সংবিধানের ব্যাখ্যা যদি কাল ও সময়ের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম না হয়, তাহলে সংবিধান হয়ে দাঁড়ায় এক ‘ডেড লেটার।’
দেশের সাবেক অ্যার্টনি জেনারেল ও প্রখ্যাত আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি আবার সামনে আনলেন তার ছেলে বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গত ১২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ‘২০০২ সালে সংবিধান দিবস উপলক্ষ্যে লেখা একটি প্রবন্ধের উপসংহারে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ এই মন্তব্য করেছিলেন যা, আজকের অনুষ্ঠানের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি।’
প্রয়াত বাবার লেখা প্রবন্ধের অংশটি এরপর তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি। যেখানে বলা হয়েছে যে, “সব সংবিধানই একটি শাশ্বত ও জীবন্ত দলিল। স্বল্প পরিধির ভিতর রাষ্ট্রীয় শাসনের নীতি ও পদ্ধতি সন্নিবেশিত করা হয় এই দলিলে।সংবিধানের ব্যাখ্যার দায়িত্ব উচ্চতর আদালতের। আর সেই ব্যাখ্যা যদি কাল ও সময়ের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম না হয় তাহলে সংবিধান হয়ে দাঁড়ায় এক ‘ডেড লেটার।’ যা জীবন্ত গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতার মতো। তাই উচ্চতর আদালতে আসীন বিচারকদের প্রাথমিক ও মহান দায়িত্ব হলো অনাগত ভবিষ্যতের সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম সংবিধানের এমন এক প্রগতিশীল ব্যাখ্যা দেয়া। এ দায়িত্ব পালন আমাদের মতো অনুন্নত দেশে ‘জুডিশিয়াল একটিভিসম’-এর মাধ্যমেই সম্ভব।”
সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের প্রবন্ধ থেকে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ‘সাংবিধানিক আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এই প্রক্রিয়া সাংবিধানিক ঘাত- প্রতিঘাতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবর্তমানে ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু (তৎকালীন) গত ১০ বছর ধরে একটানা ভাবে সাংবিধানিক ব্যবস্থা কায়েম আছে। এই সময় কালে সাংবিধানিক আইন ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমাদের উচ্চতর আদালত কখনো কখনো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলেও ‘জুডিশিয়াল একটিভিসম’ -এর স্পষ্ট অথবা উৎকর্ষতার ধারাবাহিকতার অভাব অনুভব করা যায় বললে অত্যুক্তি হবে না। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষা এবং বলবৎ করার ক্ষেত্রে সর্বোপরি যারা দুর্বল, দরিদ্র এবং অসংগঠিত তাদের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারের ক্ষেত্রে এবং সুষ্ঠু এবং প্রগতিশীল মনোভাব এবং চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ বিচারকরা এই পথ ধরে অগ্রগামী হবেন এ আশা আমরা অবশ্যই করতে পারি। আর এই প্রক্রিয়ার একটি সুস্পষ্ট সূচনা হবে আমাদের জন্য একান্ত সময়োপযোগী এক বিরাট পদক্ষেপ।”
১৯৫৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া সৈয়দ রেফাত আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওয়াদাম কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ফ্লেচার স্কুল অফ ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি অফ টাফ্টস ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ ১৯৮৪ সালে জেলা আদালতে, ১৯৮৬ সালে হাইকোর্টে এবং ২০০২ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগ পাওয়ার দুই বছর পর হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হন।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রয়াত ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ এবং প্রয়াত প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ও একুশে পদক প্রাপ্ত ভাষা সৈনিক সুফিয়া আহমেদের ছেলে।









