ভারতে কয়লার সরবরাহ সংকটে ৪৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মজুত কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও। কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটিতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সমন্বয় করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, রেলপথে তীব্র যানজট ও পণ্য পরিবহনে একাধিক বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনের রেক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম কয়লা পাওয়ায় উৎপাদন সাময়িকভাবে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
কোম্পানিটি জানায়, সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনের কম চাহিদার সময়ে সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) জানানো হয়েছে।
আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, স্বাভাবিক কয়লা পরিবহন দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে কাজ করছে তারা। পরিস্থিতি শিগগির স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সর্বোচ্চ পরিমাণ কয়লা পৌঁছানো এবং সরবরাহে প্রভাব কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের ৪৫ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংকটজনক কয়লা মজুত
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির ৪৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় মজুতের ২৫ শতাংশেরও কম কয়লা ছিল। এসব কেন্দ্রে তিন দিনের কম সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কয়লা মজুত রয়েছে। জুলাইয়ের শেষে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৩১টি।
কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (সিইএ) তথ্য অনুযায়ী, সংকটে থাকা ৪৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪০টি প্রধানত দেশীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল।
বর্ষাকালে ওডিশা, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ের মতো প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী রাজ্যে ভারী বৃষ্টির কারণে কয়লা উত্তোলন ও পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
আগস্টে কয়লার মজুত কমেছে ১৯ শতাংশ
পণ্যবাজারবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিগমিন্টের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষের তুলনায় আগস্টে ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়লার মজুত ১৯ শতাংশ কমেছে। ২৫ আগস্ট মজুত ছিল ৩ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টন। এই কয়লায় প্রায় ১০ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন চালানো সম্ভব। জুলাইয়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ দিনের জন্য।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটিজের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ভারতের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার মজুত ছিল ৩ কোটি ৪ লাখ টন। এতে প্রায় ১১ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলেও এটি প্রয়োজনীয় মজুতের মাত্র ৫৫ শতাংশ। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় মজুত ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
বর্ষায় সরবরাহ সংকট আরও তীব্র
ভারতের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনটিপিসির এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, কয়লার সরবরাহ এখন ‘হাতে হাতে’ চলছে। কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঁচ থেকে ছয়টি কয়লাবাহী রেক প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক।
একটি রেকে কয়লা পরিবহনের জন্য অনেকগুলো রেলওয়ে ওয়াগন থাকে। ফলে খনিতে পর্যাপ্ত কয়লা থাকলেও রেকের সংকট বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
কয়লার সরবরাহ সংকটের মধ্যে কিছু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পিছিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষমতা সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হলে কারিগরি ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতে সামগ্রিকভাবে কয়লার ঘাটতি না থাকলেও খনি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সরবরাহ, পরিবহন ও বণ্টন ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
আমদানি করা কয়লাতেও মিলছে না স্বস্তি
কয়লার ঘাটতি পূরণে আমদানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি করা কয়লার দাম বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ পথে খুব বেশি এগোচ্ছে না।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তাপীয় কয়লা আমদানি ২২ শতাংশ কমে ১ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। শুধু আমদানি করা কয়লায় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোর আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশ। দেশীয় কয়লার সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহারের জন্য কয়লা আমদানি কমেছে ৩৯ শতাংশ।
ফলে ভারতের অধিকাংশ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দেশীয় কয়লা ও রেল পরিবহনই প্রধান ভরসা হয়ে আছে।
বাংলাদেশেও কয়লার সংকট
আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোরও একই ধরনের কয়লা সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রও একটি করে ইউনিট দিয়ে আংশিকভাবে চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
আদানি পাওয়ারের মতে, এটি শুধু তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা নয়, বরং পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতজুড়ে দেখা দেওয়া একটি সংকট।
সেপ্টেম্বরে বৃষ্টি কম হলে পরিস্থিতির উন্নতির আশা
সেপ্টেম্বরে ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে কয়লা খনি ও রেল পরিবহনে বর্ষার কারণে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা কমতে পারে। আদানি পাওয়ারও আশা করছে, শিগগিরই কয়লা সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) জানিয়েছে, চার মাসের বর্ষা মৌসুমের শেষ মাস সেপ্টেম্বরে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।









