অবসানের পর তারই উত্তরাধিকার বহন করে আবির্ভূত হন আরেক বিস্ময় লিওনেল মেসি। বলাবাহুল্য একসময় আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই ছিল ম্যারাডোনার জাদু আর নীল-সাদা পতাকার উন্মাদনা। কিন্তু সেই গৌরবের দিন যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসতে থাকে। কেননা ম্যারাডোনার প্রস্থানের পর আর্জেন্টিনা বিশ্বফুটবল মঞ্চে আর সেভাবে উদ্ভাসিত হতে পারছিল না। স্বভাবতই বিশ্বকাপের মঞ্চে বারবার ব্যর্থতা, ট্রফির দীর্ঘ খরা আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের মনে তৈরি করেছিল হতাশার পাহাড়। ঠিক সেই সময়টাতে মেসি নতুন এক আশার সঞ্চার করেন। কিন্ত বারবার তাকে হোঁচট খেতে হচ্ছিল। তবে নিঃশব্দেও হলেও অনুমিত হচ্ছিল তার হাত ধরেই আর্জেন্টিনা ফুটবলের পুনর্জন্ম হবে। তার হাত ধরেই আসবে বিশ্বকাপ ট্রফি। শেষমেশ সেই ইতিহাসই তৈরি করেন একজন লিওনেল মেসি। তার হাত ধরেই বিশ্বফুটবলে আর্জেন্টিনার পুনর্জন্ম হয়।
একটু মনে করিয়ে দেই, ২০০৬ বিশ্বকাপের পর ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় সাউথ আফ্রিকাতে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর আকর্ষণীয় থিম সং পরিবেশিত হয় এই বিশ্বকাপে। গায়িকা শাকিরার অনবদ্য কণ্ঠে সেই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গান এখনও জীবন্ত, চিরসবুজ। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা শুরুতেই আলোচিত হয়ে ওঠে ম্যারাডোনার কারণে। কেননা আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে তিনি তখন নেতৃত্বে। আর কোচ ম্যারাডোনার জন্য এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সত্যিকার অর্থেই নতুন কিছু করবে বলে সবাই বিশ্বাস করে। ম্যারাডোনাও ঠিক তার মতো ফুটবলের এক অনন্য প্রতিভা মেসিকে পাশে পান।
২০১০ সালের বিশ্বকাপে গোলকিপার সের্গেই রেমেরো, ডিফেন্সে মার্টিন ডেমিচেলিস, গ্যাব্রিয়েল হাইঞ্জ, নিকোলাস ওটামেন্ডি, নিকোলাস বুরডিসো, মিডফিল্ডে আনহেল ডি মারিয়া, জোহান সেবাস্তিয়ান ভেরন, হাভিয়ের মাশ্চেরানো, ফরোয়ার্ড লাইনে গঞ্জালো হিগুয়েন, কার্লোস তেভেজ, সের্গেই এগুইয়েরে, মার্টিন পালের্মোর সাথে লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার এমন লাইনআপে নতুন আশার সঞ্চারিত হয়েছিল। সেই আশা বহুদূর বিস্তৃতও হয়। কিন্তু থমকে যেতে হয় কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে। গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত খেলে। নাইজেরিয়া, সাউথ কোরিয়া এবং গ্রিসকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর শেষ ষোলোতে মেক্সিকোকে ৩-১ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। গোল না পেলেও প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দন্ত খেলেন লিওনেল মেসি। ২০১০ বিশ্বকাপ ছিল মেসির জন্য বিশেষ এক অধ্যায়। গোল না পেলেও গোলের সুযোগ তৈরি, ড্রিবলিং ও আক্রমণ পরিচালনায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। চারটি ম্যাচে তিনি বারবার গোলের কাছাকাছি গিয়েও কাঙ্ক্ষিত গোলটি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
এরপর ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি ফের আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে আবির্ভূত হন। কিন্তু সামান্যতে বিশ্বকাপ হাতছাড়া হয়ে যায়। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় বোঝাও ছিল তার কাঁধে। আর্জেন্টিনার আক্রমণ মানেই ছিল মেসি, সৃজনশীলতা মানেই ছিল মেসি, গোলের আশা মানেই ছিল মেসি। এই বিশ্বকাপে তিনি যতটা না একটি দলের অংশ ছিলেন, তারচেয়ে বেশি ছিলেন একটি দলের শেষ আশ্রয় হিসেবে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি চার ম্যাচে গোল করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন এবং গোল্ডেন বলও জিতেছিলেন। কিন্তু জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যায়। বিষণ্ণ মন নিয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে। রানার্সআপ হয়েই সন্তষ্ট থাকতে হয়।
