যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি আজ। হামলায় নিহতদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করছে মার্কিনিরা। তবে এত বছর পরও সেই ট্র্যাজেডি থেকে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট শিক্ষা নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। অন্যদিকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একাংশের দাবি, ২৫ বছর পরও হামলার নেপথ্যের সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে নিউইয়র্কের মানুষ যখন দিনের কাজ শুরু করছিলেন, তখন ছিনতাই করা দুটি যাত্রীবাহী বিমান ম্যানহাটনের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। মুহূর্তেই ভবন দুটিতে আগুন ও বিস্ফোরণ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ধসে পড়ে ১১০ তলা ভবন দুটি।
একই দিন আরেকটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত হানে। চতুর্থ বিমানটি ওয়াশিংটনের দিকে যাওয়ার সময় যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার একটি খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
পরে জানা যায়, চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে এসব হামলা চালানো হয়েছিল। হামলার সঙ্গে আল-কায়েদার ১৯ সদস্য জড়িত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। এতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা।
মামদানিকে ঘিরে বিতর্ক
৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতা ঘিরেও এবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছেন নিউইয়র্কের মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি।
মুসলিম সম্প্রদায় ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষ বেড়েছে। নিউইয়র্কের মুসলিম পরিবারগুলোর একটি অংশ এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
গত বছর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে একটি সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন মামদানি। এ কারণে ৯/১১-এর নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে একটি আবেদনে প্রায় এক লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। তাদের দাবি, মামদানি অনুষ্ঠানে অংশ নিলে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য তা অবমাননাকর হবে।
সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার নেপথ্যে সৌদি আরবের কথিত ভূমিকা নিয়েও নতুন করে জবাবদিহির দাবি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একাংশের অভিযোগ, হামলার সঙ্গে সৌদি আরব ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার কিছু প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআই বার্মিংহামে ওমর আল-বায়ুমির বাসায় অভিযান চালিয়েছিল। তাঁকে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর নোটবুকে বিমানের স্কেচ পাওয়া যায় এবং একটি ভিডিওতেও হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তিকে তাঁর সঙ্গে দেখা যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মতে, সৌদি আরব ও ওমর আল-বায়ুমি সংশ্লিষ্ট এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক
৯/১১ হামলার পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার এবং ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাত করে দেশটি।
সমালোচকদের দাবি, এই যুদ্ধের নামে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এবং বিনা বিচারে বহু মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ৯/১১-এর পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য বিনিময় বেড়েছে। এর ফলে বড় ধরনের কিছু সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
‘৯/১১ থেকে শিক্ষা নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র’
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছেন, ৯/১১-এর শিক্ষা এখনো যথাযথভাবে গ্রহণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে অনেক সমস্যা। এ কারণে বিশ্বের অন্য প্রান্তে কী হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা উদাসীন। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা ৯/১১-এর শিক্ষাটা গ্রহণ করিনি। কারণ বিদেশে যা ঘটে, তা দেশের অভ্যন্তরের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’
২৫ বছর পরও ৯/১১ হামলার স্মৃতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে। নিহতদের স্মরণে নানা আয়োজনের পাশাপাশি হামলার নেপথ্য, এর পরবর্তী যুদ্ধ এবং ইসলামবিদ্বেষের মতো বিষয়গুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।









