বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক অস্ট্রেলীয় নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের নথি থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি)।
এএফপির দাবি, ওই ব্যক্তি বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া এবং ফৌজদারি তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ার আদালতে করা এটি এএফপির প্রথম মামলা।
কুইন্সল্যান্ডের রেডব্যাংক প্লেইনসের বাসিন্দা ওই ব্যক্তি নিহত নারীর পূর্বপরিচিত। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তাকে ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পাঠিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে ওই নারীর মৃত্যুর তদন্ত নিজের অনুকূলে প্রভাবিত করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত নথি ও রেকর্ড থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস (কিউপিএস) এএফপিকে জানায়, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা এক নারী বাংলাদেশে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। পরে বাংলাদেশ পুলিশ অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, বাংলাদেশে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের ফরেনসিক পরীক্ষায় পরে ওই নারীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বলে নিশ্চিত করা হয়। ঘটনাটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশ।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিমিনাল কোডের ১১৫ ধারার আওতায় বিদেশে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের হত্যা, অপমৃত্যু বা গুরুতর ক্ষতির ঘটনায় আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রয়েছে এএফপির। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি এএফপিও আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে সিডনি ও ব্রিসবেনের একাধিক আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালায় এএফপি। এ সময় আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
দুই বছরের তদন্ত শেষে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইনস এলাকার দুটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালায় এএফপি। সেখান থেকে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ফৌজদারি আইনের ৭০.২ (১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
এএফপির কমান্ডার স্টিফেন জয় বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা বিদেশে বিচারিক বা তদন্ত প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগকে এএফপি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে, বিশেষ করে যখন কোনো গুরুতর অপরাধের তদন্তের ফল পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, অর্থের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের আইনগত জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এএফপি আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তবে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর মূল তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলীয় পুলিশ।









