চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
  • আরও
    • কর্পোরেট নিউজ
    • কৃষি
    • তথ্যপ্রযুক্তি
    • মতামত
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: এগারো)

মিলন ফারাবী by মিলন ফারাবী
1:19 অপরাহ্ন 12, মে 2016
in অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

কথাগুলো সারতে না সারতেই অফিসারটা কাছে এসে দাঁড়াল। শেখ সাহেব তখন পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে আলাপ সালাপ করলেন। তোর মায়ের শরীর ভালো তো! খুব ভেঙে পড়েছে নিশ্চয়ই। ও তো জীবনভর কষ্ট করেই যাচ্ছে। হায়রে আমার রেনু।

হাসিনা বললেন, আর বোলো না, মাকে নিয়ে আর পারি না। মা-ই তো সব কাজ একাই দৌঁড়ে করছেন। ঘর সামলে বাইরের ব্যাপারগুলোও তীক্ষ্ণ নজরে দেখছেন। অফিসারটা সবকথা কান খাড়া করে শুনছে।

যাই হোক, চিঠি দেয়ার কাজটা নির্বিঘ্নেই সারা গেছে। হাসিনা ও ওয়াজেদ সালাম জানিয়ে ফিরে এলেন সেদিন।

পরের দিন। খুব একটা হুজ্জোতি হলো না। ওয়াজেদের গাড়িতে করে রউফ, খালেদ, তোফায়েল পৌঁছে গেলেন মেস গেটের কাছে। হাসিনাও আছেন সঙ্গে। শেখ সাহেব নিজেই ছুটে এলেন গেটে। অদূরেই ডিউটি করছিল সেই উর্দি অফিসারটি। ভাবলেশহীন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। কয়েক পলক তাকিয়ে হাসিনা ও ওয়াজেদকে দেখল। ভাবান্তর নেই। ছুটে কাছে আসবার তাড়াহুড়ো তার মধ্যে দেখা গেল না। কাল তো কান খাড়া করে শুনেছেই – শেখ মুজিব বেশির ভাগ পারিবারিক শলাপরামর্শই করছেন। নিজের স্ত্রী-পরিজনের খোঁজ খবরই নেন। ‘ফ্যামিলি ম্যাটার’ বলে শোনার আগ্রহ তার কম। নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকে একটু দূরে স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখা গেল। কোনো উচ্চবাচ্য সে করল না।

রউফ-খালেদ-তোফায়েল তারুণ্য দীপ্ত তিনটি মুখ। প্রত্যয় আত্মবিশ্বাস প্রতিজ্ঞায় উজ্জ্বল। শেখ সাহেব জড়িয়ে ধরলেন তিন যুবককে। তিনি যেন শুনতে পেলেন সেই অবিনাশী আবাহন। তিনি টের পেলেন – ঘুম ভাঙানিয়া গানে জেগে উঠছে ক্যাম্পাস। আন্তরিক আলিঙ্গনের ফাঁকেই বললেন, তোমাদের ১১ দফার সঙ্গে আমি রয়েছি। আমি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন করছি। তোমাদের ব্যাপারে শুনেছি। গভীরভাবে বিশ্বাস করি তোমাদের। তোমরা অবশ্যই পারবে। আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে। নিয়ে যেতে হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। কোনো রকম ভুল করা চলবে না। তোমরা এগিয়ে যাও। শেখ মুজিব তোমাদের সঙ্গেই আছে সব সময়। শেখ সাহেব আবেগ ভরা গলায় বললেন, লক্ষ্যে যে জন ধীর স্থির, প্রতিজ্ঞায় যারা অবিচল – জয় মুকুট তাদের অপেক্ষায়।

নেতার সান্নিধ্যে তিন তরুণও উদ্দীপনায় উদ্বেল! বললেন, লিডারের নির্দেশ শিরোধার্য। আদেশ-আশীর্বাদ যখন পেয়েছি, কোনো বাঁধাই ছাত্ররা আর মানবে না। ছাত্ররা গণঅভ্যুত্থান করে ছাড়বে। লিডার আপনি ভরসা রাখুন।

তারুণ্যের এই অজর, অজেয় শক্তি দেখে অভিভূত মুজিব। আবারও বললেন, তোরা পারবি। অবশ্যই পারবি। কিন্তু কোনো হঠকারিতা চলবে না। শত্রুর শিকল বেড়ি তোদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে ছায়ার মতো তাড়া করবে। তোদের প্রতিটি কাজ যেন হয় বুদ্ধিদীপ্ত ও কৌশলী।

শত্রুর শকুন চোখ কয়েক গজের ভেতরেই। নেতা ও কর্মীর শলা সংলাপের মাঝেই হঠাৎ শান্ত্রী অফিসারটির কৌতুহল। ফৌজি পায়ে লেফট রাইট লেফট; এগিয়ে এলো কাছে। মুহূর্তেই শেখ সাহেব প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন। ছোট্ট রাসেলের খবর নিলেন তিনি। কামাল জামালের ব্যাপারেও খোঁজ খবর নিলেন।

