দক্ষিণ সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলায় সম্প্রতি ৭৩ জন আহত হয়েছেন। স্যাটেলাইট ছবিতে জাজানের তেল শোধনাগারের ওপর ঘন কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। একই সময়ে মার্কিন বাহিনী পাঁচটি ইরানি তেলের ট্যাংকার ডুবিয়ে দিয়েছে। ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সবচেয়ে বড় খবর, ইয়েমেনের হুতিরা দখল করে নিয়েছে বন্দরশহর মোখা। লোহিত সাগরে ঢোকার মুখ বাব আল মান্দেব প্রণালী এই শহরের কাছেই। এক হরমুজ নিয়েই সারা বিশ্ব অস্থির, তার ওপর এখন মান্দেব। তেলের দাম জুলাইয়ের পর আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
এর মধ্যেই ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সৌদি সরকার অন্তত ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা শুরু করেছে। সরকারি তেল কোম্পানি আরামকোও আলাদা করে ঋণ খুঁজছে। দুই আলোচনাই এখনো শুরুর পর্যায়ে।

সৌদির ঋণ কেন চিন্তার
মাটির নিচে তেলের সাগর নিয়ে বসে থাকা দেশ ঋণ চাইছে, শুনতে অবাক লাগে। সৌদি আরব আগেও ঋণ নিয়েছে, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বড় বড় প্রকল্পের খরচ মেটাতে। গত বছরের শেষেও ১৩ বিলিয়ন ডলারের একটা ঋণ নিয়েছিল। এবার তফাত অন্য কারণে। ব্লুমবার্গ লিখেছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্যেই এই ঋণের খোঁজ।
এপ্রিল থেকে জুনে সৌদি অর্থনীতি করোনার পর সবচেয়ে দ্রুত হারে ছোট হয়েছে। তেল খাত কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বছরের প্রথম ছয় মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪২.৬ বিলিয়ন ডলারে, অথচ সৌদি সরকার পুরো বছরের জন্য ধরেছিল ৪৪ বিলিয়ন।
তেলের দাম চড়া, তবু আয় কমছে। কারণ তেল বেচার পথই আটকে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ, তাই সৌদি আরব পাইপলাইনে তেল নিয়ে যাচ্ছে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে। জুলাই থেকে হুতিরা সেই পথেও সৌদি ট্যাংকার আর তেল স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে।
সৌদি আরব দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। দেশটির মোট ঋণ জিডিপির ৩৪ শতাংশের মতো, এসঅ্যান্ডপি ও মুডিস রেটিং কমায়নি। ভয়টা অন্য জায়গায়। তেল বেচে যে দেশ এই দামে সবচেয়ে বেশি লাভ করার কথা, সে-ই যদি ঋণ খোঁজে, তাহলে তেল কিনে চলা দেশগুলোর ওপর চাপ কতটা, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব
জুলাইয়ে আইএমএফ ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দ্বিতীয়বার কমিয়ে ৩ শতাংশে নামায়। মূল্যস্ফীতি ধরা হয় ৪.৭ শতাংশ। সেই হিসাব দাঁড়িয়ে ছিল একটা অনুমানের ওপর: জুলাইয়ের মাঝামাঝি হরমুজ খুলতে শুরু করবে। খোলেনি।
এপ্রিলেই আইএমএফ আরেকটা হিসাব দিয়েছিল। তেলের গড় দাম ১০০ ডলারের কাছে থাকলে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি নামবে ২.৫ শতাংশে। সরবরাহের সমস্যা আগামী বছর পর্যন্ত গড়ালে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ শতাংশের মতো, যাকে সংস্থাটি বৈশ্বিক মন্দার একেবারে কাছাকাছি অবস্থা বলেছে। ১৯৮০ সালের পর মাত্র চারবার বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমেছে।
মূল্যস্ফীতির ভয়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর চাপে আছে। গত বছর চীন ও এশিয়ার ব্যাংকগুলো উপসাগরের দেশগুলোকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দিয়েছে। সৌদি আরবের মতো বড় গ্রাহক আরও ঋণ চাইলে বাজারে টাকা টানাটানি বাড়তে পারে, আর তার খরচ গুনতে হতে পারে বাংলাদেশের মতো দেশকেও।
মার্কিন-ইরান চুক্তি কেন হচ্ছে না
১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। কথা ছিল ৬০ দিন আলোচনা চলবে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলবে, ইরান হরমুজ থেকে মাইন সরিয়ে জাহাজ চলতে দেবে। কিন্তু প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, এ নিয়ে দুই পক্ষ দুই রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। ৮ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সমঝোতা শেষ। আগস্টের মাঝামাঝি ৬০ দিনের মেয়াদও ফুরিয়ে যায়।

