সকাল আটটা। প্রগতি সরণি কিংবা মিরপুর রোড—চিরচেনা সেই কানফাটানো হর্ন, গাড়ির কালো ধোঁয়ার দমবন্ধ করা পরিবেশ আর অন্তহীন স্থবিরতা। এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে যেখানে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সেখানে এক দিনের জন্য হলেও যদি রাজপথ ফিরে পায় তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণ?
প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হওয়া বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস (ওয়ার্ল্ড কার ফ্রি ডে) ঢাকার মতো তীব্র যানজটের নগরীর জন্য এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি বার্তা বয়ে আনে।
ঢাকা ও ব্যক্তিগত গাড়ির এক অসম যুদ্ধ
ঢাকার গণপরিবহন ও যানজট পরিস্থিতি এখন আর কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, এটি এক চরম সংকটে রূপ নিয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী ব্যক্তিগত গাড়িগুলো (প্রাইভেট কার ও এসইউভি) মোট যাত্রীর মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ পরিবহন করলেও সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি জায়গা দখল করে রাখে।
অফিস কিংবা নামী স্কুলগুলোর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর কারণে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য বাসের মতো গণপরিবহনের সংখ্যা ও মান অত্যন্ত নাজুক। এই অসম পরিবহন ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
কেন ঢাকার জন্য এই দিবসটি অতি জরুরি?
জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই শীর্ষস্থান দখল করে। ব্যক্তিগত গাড়ির অতিরিক্ত ব্যবহার বাতাসে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাস্তা শুধু ব্যয়বহুল যান্ত্রিক যানের নয়, রাস্তা সাধারণ মানুষেরও। এক দিনের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে, যা এই ইট-পাথরের নগরীকে কিছুটা হলেও শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
ঢাকা যেভাবে হয়ে উঠতে পারে বাসযোগ্য ও টেকসই
মেট্রোরেল (এমআরটি) চালু হওয়ার পর ঢাকা দেখিয়েছে যে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন কীভাবে মানুষের যাতায়াত সহজ করতে পারে। তবে শুধু মেট্রোরেলই যথেষ্ট নয়, ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব ও গতিশীল শহর গড়ে তুলতে ৩টি বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি:
- বাস রুট রেশনালাইজেশন ও বাসের আধুনিকায়ন: ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে ঢাকার বাস ব্যবস্থাকে আরামদায়ক ও সময়োপযোগী করা গেলে মধ্যবিত্ত শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ব্যক্তিগত গাড়ি পরিহার করবে।
- হাঁটার পরিবেশ ও ফুটপাত উদ্ধার: ঢাকার প্রায় ৪০% মানুষ স্বল্প দূরত্বে হেঁটে যাতায়াত করে। ফুটপাতগুলো হকার ও অবৈধ পার্কিংমুক্ত করে পথচারীবান্ধব করা গেলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
- নিরাপদ সাইকেল লেনের প্রবর্তন: তরুণ ও কর্মজীবী মানুষের জন্য প্রধান সড়কগুলোতে নিরাপদ ও সংযুক্ত সাইকেল লেন তৈরি করলে তা একদিকে যেমন দূষণ কমাবে, অন্যদিকে যানজট এড়াতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র একটি দিন গাড়ি না চালিয়ে আমরা হয়তো ঢাকার যানজট একবারে মুছে ফেলতে পারব না। কিন্তু এই একটি দিন আমাদের চিন্তার খোরাক জোগায়। এটি আমাদের নীতি নির্ধারক এবং সাধারণ নাগরিকদের এক টেবিলে এনে দাঁড় করায়। গাড়ির চাকা থামিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার কিংবা পায়ে হাঁটার এই অভ্যাসটি যদি আমরা ঢাকার বুকে ছড়িয়ে দিতে পারি, তবেই সার্থক হবে এই দিবসের মূল চেতনা। অবসান ঘটবে ঢাকার চাকার চিরস্থায়ী স্থবিরতার।