তারপর বিদায় দিলেন হাসুদের। ঢুকে গেলেন মেসের ভেতরে। অফিসারটিও অনুসরণ করল তাকে।

সেই সামরিক বন্দিশালা। সেই নির্যাতন, নিপীড়ন। সেই আগুন ঊনসত্তুর, বাবার চুলে অকালেই পাকনের শুরু; গোঁফেও সফেদ আগ্রাসন – বাবার মুখটা ছবির মতো চোখের সামনে ভাসছে। এই তো সেদিনই গেল ভয়ংকর সেই দিনগুলো।

পাক সার জমিন কায়েমের ভ্রান্তি বিলাসে দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি তখন বাঙালি। ভ্রান্তির বেড়াজালে তাদের আটকাতে চাইছে পিন্ডি-পাঞ্জাবী গণতন্ত্র-দুশমন চক্র। ইসলামিক জমহুরিয়া’র নাপাক শরাবে ওরা বুঁদ হয়ে স্বদেশকে বলাৎকারে উদ্যত। বাঙালি জেগে উঠতে সময় নিল না। ঊনসত্তুর গোটা বছরটাই হয়ে উঠল অগ্নিগর্ভ ভিসুভিয়াস। অগ্ন্যুপাতের শুরু জানুয়ারিতে। সারাদেশে মিছিল শোভাযাত্রার কর্মসূচি দিয়েছিল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি। ‘ডাক’-এর ডাক। ঢাকা ভার্সিটি ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা। ছাত্ররা তা কেনো মানবে! ১৪৪-এর বেড়ি ভাঙতে সবার চোখেমুখে তীব্র অদম্য প্রতিজ্ঞা। বটতলায় মিটিং চলছিল। মিটিং শেষে বেড়ি ভাঙতে সম্মুখ পানে শত ছাত্র।

ছাত্রস্রোত নির্ভীক। পেটোয়া পুলিশও ঝাঁপিয়ে পড়লো হিংস্র উল্লাসে। জগাখিচুড়ি হারাম জমহুরিয়ার পক্ষে তাদের হুংকার। বেপরোয়া লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস। ছাত্রীদের কমনরুমেও উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো শিং উঁচিয়ে তারা ঢুকল। বেদম প্রহার করলো সাধারণ ছাত্রীদের। কান্না আর্তচিৎকার। হুড়োহুড়ি। আত্মরক্ষার্থে মেয়েরা যে যেদিকে পারল ছুুটে প্রাণ বাঁচাল। সেদিন হামলার মুখে পড়েছিলেন হাসিনাও। আত্মরক্ষার চেয়ে সতীর্থ ও নিরীহ ছাত্রীদের রক্ষায় তিনি তখন ব্যস্ত। শেষে বেশকিছু ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পেছনের গেট দিয়ে আণবিক শক্তি কমিশন কম্পাউন্ডে ঢুকে একটু স্বস্তি। তখন তাদের অনেকের পায়েই স্যান্ডেল নেই। ছুটে আসতে গিয়ে ষণ্ড পুলিশকেই তারা বিলিয়ে এসেছে পাদুকা।

‘ডাক’ এর হাতের অগ্নি মশাল এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তপ্ত মুঠোয়। ডাক যা পারেনি; ছাত্ররা তা করে দেখাচ্ছে। ঢাকা শহরের সকল স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে পরদিন থেকেই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট। ৬ দফার সঙ্গে ১১ দফা দাবি মানতে হবে জালিমশাহীকে। রাওয়ালপিন্ডির পিন্ডি চটকানো উদ্ভট আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি উঠল সবদিকে। নইলে আন্দোলন চলবে দুর্বার। হাজার হাজার ছাত্র বেরিয়ে এলো রাস্তায়। কিসের কী ঘোড়ার ডিম ১৪৪ ধারা। তা পায়ে মাড়িয়ে ছাত্ররা শ্লোগানে মিছিলে শহরকে মুখর করে তুলল। জঙ্গিশাহী পুলিশের সেই একই অস্ত্র। বেশুমার কাঁদানে গ্যাস, বেদম লাঠিচার্জ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাত্র-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ চলল। রমনা, গুলিস্তান রক্ত ঝরানো রণাঙ্গন। পাবলিক বাস ক্ষোভের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলল। হাত পা ভাঙল, মাথা ফেটে চৌচির। তবুও ছাত্ররা সম্মুখ সমরে অবিচল। গুরুতর আহত হলো অনেকে। তারপরও তারা অদম্য। হুকুম বরদার আইয়ুব-আজ্ঞাদাস মোনায়েম খানসামা সরকার ইপিআর তলব করল সন্ধ্যায়। ইকবাল ও জিন্নাহ হলে তাণ্ডব চালাল পুলিশ-ইপিআর। মারধর ও ধরপাকড় চললো রাতভর।