এরপর ট্রাম্পের কথায় আলোচনার চেয়ে জেদই বেশি শোনা গেছে। আগস্টে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘আধা-আলোচনা’ চলছে, তিনি শুধু দেখছেন ইরানে মূল্যস্ফীতি কত আর তাদের হাতে টাকা নেই। প্রতিনিধিদের বলেছেন ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে।
এই সপ্তাহে ডালাসে দলীয় সভায় তিনি হরমুজের নাম ‘ট্রাম্প প্রণালী’ রাখার কথা তোলেন, বলেন কিছু একটা তো তাঁর পাওয়া উচিত। যুদ্ধ কবে থামবে, এই প্রশ্নে বলছেন নির্বাচনের ঠিক পরে। জর্ডানের ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করেছেন। সিবিএস ও রয়টার্সের সূত্র অবশ্য বলছে, একটি এ-১০ বিমানের ডানা ভেঙেছে, আটটির মতো এফ-১৫ হালকা ক্ষতির পর আবার কাজে ফিরেছে।
তেহরানও নরম হয়নি। নিষেধাজ্ঞা তোলা, ক্ষতিপূরণ আর হামলা বন্ধের শর্ত না মানা পর্যন্ত হরমুজ খুলবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক রবার্ট পেপ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে লিখেছেন, ইরানের কৌশল হলো যুদ্ধকে এত খরুচে করে তোলা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আর চালাতে না চায়। ট্রাম্প ভাবছেন অর্থনৈতিক চাপে ইরান আগে নতি স্বীকার করবে! মাঝখানে আটকে আছে বিশ্বের তেল আর গ্যাস, প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে।
বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি
গ্যাস ও বিদ্যুৎ
গত বছর বাংলাদেশ যত এলএনজি এনেছিল, তার ৬০ শতাংশের বেশি এসেছিল কাতার থেকে। কাতারের গ্যাসবাহী জাহাজ বের হয় হরমুজ দিয়ে। সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গো কেনা হচ্ছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলারের বেশি দামে, যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ১০ থেকে ১২ ডলার। একেকটি কার্গোর দাম পড়ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
দাম বেশি বলে কেনাও কমেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্টে এলএনজি আমদানি আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম। অথচ গত বছর দেশের ৬৪ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে গ্যাস থেকে।
সৌরশক্তি দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে সরকার। জনগণ পর্যায়ে সৌরবিদ্যুত উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছে ইতিমধ্যে। যা হয়তো বড় ধাক্কা বা দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারবে না, তারপরেও এ চেষ্টা ইতিবাচক।
এপ্রিলে গ্যাসের টানে সরকারি পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার চারটি অন্তত ১৫ দিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। যুদ্ধ গড়ালে কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ভাগাভাগির সেই অবস্থা আবার ফিরতে পারে।
তেল ও বাজারদর
এপ্রিলে সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা আর অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা করে। এর পরের তিন মাসে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯.২১ শতাংশে, বেড়েছে পরিবহন আর সবজির খরচ।
তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়ানোয় পাম্পে দাম বাড়ার চাপ ফিরছে। বাংলাদেশ সৌদি আরামকোর কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনে, আর ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় আসা জাহাজকে বাব আল মান্দেব পার হতে হয়। হুতিরা এই প্রণালীতে জাহাজ আটকালে সরবরাহ পিছিয়ে যেতে পারে। বাসভাড়া থেকে চাল-ডাল, সবখানে তার ধাক্কা লাগবে।

প্রবাসী শ্রমিক
সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। দেশের রেমিট্যান্সের ৪৫ শতাংশের বেশি আসে উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে।
