বাংলাদেশে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) অর্থায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ‘ইকোসিস্টেম ম্যাপিং এন্ড ডায়াগনস্টিক স্টাডি অন ফাইন্যান্সিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের ‘ব্রিডজিং দ্যা গ্যাপ: আনলকিং স্মল বিসনেস ফিনান্স দো ফিনটেক পার্টনারশিপস’ উদ্যোগের আওতায় সেমিনারটি আয়োজন করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে লাইট ক্যাস্টেলে পার্টনার। এতে বাস্তবায়নকারী পার্টনার হিসেবে ছিল এসএমই ফাউন্ডেশন এবং স্ট্রাটেজিক পার্টনার ছিল ভিসা।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৭১ লাখ ৬০ হাজার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, যা দেশের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬১ দশমিক ২ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। তবে এমএসএমই খাতে আনুমানিক ২৮০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দেশের মোট এমএসএমইর ৯২ দশমিক ৬ শতাংশই ক্ষুদ্র বা মাইক্রো উদ্যোগ। অথচ বিতরণ করা মোট এমএসএমই ঋণের মাত্র ১৪ শতাংশ পায় এসব প্রতিষ্ঠান। ফলে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নে ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রবেশে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
৩২৯টি এমএসএমইর ওপর জরিপ, ১৯ জন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার, ১২টি গভীর সাক্ষাৎকার এবং চারটি ফোকাস গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবসা অর্থের ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। ৮৬ শতাংশ সাধারণত ঋণ নেয়। তবে মাত্র ৫৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণের জন্য আবেদন করেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া আনুষ্ঠানিক ঋণ আবেদনকারীদের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৬২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এতে বোঝা যায় অনেক ব্যবসা আনুষ্ঠানিক ঋণের জন্য আবেদন করার পর্যায়েই পৌঁছাতে পারছে না।
ডিজিটাল অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ এমএসএমইর অনলাইন বা ডিজিটাল উপস্থিতি রয়েছে এবং ৯৭ শতাংশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। অথচ মাত্র ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঋণ পেয়েছে।
বর্তমানে প্রচলিত ডিজিটাল ঋণপণ্যের বেশিরভাগই ৫০ হাজার টাকা বা তার কম এবং স্বল্পমেয়াদি। বিপরীতে প্রায় ৬০ শতাংশ এমএসএমই তিন লাখ টাকার বেশি ঋণ চায় এবং ৮৫ শতাংশ ছয় মাসের বেশি মেয়াদের ঋণ পছন্দ করে। এমএসএমইর নেওয়া মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যবসার চলতি মূলধনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় নারী উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতের ব্যবসাকে ডিজিটাল ঋণের পরীক্ষামূলক উদ্যোগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিজিটাল ঋণ সম্পর্কে আগে ধারণা না থাকা নারীদের ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ এ ধরনের ঋণে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একইভাবে সেবা খাতের ৮৬ শতাংশ ব্যবসা ডিজিটাল ঋণের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় ফিন্যান্স ও প্রযুক্তিতে সহজ প্রবেশাধিকার, ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি এবং অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও মানসম্মত ও ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ, ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে দূরত্ব কমানো, ডিজিটালভাবে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে বিকল্প পদ্ধতিতে ঋণগ্রহীতার ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। তবে এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য ব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং গ্রাহকের সম্মতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গবেষণায় চারটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, আন্তঃসংযোগযোগ্য ও গ্রাহকের সম্মতিভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা তৈরি, ছোট অঙ্কের ঋণকে বাণিজ্যিকভাবে আরও কার্যকর করা এবং দায়িত্বশীল আর্থিক উদ্ভাবনের জন্য নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা।
অনুষ্ঠানে দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার, ইনোভেশন অ্যান্ড ফিউচার ইকোনমি এবং ‘ব্রিডজিং দ্যা গ্যাপ’ কর্মসূচির প্রকল্প প্রধান ফিলিপ গ্রাওভাক বলেন, ‘আমাদের মূলধনের অভাব নেই, নীতিগত উদ্যোগেরও অভাব নেই; এই দুটির মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব আছে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে সবার জন্য একই ধরনের নীতিমালা তৈরি না হয়।
সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক কোম্পানি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।