মাত্র ২ দিনের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল সারা বাংলায়। বাংলা জুড়েই শিল্প প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট। পুলিশ ইপিআর, ১৪৪ ধারা, টিয়ার শেল, লাঠি দিয়ে আর দমিয়ে রাখতে পারল না ছাত্রস্রোতকে। এবার গুলিও চলল। ছাত্রনেতা আসাদকে গুলি করে মারল এক পুলিশ ইন্সপেক্টর। কলাভবনের কাছে পেট্রোল পাম্পের চত্বরে খুনের ঘটনা। লাশ দেখতে হাজার হাজার ছাত্রের ঢল ঢাকা মেডিকেলে। স্বয়ং পুলিশ-আইজি সেদিন অ্যাকশনে। সদলবলে ইপিআরকে সঙ্গে নিয়ে লাশ ছিনতাই করতে বারবার হামলা চালাল মেডিকেলে। কিন্তু লাশকে ঘিরে ইস্পাত বেষ্টনি ছাত্র-জনতার। সেই অচলায়তন ভাঙ্গার কী সাধ্যি পুলিশের। মেডিকেল অঙ্গনেই হাজার হাজার মানুষের শোকসভা। সকল ছাত্র সেদিন শোকমিছিলে। ঢাকার সড়কে মিছিলের দৈর্ঘ্য শেষই হচ্ছিল না।

জানুয়ারিতেই ছাত্রদের ক্ষোভের সলতেয় আগুন। জানুয়ারিতেই অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠল। মোনায়েম খানসামার উপর্যুপরি হঠকারী শঠ সিদ্ধান্ত। খানসামা কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারল না। আসাদ খুন হয়ে ফিনিক্স পাখি।

বাংলাব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল। লাখো ছাত্রজনতার অবিনাশী-অনিঃশেষ শোক মিছিল। অন্যান্য জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়ল ক্ষোভ। হলো শ্লোগানমুখর জাঁকালো ঝাঁঝালো মিছিল। লাঠি, টিয়ারের সঙ্গে গুলিও ছুঁড়ল পুলিশ-ইপিআর। সবই নিষ্ফল। ভয় পাচ্ছে না ছাত্ররা। ছাত্রস্রোত নির্ভীক। নির্ভয়।

টালমাটাল পরিস্থিতি সামলাতে ঢাকায় ডাকা হলো জাতীয় পরিষদের শীতকালীন অধিবেশন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। বলল, ভণ্ডামি-শয়তানি আর চলবে না। অধিবেশন বসার দিনটিতেই বাংলা জুড়ে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। খানসামা গভর্নর ঢাকা শহরজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিসের কী পুলিশ আইন! তাতে থোড়াই কেয়ার ছাত্রজনতার। হাজার হাজার শ্রমিক এসে ঢুকে পড়ে ঢাকাতে। বাঁধভাঙ্গা জোয়ার অনিরুদ্ধ, অপ্রতিরোধ্য। সকালেই লাখ লাখ ছাত্র-শ্রমিক-জনতার দখলে সচিবালয়, ডিআইটি, মতিঝিলের সকল রাস্তা। আইয়ুব জালিম খানশাহী ও মোনাযেম খানসামার পক্ষে প্রাণান্ত হয়ে জনবিরোধী অ-খবর প্রসব করে যাচ্ছিল ট্রাস্টি পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ। জনরোষ জ্বলে উঠল কাগজের বান্ডিলে। পত্রিকা দু’টির বিভিন্ন রুমে আগুন দেয়া হলো। জনরোষ বেড়েই চলছিল। আগুন দেয়া হলো সরকারি পাড়াতে। স্ফুলিঙ্গ গিয়ে ছিটকে পড়ল আব্দুল গনি রোডে – দুই তাঁবেদার তল্পি তল্পাবাহক এমএনএ’র বাড়িতে। আইয়ুবি হাড্ডি-গুড্ডি। পাকিস্তান স্টেট হাউসও ভস্মীভূত হলো আগুনে।

ইপিআর-পুলিশ উন্মত্ত বেপরোয়া গুলিবাজিতে। লাশের পর লাশ পড়ল ঢাকায়। ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রামে। বাড়ছে লাশের সংখ্যা। তারপরও নির্ভীক ছাত্র-জনতা। ভয় নেই। উদয়ের সংগ্রামে যারা পা বাড়িয়েছে; ভয় নাই। তাদের ভয় নাই। আর্মি তলব হলো ঢাকায়। সঙ্গে ৩৬ ঘণ্টার কারফিউ। কিন্তু তাতেও রক্ষা নেই জঙ্গিশাহীর। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করল বিরোধী দল। নৈতিক-রাজনৈতিক পাল্লা তখন ভারী। মানুষের পক্ষে না দাঁড়ালে রাজনীতিকদের মহাবিপদ। বাঙালি জেগেছে। জনতা জেগেছে। গোল্ডেন মোমেন্টস। সেই দিনগুলো সোনার আগুনে দেদীপ্যমান। জানুয়ারি মাসটি ছিল বড় দীর্ঘ। এত ঘটনা। এত কাণ্ড। এত বিক্ষোভ, এমন বিপুল জনস্রোত। মানুষের এমন বাঁধভাঙ্গা ক্ষোভ-উচ্ছ্বাস। এ এক প্রলয় নাচন নতুনেরে বরণের।

