মৃত মানুষকে কি প্রযুক্তির সাহায্যে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব? আর যদি প্রিয় কোনো মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে অবিকল ফিরে আসে, তখন তাকে কি সত্যিই আগের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব? এমনই গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে জাপানি নির্মাতা হিরোকাজু কোরিদার নতুন সিনেমা ‘শিপ ইন দ্য বক্স’।
গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যাপল, অ্যামাজনসহ কয়েকটি স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে আসার পর নতুন করে আলোচনায় সিনেমাটি!
২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে সিনেমাটি। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক দম্পতি এবং তাদের মৃত সাত বছর বয়সী সন্তান কাকেরু। দুই বছর আগে সন্তানকে হারানোর পরও তার শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। এমন সময় রিবার্থ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের জানায়, শোকাহত পরিবারগুলোকে পরীক্ষামূলকভাবে অত্যাধুনিক মানবসদৃশ যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। সেই যন্ত্রে মৃত কাকেরুর স্মৃতি ও তথ্য যুক্ত করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘কাকেরু’ নামের একটি কৃত্রিম সন্তান।
সিনেমায় দম্পতি ওতোনে ও কেনসুকে চরিত্রে অভিনয় করেছেন আয়াসে হারুকা ও দাইগো। পেশায় স্থপতি ওতোনে নতুন কাকেরুকে সহজেই নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে চান। অন্যদিকে তার স্বামী কেনসুকে শুরু থেকেই বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না। তার কাছে যন্ত্রটি কেবল একটি যন্ত্রই। তিনি কোনোভাবেই মানতে নারাজ যে, মৃত সন্তান আবার ফিরে আসবে!
তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। কাকেরু যখন ট্রেনের বিভিন্ন স্টেশনের নাম মুখস্থ করে বলতে থাকে, তখন নিজের সন্তানের পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায় কেনসুকের। তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসেন, আবেগাপ্লুত হন। অন্যদিকে ওতোনে নতুন কাকেরুকে ঘিরেই নিজের জীবন সাজাতে শুরু করেন। এমনকি যন্ত্রটি খেতে পারে না বলে তিনিও খাবার না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! যেন জীবিত মানুষ হয়েও তিনি ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে সেই যন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন।
এখানেই সিনেমাটি কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না! বরং হিরোকাজু দেখিয়েছেন, প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষ কীভাবে শোক সামলায় এবং সেই শূন্যতার সঙ্গে কীভাবে বসবাস করতে শেখে।
কেনসুকে বাস্তবতাকে মেনে নিতে চান। তার কাছে সন্তান মারা গেছে- এই সত্য বদলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই তিনি নতুন কাকেরুকে গ্রহণ করতে পারেন না। একই সঙ্গে তিনি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেন, কেন তার সন্তান মারা গেল, এর জন্য কে দায়ী! মনে করার চেষ্টা করেন। বিপরীতে ওতোনে সন্তানের অনুপস্থিতি মেনে নিতে পারেন না। তাই কৃত্রিম কাকেরুর মধ্যে তিনি যেন হারিয়ে যাওয়া অতীতকে আবার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন।
হিরোকাজুর সিনেমায় প্রিয়জন হারানোর বিষয়টি নতুন নয়। ১৯৯৫ সালে ‘মাবোরোশি’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর থেকেই মৃত্যু, অনুপস্থিতি, স্মৃতি এবং শোক তাঁর চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘আফটার লাইফ’, ‘স্টিল ওয়াকিং’ ও ‘আওয়ার লিটল সিস্টার’-এর মতো সিনেমাতেও মৃত মানুষের অনুপস্থিতি কীভাবে জীবিতদের জীবনে প্রভাব ফেলে, তা তিনি তুলে ধরেছেন। ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ সেই ধারাকেই নতুন প্রযুক্তির বাস্তবতায় নিয়ে গেছে।