রেমিট্যান্স এখনো ভালো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এসেছে ৩২.৭৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছর একই সময়ে ২৭.৫১ বিলিয়ন। কিন্তু নতুন কর্মী যাওয়া কমছে। জুন পর্যন্ত চার মাসে বিদেশে কর্মী পাঠানো করোনার আগের পর্যায়ে নেমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিল পর্যন্ত আমিরাত, সৌদি, বাহরাইন ও লেবাননে অন্তত ৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেছেন।
ঋণ নিয়ে চলা সরকার খরচ কমাতে চাইলে সাধারণত আগে হাত দেয় নির্মাণ প্রকল্পে। সৌদিতে বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজ করেন নির্মাণ, পরিবহন আর পেট্রল পাম্পে। প্রকল্প থামলে প্রথম ধাক্কা লাগতে পারে নতুন ভিসায়, পরে বেতন আর চাকরিতে। যারা এখন সৌদি যাওয়ার জন্য টাকা জোগাড় করছেন, দালালের হাতে টাকা দেওয়ার আগে বিএমইটি বা দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা ও ভিসা যাচাই করে নিলে ঝুঁকি কমে।
পোশাক রপ্তানি
ইউরোপে পোশাক পাঠানোর জাহাজ যায় লোহিত সাগর আর সুয়েজ খাল হয়ে। মোখা হাতছাড়া হলেও বাব আল মান্দেব বন্ধের ঘোষণা এখনো আসেনি, পেরিম দ্বীপ দখলের দাবিও কেউ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। পথ বন্ধ হলে জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হবে, তাতে সময় আর ভাড়া দুটোই বাড়বে।
এই সময়ে কী করা যায়
ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ থামার সময় বেঁধে দিয়েছেন নভেম্বরের নির্বাচনের পরে। সেই কথা সত্যি হলেও অন্তত শীতের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশকে চড়া দামের তেল আর এলএনজি কিনেই চলতে হবে। কথা না মিললে সংকট আরও লম্বা হবে। তাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকার পাশাপাশি নিজের ঘরেও কিছু প্রস্তুতি রাখা ভালো।
প্রথম কাজ মাথা ঠান্ডা রাখা। যুদ্ধের সময় ফেসবুক-ইউটিউবে নানা খবর ছড়ায়, যার অনেকটাই বাড়িয়ে বলা। সৌদির দেউলিয়া হওয়া ও ঋণের অঙ্ক নিয়েও ‘ভুল তথ্য’ ঘুরেছে।
দাম বাড়বে, এই গুজবে একসঙ্গে বেশি চাল, সয়াবিন তেল বা গ্যাস সিলিন্ডার কিনে না রাখাই ভালো। মার্চে ঢাকার পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনের কথা অনেকের মনে আছে। সবাই একসঙ্গে মজুত করতে গেলে বাজারে টান পড়ে, আর দাম বাড়ে সবার জন্যই।

সংসারের খরচে এখনই একটু লাগাম টানতে পারেন। আয়ের ছোট একটা অংশ হলেও আলাদা করে রাখুন, যাতে হঠাৎ দাম বাড়লে বা আয় কমলে দু-তিন মাস সামলানো যায়। মূল্যস্ফীতি যখন ৯ শতাংশের ওপরে, তখন কিস্তিতে বড় কেনাকাটা বা নতুন ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটু পিছিয়ে দেওয়াই নিরাপদ। অকারণে বাতি, পাখা, এসি চালিয়ে রাখা আর চুলা জ্বালিয়ে রাখা বন্ধ করলে বিলও কমে, দেশের আমদানির চাপও কিছুটা কমে। সামর্থ্য থাকলে ব্যক্তি পর্যায়ে বা শিল্পপর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যাকআপ সিস্টেমে গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
যাদের পরিবারের কেউ মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, পাঠানো টাকার পুরোটা খরচ না করে কিছু অংশ জমিয়ে রাখুন। চাকরি গেলে বা বেতন আটকে গেলে এই জমাই প্রথম ভরসা। প্রবাসে থাকা ভাইবোনেরা পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের চুক্তির কপি ফোনে আর কাগজে দুই জায়গাতেই রাখুন, দূতাবাসের জরুরি নম্বর সেভ করে রাখুন। জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই মুহূর্তে কাউকে বিদেশে পাঠানোর আগে ভাল করে চিন্তা করুন।
যাদের ব্যবসা পরিবহন, ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর চলে, তারা সামনের কয়েক মাসে খরচ বাড়ার হিসাব ধরে মজুত আর দাম ঠিক করলে হঠাৎ লোকসানের ঝুঁকি কমবে।
যুদ্ধটা হাজার মাইল দূরে হলেও তার জন্য খেসারত দিচ্ছেন মিরপুরের পাম্পে লাইনে দাঁড়ানো রাইডার থেকে শুরু করে টাঙ্গাইলের প্রবাসী পরিবার পর্যন্ত সবাই। আতঙ্কে নয়, বরং হিসাব করে চলাই এখন সবচেয়ে কাজের প্রস্তুতি হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