গুলি হচ্ছে। রক্তাক্ত রাজপথ। লাশ হচ্ছে প্রতিবাদী তরুণ। লাশ হচ্ছে আনত-শির ছাত্র। খানসামা পুলিশের নিষ্ঠুর তাণ্ডবে ভীতি ভয়ংকর একেকটি দিন। সান্ধ্য আইনে সেনাটহল। সঙ্গীন উঁচিয়ে। বেয়োনেট, রাইফেল, মেশিনগান-গুলির শব্দ শহরের এখানে সেখানে। তবুও কিসের ভয়। কিসের পাত্তা এই পেটোয়াদের। ওদের আতঙ্কের বুজরুকি ভেঙেই ছিনিয়ে আনতে হবে প্রাণ ভোমরাকে।

আন্দোলনের ঢেউ বানের জলের মতো ভাসিয়ে দিচ্ছে বাংলাকে। শহর, গ্রাম, গঞ্জ, বন্দর। ছাত্র-জনতা-শ্রমিক-কৃষক – সবাই একই ছাতার তলে। তারুণ্যের আলিঙ্গনে বুড়োর প্রাণেও যৌবনের উদ্যম। মিছিল হচ্ছে মানুষের। সভা। শোভাযাত্রা। শ্লোগানের রাগিনীতে বজ্রের তুমুল শব্দ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মানি না। মানবো না। ৬ দফা, ১১ দফা মানতে হবে। জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব। আইয়ুব-মোনেমের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে। শিশু-কিশোরদের কণ্ঠে কণ্ঠেও অবিনাশী গান।

জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে বের করে আনতেই হবে। অলৌকিক এক সুরের বাঁশি বেজে উঠেছে সারা বাংলায়। চালা গুলি কত চালাবি। আয়, আর কতজনের বুক বিদীর্ণ করবি। কতজনকে খুন করবি! কর। তবুও বাংলার দাবি আদায় করে ছাড়ব। কত রক্ত নিবি নে। ওরে রক্ত পিয়াসী-জঙ্গি – কত রক্ত খাবি খা। বাংলায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দিবি দে – কোনো ভয় নেই। কোনো শঙ্কা-সংকোচ নেই। ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো বিলাপ নেই। তোদের আমরা গদিছাড়া করে ছাড়বই। তোদের পতন-খতম না ঘটিয়ে কোনো ঘরেই ঘুম নেই। সবাই নির্ঘুম। ঘুমকে দিয়েছি ছুটি।

১৪৪ ধারা দিয়েছিস। পারলি না। গুলি চালালি, পারলি না। কারফিউ দিলি; পারলি না। তোরা কিচ্ছ্যুটি করতে পারবি না। যা ভীরু পাষণ্ড, কাপুরুষ – পালিয়ে যা। বিলম্ব করলে তোদের পালাবার পথ আর খোলা থাকবে না। ওই যে ফাঁসির রশিতে জনতার হ্যাচকা টানে মরণ তোদের ডাকছে। রাস্তায় অবরোধ। মিছিল মুখর বাংলা। লাশ ও আহতের সংখ্যা বাড়ছেই। গ্রেফতার আর গ্রেফতার। জেলখানা কানায় কানায় পূর্ণ। আর কত গ্রেফতার করবি? সারা বাংলাকেই যে কারাগার বানিয়ে রেখেছিস। আর শেখ মুজিবকে করেছিস অতল কারায় বন্দি। একটার পর একটা লৌহকপাট আমরা খুলবই। সব জানালা দরোজা খুলবই। বাংলা এবং মুজিবকে আমরা মুক্ত করে আনবই।

গুলি, হত্যা, কারফিউ – কিসের ভয়, কিসের ডর! ভয় কী মরণে; আমরা শরণ নিয়েছি লোকপ্রভুর। লোকপ্রভু আজ জাগ্রত। মরণ সাগর পাড়ে বাঙালিকে এনে দাঁড় করিয়েছিস। মৃত্যুনদীতে ঝাঁপ দিয়েই জীবন সাগর সৈকতে জেগে উঠবে তারা।

