বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা নিরাপত্তার কোন খোঁজ নেয় নি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
বুধবার পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব তথ্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।
বুধবার (২৫ অক্টোবর) তৃতীয় দিনেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান যুক্তিতর্কে বলেন, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নেননি, তার কার্যালয় ঘটনাস্থলের পাঁচ’শ গজের ভেতর হলেও একবারও ঘটনার আগে বা পরে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নি। মূল আসামিদের প্রশাসনিক সহায়তা দেন। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতর কোনো প্রতিবেদনও দেয়নি।
তিনি বলেন: ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপ-কমিশনার ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেন নাই। ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেনেড আক্রমণের সুবিধায় ও রক্ষার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেননি। এ ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌসুলি সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান যুক্তিতর্কের বক্তব্যে আরো বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।
তিনি বলেন, ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় মোট ১৫টি গ্রেনেড ব্যবহার হয়। এর আগে হামলার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবনে বৈঠকে। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ অনেকে। এরপর সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে বৈঠক করে সেখান থেকেই গ্রেনেড তুলে দেয়া হয় জঙ্গি নেতাদের হাতে।
বুধবার তৃতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন আগামী সোমবার ধার্য করেন।
মামলায় খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম জামিনে আছেন।
অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে।
মামলার আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবং সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার মামলায় হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ জন আহত হন।
সন্ত্রাসবিরোধী ওই সমাবেশে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্র গ্রেনেড হামলা ও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। এতে অল্পের জন্য শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি কিছুটা নষ্ট হয়।
এ ঘটনায় পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে, যা পরে তদন্তে প্রমাণিত হয়।