২০১৪-এর পর মেসি আরও তিনটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ওঠানোর কৃতিত্ব দেখান। ২০১৫ সালের ৪ জুলাই কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনা চিলির কাছে টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে পরাজিত হলে মেসি আরও বেশি হতাশ হয়ে পড়েন। সেই হতাশা আরও তীব্র হয় ফের ২০১৬ সালে চিলির কাছে একইভাবে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে পরাজিত হয়ে শিরোপা হাতছাড়া হওয়াতে। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে তিনি অবসরের ঘোষণাই দিয়ে ফেলেন। পরে অবশ্য অবসর ভেঙে ফের নিজের ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করেন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা ব্যর্থ হয়। রাশিয়াতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে সেকেন্ড রাউন্ডে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়।
মেসির জন্য সুন্দর এক সময় আসে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত কাতার বিশ্বকাপে। তবে শুরুতেই অনিশ্চয়তার দোলাচলে থাকলেও ধীরে ধীরে বিশ্বকাপ কেবলই মেসিময় হয়ে ওঠে। এক দুর্দান্ত ফুটবল ম্যাজিক উপহার দেন তিনি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর যে মেসির চোখে হতাশা দেখা গিয়েছিল, ২০২২ সালে সেই একই মানুষকে দেখা যায় পরাজয়ের পর সতীর্থদের ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে। প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের বিপক্ষে হার আর্জেন্টিনাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারত। সেরকম ইঙ্গিতও ছিল। কিন্তু লিওনেল মেসি সেই পরাজয় সেই ধাক্কাকে পরিণত করেছিলেন ঐক্যের শক্তিতে। তবে ফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছিল। লুসাইল স্টেডিয়ামে যেন ভূমিকম্প তৈরি হয়েছিল। দুইবার এগিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনা বারবার সমতায় ফিরেছিল। কিন্তু মেসি তখনও দলের সামনে ছিলেন। অতিরিক্ত সময়ের চাপ, ফ্রান্সের নিষ্ঠুর প্রত্যাবর্তন, টাইব্রেকারের অনিশ্চয়তা কোনকিছুই তাকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি যখন তার হাতে উঠল, সেটি শুধু মেসির ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না। সেটি ছিল আর্জেন্টিনার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এবং একটি প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরে আসে আর্জেন্টিনায়। এই ট্রফির জন্য একটি প্রজন্ম অপেক্ষা করেছিল। সেদিন মেসি আর্জেন্টিনাকে শুধু একটি ট্রফি দেননি। তিনি তাদের বিশ্বাস করার ক্ষমতাটাও সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, ‘ফুটবলে মেসি যা দিয়েছে তা আর কেউ দিতে পারেনি।’
ম্যারাডোনার যুগের পর আর্জেন্টিনা তো এমন একজন নেতার অপেক্ষাতেই ছিল, যিনি একই সঙ্গে প্রতিভা ও দায়িত্বের শক্তিশালী এক প্রতীক হতে পারেন। মেসি সেই জায়গাটি নিজের মতো করে পূরণ করেছিলেন। তার নেতৃত্ব ছিল অনেকটা নীরব আগুনের মতো। শব্দ কম, কিন্তু প্রভাব গভীর। তাই আর্জেন্টিনার পুনর্জন্মকে যদি একটি মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতেই হয়, তবে সেটি কেবল তার বাঁ-পায়ের জাদুর কারণে নয়। কারণ মেসি শুধু গোল করেননি, তিনি সতীর্থদের বিশ্বাসকে শক্তপোক্ত করেছেন। মেসি শুধু ম্যাচ জেতেননি, দলকে জিততে শিখিয়েছেন। তিনি শুধু একটি ট্রফি জেতেননি, একটি জাতির হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছেন। মেসির হাতেই তাই আর্জেন্টিনার পুনর্জন্ম। শুধু একজন ফুটবলারের হাতে নয়, একজন সারথীর হাতে।
ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার ফুটবলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, মেসি সেটি শুধু পূরণই করেননি; নিজের গল্প দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলের নতুন অধ্যায় লিখেছেন। তার হাত ধরে জাতীয় দল ফিরে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস, হারিয়েছে দীর্ঘদিনের মানসিক ভার, আর নতুন প্রজন্ম পেয়েছে নতুন স্বপ্ন। তাই মেসির গল্প শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি একটি জাতির পুনর্জাগরণের গল্প।