জানুয়ারির বিষের বাঁশি ফেব্রুয়ারিতে আরও তীব্র। লক্ষ্যে অবিচল। শহরের পর শহরে কারফিউ। মেয়াদ কেবলি বাড়ছে। কিন্তু বাড়িয়ে কী লাভ। আন্দোলনের বিস্ফোরণের মাত্রাও আরও ভীষণ ভয়ংকর। ঘরের অন্দর ভেঙে বেরিয়ে এলো নারীও। পেশাজীবীরাও রাজপথে। বিক্ষোভ প্যারিসে। ক্ষোভের আগুন বিশ্বজুড়ে বাঙালির আস্তানায়-ঠিকানায়। সকল সাকিনে।

মোনায়েম খানসামা ভয়ে আতঙ্কে এখন উন্মাদ হতে চলেছে। কোণঠাসা ক্রমশই। ওর পালাবার জায়গা নেই। ওকে পালাতে দেয়া হবে না। গুহ্য সেলাই ইঁদুরের মতো মোনায়েম খানসামা ছুটছে দিগ্বিদিক। গর্ত খুঁজছে লুকানোর। নির্ণয় না জানা জন্মের মাতৃপিতৃ পরিচয় খুঁজে না পেয়ে বেজন্মা জীবনে আইয়ুবের পা চেটে চেটে জিহ্বা শানিয়েছে এই খানসামা। ইয়াজুজ মাজুজের সেই অনন্তপিপাসা-কাতর জিহ্বায় বাঙালির রক্ত চাটতে চাটতে এখন সে হীনবল।

ডুগি তবলার বোল তুলে মুখোশ নৃত্যরঙ্গ দেখানোর শেষ চেষ্টা জালিমশাহ আইয়ুুবের। রাওয়ালপিন্ডিতে গোল টেবিল কনফারেন্সের ডাক দিলো সে। বাংলায় মুহূর্তেই তা প্রত্যাখ্যান। শঠের শত শঠ-ছল। কাপুরুষ জঙ্গিদের শেষরক্ষার চেষ্টা। ছলচাতুরিতে ওরা ভণ্ডুল করতে চায় বাংলার নবজন্মকে। দাবাতে চায় বাঙালিকে।না, না ধ্বনি উঠল দেশজুড়ে। বাঙালির দাবিগুলো না মানলে কোনো গোলটেবিলে বাংলা যাবে না।

এক শীতের দুপুরে আইয়ুব চুপটি করে এলো ঢাকাতে। হাজার হাজার ছাত্র, সাধারণ মানুষ আইয়ুবকে দেখাল কালো পতাকার অশনি। তবুও তার ছলচাতুরির শেষ নেই। নামকাওয়াস্তে কিছু দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইল মানুষকে। কয়েকটি জেলার কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হলো ছাত্র-শ্রমিক নেতাকর্মীদের। মুক্ত হলেন তাজউদ্দিন। সেন্ট্রাল জেলের গেটে ছাত্রনেতার উষ্ণ আলিঙ্গন। পরদিন বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন মনসুর, তাজউদ্দিন – আরও অনেকে। ৩২ নম্বরের বাড়িতে বেগম মুজিব অধীর অপেক্ষায়। বাড়ির সবাই দিন গুণছেন। শেখ সাহেবও মুক্ত পায়ে এলেন বলে। মাধবীলতার সর্পিল দেহ জুড়ে ফুলের সমারোহ। রাসেল বাবার জন্য উদগ্রীব। বাবা, বাবা বলে কথা। বাবা মানেই অনেক কিছু পাওয়া। বাবাকে দেখতে পাওয়াই তার জন্যে বিশাল মহার্ঘ্য।

ছাত্রনেতারা আসছে বাড়িতে। কথা হচ্ছে মায়ের সঙ্গে। সবার কথাই তিনি শুনছেন। কোথায় কী হচ্ছে খবর রাখছেন।

ক’দিন ধরেই তার ঘুম হচ্ছে না ঠিকমতো। গভীর রাতেও জেগে থাকছেন। স্বামীর প্রতীক্ষায় কি না বুঝা যাচ্ছে না। দিনের বেলাতেও মায়ের মুখটা গম্ভীর। হাসিনার দিনও কাটছে নানা ব্যস্ততায়। ক্যাম্পাসে যাচ্ছেন নিয়মিত। কত কাজ। মায়ের চিন্তিত মুখ তার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে না।

তিনি নিজেই বড্ড মনমরা। মাত্র কয়েকটা দিনে কত মানুষ লাশ হলো। রক্ত ঝরল কত। লাশের পর লাশ ফেলে কোন পথে যাচ্ছে আইয়ুব। আবার সমাঝোতার ধান্দাবাজি কিসের ইঙ্গিত? বাবাকে মুক্তি দেয়ার নাম নেই। শেখ সাহেবকে নিয়ে কি কোনো কঠিন খেলা খেলতে চলেছে পিন্ডি?