সিনেমাটির নামও এসেছে আন্তোয়ান দ্য সাঁত-একজুপেরির বিখ্যাত বই ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ থেকে। গল্পে রাজপুত্র যখন একটি ভেড়া আঁকতে বলে, তখন বারবার আঁকা ছবিতে সন্তুষ্ট না হয়ে শেষ পর্যন্ত একটি বাক্স আঁকার পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, ভেড়াটি ওই বাক্সের ভেতর রয়েছে। রাজপুত্র তখন নিজের কল্পনায় সেই ভেড়াটিকে দেখতে পায়।
হিরোকাজু কোরিদার সিনেমায় কৃত্রিম কাকেরুও যেন তেমনই এক ‘বাক্স’। তার ভেতরে কী আছে, তা কেউ দেখতে পারে না। সে একই সঙ্গে মৃত সন্তানের স্মৃতি, বাবা-মায়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি এবং পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করতে থাকা এক নতুন সত্তা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাকেরুও বদলাতে থাকে। বাবার নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের কাঠ কাটার কাজ দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। মায়ের স্থাপত্যকর্ম, গাছপালা ও প্রকৃতির সঙ্গেও তার পরিচয় বাড়ে। ফলে ধীরে ধীরে সে মৃত কাকেরুর পুরোনো স্মৃতির সীমা পেরিয়ে নিজের মতো করে পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনই সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি সামনে আনে- একজন মৃত মানুষের স্মৃতি দিয়ে তৈরি কোনো কৃত্রিম সত্তা যদি পরে নিজের অভিজ্ঞতায় বদলে যায়, তখন তাকে কি আগের মানুষ হিসেবেই দেখা সম্ভব?
নির্মাতা হিরোকাজু সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। বরং দর্শকের সামনে আরও প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। মানুষ কতটা পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রিয়জনকে আপন করে নিতে পারে? সেই সত্তার আচরণ যদি মৃত মানুষটির স্মৃতির সঙ্গে না মেলে, তখন ভালোবাসার সম্পর্কটি কোথায় দাঁড়াবে? মৃতকে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি যদি সত্যিই একদিন বাস্তব হয়, তাহলে মানুষ কি শোককে মেনে নেওয়ার প্রয়োজনই হারিয়ে ফেলবে?
সিনেমাটিতে স্থাপত্য ও প্রকৃতির উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তার তৈরি স্থাপনা থেকে যায়, কারিগরের কাজ টিকে থাকে। একইভাবে একটি গাছ মানুষের জীবনের চেয়ে বহু দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। অর্থাৎ মানুষের জীবন, স্মৃতি ও অস্তিত্বের সময়সীমার বাইরে আরও দীর্ঘ এক সময়ের কথা ভাবতে চেয়েছেন নির্মাতা।
এখানে কৃত্রিম কাকেরু আরও এক ধরনের অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। তার মানুষের মতো জীবন নেই, অথচ সে হয়তো মানুষের চেয়েও দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। ফলে সিনেমাটি জীবিত ও মৃতের পাশাপাশি জীবন, স্মৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের অর্থ নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের জীবনের নানা ক্ষেত্রে দ্রুত প্রবেশ করছে, তখন প্রযুক্তিকে ঘিরে তৈরি সিনেমাগুলো থেকে বাস্তবসম্মত নৈতিক বা প্রযুক্তিগত উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু হিরোকাজু সেই পথে হাঁটেননি। তিনি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছেন মানুষের মনের গভীরে থাকা একটি অসম্ভব আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করতে- মৃত প্রিয়জনকে আবার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
‘শিপ ইন দ্য বক্স’-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাই মূল বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের শোক, ভালোবাসা, স্মৃতি ও বিচ্ছেদের গল্প বলার একটি মাধ্যম। মৃত সন্তানকে ফিরে পাওয়ার এই অসম্ভব স্বপ্নের মধ্য দিয়ে হিরোকাজো শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছেন- ভালোবাসার মানুষ চলে যাওয়ার পর সেই ভালোবাসা কোথায় গিয়ে থামে, আর শোককে অতিক্রম করার পথই বা কতটা কঠিন। নিপ্পন









