“খোকন খোকন ডাক পারি
খোকন মোদের কার বাড়ি?
আয় রে খোকন ঘরে আয়
দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।”
একসময় এই ছড়াটি ছিল মায়েদের মুখে মুখে। তখন মানুষ আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। মায়েরা ছড়া বলে, গল্প শুনিয়ে সন্তানদের ঘুম পাড়াতেন। শিশুরা যখন ১২-১৩ বছরে পা রাখত, তখন শুরু হতো গল্প শোনার পালা। আমরাও মায়ের মুখে শুনেছি রাক্ষস-খোক্কসের গল্প, নারিকেলমতি কন্যা, কুঁচবরণ কন্যা, রাখাল বন্ধুর গল্প, ডায়িনী আর সাত পাহাড়ের গল্প- কত কী!
আমিও ভাতিজাকে গল্প বলে ঘুম পাড়াতাম। ‘ছুটি’ গল্পে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন “বার -তের বছরের মত এমন বালাই আর নাই।” গল্পের শুরুতেই, বালকদিগের সর্দার ফটিক বন্ধু বা দল নিয়ে কাঠের গুড়ি ঠেলে অন্যত্র নিয়ে যাবে, ফটিকের ছোটো ভাই মাখন কাঠের গুড়ির উপর বসে থাকে অনড়। ফটিকের নির্দেশ বালকেরা মাখনকে শুদ্ধ কাঠের গুড়ি ঠেলতে থাকে। এমন সময় ফটিকের মামা আসেন এবং এক পর্যায়ে ফটিককে কলকাতায় নিয়ে গেলে শুরু হয় ফটিকের কলকাতার জীবন।
‘ছুটি’ গল্পটি যে বা যারা পড়েছেন, গল্পের ফটিকের জন্য চোখের জল ফেলেননি এমন পাঠক হয়তো নেই। ঠিক তেমনি অপ্রতিমের মৃত্যুতে মায়াবী মুখটা দেখে নিশ্চয়ই কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার বিকেল ৩টায় মায়ের আই ফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বাইরে যান। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১৩ বছরের অপ্রতিমকে ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) পাওয়া যায়, নিথর দেহ।
অপ্রতিমের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজ পড়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভালোভাবে বিদায় নিয়েই বাইরে গিয়েছিল সে। কে জানত, সেটিই হবে মা-বাবার সঙ্গে তার শেষ দেখা!
সব ঘটনা যে নিছক দুর্ঘটনা, তা কিন্তু নয়। কোথাও বৃদ্ধ মা-বাবা লাঞ্ছিত হচ্ছেন, কোথাও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আবার প্রতিনিয়ত নারী নিপীড়নের ঘটনাও ঘটছে। এরপর হত্যাকারী, ধর্ষক কিংবা অত্যাচারীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি ওঠে। রাজপথে স্লোগান হয়-‘বিচার চাই, বিচার চাই।’
আইনের শাসন এতোটাই দুর্বল যে, অপরাধ করতে কোনো ভয়, সংকোচ বা কোনো পরোয়া নেই। প্রশ্ন হলো, আমাদের আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা কি অপরাধীদের যথেষ্ট ভয় দেখাতে পারছে? অপরাধ করার আগে একজন মানুষকে থামিয়ে দেওয়ার মতো সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর বিচারের দাবি জানিয়ে কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
অপ্রতিমের ঘটনায় কয়েকজন কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও দায় প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রাখতে হবে- কীভাবে একজন কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে? একটি শিশু বা কিশোরকে অপরাধী হয়ে ওঠার পথে ঠেলে দেওয়ার পেছনে পরিবার, শিক্ষা, পরিবেশ ও সমাজের কোনো দায় নেই?
একটি শিশু কীভাবে বেড়ে উঠছে, তার চারপাশে সে কী দেখছে, পরিবার থেকে কী শিখছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে কী মূল্যবোধ দিচ্ছে- এসব প্রশ্নও কি আমাদের ভাবা উচিত নয়? সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা যদি কেবল ব্যবসায় পরিণত হয় আর মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পিছনে পড়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কী শেখাচ্ছি? এগুলো এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে। “সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