মা কি সেই আশঙ্কাই করছেন! এক সকালে হাসুকে অবাক করে বললেন, তোর বাবাকে কি ওরা জিম্মি করে পণ আদায়ের ফন্দি করবে! পিন্ডি কি সেই শয়তানির রাস্তা ভাবছে!

পণ! কিসের পণ?

তাহলে তাকে মুক্তি দিতে কেনো এত গড়িমসি? ওরা তো দাসখত আদায়ের ফিকির করছে রে হাসু। তোর বাবাকে জেলে জিম্মি করেই অন্যদের চাপ দিতে চায় আইয়ুব। আশ্চর্য এই নারী! তিনি ঠিকই আন্দাজ করে নিয়েছেন কী কাণ্ডটা সামনে ঘটতে যাচ্ছে!

দু’দিন বাদেই ধারণা করা গেল মায়ের আশঙ্কাই সত্যি। কারাবন্দি মুজিব ওদের ট্রাম্প কার্ড। তাকে মুক্তি দিয়ে কার্ডটি হাতছাড়া করতে চায় না ওরা। তাছাড়া শেখ নাছোড়বান্দা। বাংলার ভাগ্য ছাড়া কোনো দিকেই তার মন নেই। এই মানুষটাকে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিলে বসালে পানি আবার কোন দিকে গড়ায় কে জানে। মুজিবের ব্যাপারে কোনো রকম ভরসা করতে পারছে না রাওয়ালপিন্ডি চক্র।

আইয়ুব মেসেজ পৌঁছে দিলো – মুজিবকে ছাড়াই আওয়ামী লীগকে গোলটেবিলে বসতে হবে। এখনি মুজিবের মুক্তি নয়। গোলটেবিলে একটা ফয়সালা হোক, তারপর অন্য চিন্তা।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আওয়ামী লীগের। সদ্য মুক্ত তাজউদ্দিন, মনসুর সবাই বললেন, না, শেখ সাহেবকে ছাড়া গোলটেবিল নয়। আগে মুক্ত মুজিব, আগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিঃশর্ত প্রত্যাহার – তারপর বৈঠকের প্রশ্ন।

আইয়ুবের চালবাজি ব্যাটে-বলে হলো না। বরং শোচনীয় হয়ে উঠল পরিস্থিতি। এবার প্রধান ইস্যু মুজিবের মুক্তি। সারা বাংলায় আধাবেলা হরতাল হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা যেন ঘুরল না। গাড়ির চাকা থেমে রইল। পল্টনে লাখো মানুষের সমাবেশ। ‘ডাক’ নেতারা পরিষ্কার করে বললেন, শেখ মুজিবকে জেলে রেখে গোলটেবিল অর্থবহ হবে না।

আবারো হরতাল। ঢাকা-অন্যান্য শহর-বন্দর স্তব্ধ। আগুন জ্বালানিয়া মিছিলে মিছিলে শ্লোগান একটাই-জেলের তালা ভাঙব। শেখ মুজিবকে আনব। আইয়ুব মোনেম ভাই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই।

জঙ্গ-জংলি আইয়ুব ফের রাক্ষুসে মুখব্যাদান করল। মিছিলে গুলি, গুম, গ্রেফতার চালিয়ে ভয় দেখাতে আবারও সে তৎপর। মধ্য ফেব্রুয়ারির এক রাতে খবর এলো সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করেছে ফৌজি বন্দুকবাজ। জহুরুল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একজন আসামী। কুর্মিটোলায় ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন বন্দি। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই ঠাণ্ডা মাথায় খুন। পূর্ব পরিকল্পিত।

বেগম মুজিব জানলেন রাতেই। উৎকণ্ঠায় দুশ্চিন্তায় ঘুম হলো না তার। হাসিনা, কামাল, জামাল, রেহানা কারো চোখে ঘুম নেই। উদ্বেগ সবার মনে। কখন কী ঘটে যায়! আইয়ুব কী করতে চাইছে! ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই গুম খুন! এই জালিমকে তো রক্তের নেশায় পেয়েছে! শরাবে হাবুডুবু খেতে খেতে এখন তো খুনের পেয়ালায় বুঁদ। এবার সে আর কার রক্ত পানে উদ্যত! এই নির্বোধ-জংলি বুদ্ধি শেখ সাহেবকেও টার্গেট করে বসবে না তো! ভাবতেই সবার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করে সেই ভয়ং-আতঙ্ক সৃষ্টির তৎপরতায় লিপ্ত। সার্জেন্টকে ক্যান্টনমেন্টে হত্যা করেছে নির্বিবাদে। মুজিবও তাদের কব্জায়। বাঙালির আবেগকে ব্ল্যাকমেইল করার কূট-কৌশল। লাশ ফেলতে তাদের দ্বিধা নেই। নিজেদের পালাবার পথ বের করতে ওরা আরও রক্ত ঝরানোর ভয় দেখাচ্ছে।

রাতেই ঢাকা শহরে অভূতপূর্ব জাগরণ। হাজার হাজার ছাত্র; হাজারো মানুষ নেমে এলো রাতের রাস্তায়। আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। পরদিন জহুরুল হত্যার খবর বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল সারা বাংলায়। গায়েবানা জানাজা, শোকের মিছিল। বিক্ষোভ। ঢাকা দিনভর মহাবিক্ষোভের নগরী। দুপুরে জানাজায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শহর ভাঙ্গা মানুষ এলো ছুটে। তারপর বিক্ষোভের যেন অন্ত নেই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। শ্লোগান থামছে না। মিছিল চলছেই।

মোনেম খানসামাকে মানুষ তখন খুঁজছে। রক্তের বদলা রক্ত দিয়েই হবে। মন্ত্রীদের বাড়িতে হামলা জনতার। আগুন জ্বালিয়ে দিলো আইয়ুবি মুসলিম লীগের নানা আস্তানায়।

পুলিশ লাশ ফেলল আবার। সেনা তলব, কারফিউ ফের। ফৌজি শামিয়ানার নিচে আইয়ুবি খানসামারা আশ্রয় খুঁজছে।

জনতা জেগেই আছে রাজপথে। কারফিউ, গুলির ভয় দেখিয়ে তাদের আর ঘরবন্দি করা গেল না।

রক্তের পিপাসায় পেয়েছিল আইয়ুবকে। আর বাঙালিকে পেয়েছে ফৌজি জমহুরিয়া, সাম্প্রদায়িক জমহুরিয়া থেকে মুক্তির পিপাসায়। লাখো কোটি মানুষের আকণ্ঠ পিপাসা।

পিছু হটল আইয়ুব শাহী। রাতে রেডিও পাকিস্তান জানাল শেখ মুজিব যাতে পিন্ডি গোলটেবিলে যেতে পারেন – সেটির দরকারি ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।

বত্রিশ নম্বর বাড়ির ডাইনিং-এর কোণাটাতে ছিল রেডিও। ঘরের সবাই শুনল সেই ঘোষণা। কী হচ্ছে, আইয়ুবের মতলবটা কী – পিন্ডি কি শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিচ্ছে শেখ সাহেবকে – আশা নিরাশার দোলায় সবাই দুলছে।

আম্মার কিন্তু দুশ্চিন্তা মোটেই কাটছে না। তিনি স্বস্তিতে নেই। তিনি হাসিনাকে বললেন, আইয়ুবের মাথায় অন্য কোনো মতলব নিশ্চয়ই রয়েছে। কী মতলব হতে পারে বল তো!

প্রশ্নটা করেই উত্তর দেন নিজেই। তোর বাবাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেবে বলে তো মনে হয় না।

গভীর সংশয় আম্মার।

তখন প্যারোলের কথাটা ক্যাম্পাসে সবাই বলছিল। মায়ের কানে কথাটা যেতেই তার কণ্ঠে উদ্বেগ – তার মানে আসলে শেখ সাহেব বন্দিই থাকছেন। যেখানে বাংলার মানুষের দাবি শর্তহীন মুক্তি। আগরতলা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। সেখানে তোর বাবার উপর মামলাটা ঠিকই থাকছে। শর্তহীন মুক্তি তো নয়ই। উল্টা সাময়িক গোলটেবিলে বসার জন্য কয়েকদিনের জন্য মুক্তি এই তো।

মায়ের এই সহজ উপলব্ধিতে অবাক না হয়ে হাসিনা পারেন না। যে মানুষটা বলতে গেলে চার দেয়ালের মধ্যেই এক রকম থাকছেন। ঘরের সন্তান-সন্ততিকে বুকের উত্তাপ দিয়ে আগলে রাখছেন। হ্যাঁ পার্টির নেতাকর্মীরা সবাই এই বাড়িতে আসছে যাচ্ছে। দিনে রাতে দরোজা লাগানোর ফুরসত বলতে বিশেষ নেই। কর্মী সমর্থকদের সবাইকেই তিনি সন্তানের স্নেহ-ভালবাসা দিচ্ছেন। এই মায়ের দরোজা সব সময়ই খোলা। এখানে নেই মানা। নেতাকর্মী সবার কথাই তিনি শুনছেন। মনোযোগ দিয়েই শুনছেন। আম্মা সবই শুনছেন। কাউকে যে আগ বাড়িয়ে শলাপরামর্শ দিচ্ছেন, তেমনটা কখনো চোখে পড়েনি। আম্মা কখনোই পার্টি বা রাজনীতিতে নাক গলাতে যান নি। তিনি আদর আপ্যায়ন, ঘরের যা কিছু আছে ভালোমন্দ – নিজের ভাঁড়ারকে রিক্ত করে কর্মী সন্তানদের মুখে কিছু তুলে দিতে পেরেই সন্তুষ্ট বড়।

তারপরও ক’দিন ধরে তিনি একরকম নির্ঘুম। এবার বোঝা গেল – আপন ভাবনাটি, আপন মতটি তিনি আপনার মতো করেই গুছিয়ে ভাবছেন। স্নেহ মমতা বাৎসল্য-মাতৃত্বের অমৃত কুম্ভে দেশ-রাজনীতি-বাংলা-বাঙালির জন্য গভীর সংবেদন, মমত্বও সবিশেষ রয়েছে।

আম্মার উদ্বেগ বেড়েই চলছিল। প্যারোলে মুক্তির নানা দিক নিয়ে ভাবনাটা কোনমতেই মাথা থেকে দূর করতে পারছেন না আম্মা। এ কেমন কথা! ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই মেরে ফেলল জলজ্যান্ত মানুষটাকে। আইয়ুবের জন্য কি সাত খুন মাফ! পিন্ডির হর্তাকর্তা, দণ্ডমুণ্ডের মালিক হয়ে কি হত্যার নেশায় পেয়ে বসেছে! জহুরুলও তো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী। আর তাকে কিনা বিনা বিচারে খুন করে ফেলল ওরা। কী তামাশার ট্রাইব্যুনালই না হয়েছে! কিসের বিচার হচ্ছে ওখানে! এটা তো ধরো মারো গুম খুনের ট্রাইব্যুনাল! আম্মা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। এই ট্রাইব্যুনালে কোনো বিচার হবে না রে হাসু! একে তো মিথ্যা মামলা। আর তা নিয়ে তামাশার বিচারে ওরা মেতেছে।

আম্মার মনের ক্ষোভ যেন সারা বাংলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। শীতের এই দিনগুলো আর হিম কনকনে থাকছে না। মানুষের ক্ষোভ আগুন হয়ে ঠিকরোচ্ছে। প্রতিটি দিনই আন্দোলনের হলকায় লাল গনগনে। কারফিউ দিয়েও সামলাতে হিমশিম খানসামা সরকার। সারা বাংলা এখন উনুন তাতানো ভাতের মতো টগবগিয়ে ফুটছে।

আম্মার কাছে সব খবরই আসছিল। কোথায় কী হচ্ছে – ক্লান্ত ক্ষুধার্ত নেতাকর্মীদের ২/৪ লোকমা ভাত, চটজলদি তৈরি নাস্তা খাওয়াতে খাওয়াতে সব কিছুই তিনি জানছিলেন।পিন্ডির রেডিও যাই বলুক, আম্মা তাতে ভরসা রাখতে পারছেন না মোটেই।

মধ্য ফেব্রুয়ারি। পশ্চিমের পাহাড়ি শহরে বন্দরে হাড় কাঁপানো শীত। কোথাও কোথাও ধবল বরফও পড়ছে।

ঠাণ্ডায় কাবু রাওয়ালপিন্ডিও। ফৌজি আলখাল্লায় ঢাকা এই শহরটি। খাকি উর্দিতে মোড়ানো নিস্তরঙ্গ, ঝিমুনি বৈকল্যে ভরা পশ্চিমের ক্যাপিটালেও এখানে সেখানে কেবলই উর্দির সম্ভ্রম।

ঘুম ঘুম শহর। কোথাও উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। বাংলা যেখানে ক্ষোভ-আন্দোলনের অনল প্রবাহে জ্বলছে – পিন্ডি সেখানে আধমরা ফৌজি শাহীখানা বৈ কিছু নয়।

৮ দলীয় ‘ডাক’ নেতারা ডাক পেয়েছেন পিন্ডির। গোলটেবিল কনফারেন্স। ‘ডাক’-এর সঙ্গে আওয়ামী লীগও এসেছে। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন এসে পৌঁছেছেন। জুনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কামারুজ্জামানও আছেন তাদের সঙ্গে। অবশ নিথর পিন্ডিতে ঘোড়া ছুটছে। শাহী দরবারে বেশ ব্যস্ততা। গোলটেবিল কনফারেন্স তবে হচ্ছে। ‘ডাক’-কে টেবিলে বসিয়ে মওকা মতো কিছু একটা দাসখত করিয়ে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। আইয়ুবের উজির নাজির, নায়েব গোমস্তা সবাই উৎফুল্ল। সবাই নানা বড় ষড়যন্ত্র আঁটছে। সদরে পাকিস্তানকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাখছে। ঢাকার রাস্তায় তখন ছোপ ছোপ রক্ত। মুজিবের মুক্তির কোনো খবর নেই। পার্টির সভাপতিকে ফৌজি জল্লাদখানায় রেখে কেমন করে গোলটেবিলে বসবে আওয়ামী লীগ! আদৌ বসবে কি! যদি বসেও বা, তাতে কার ফায়দা!

তাজউদ্দিন আগে থেকেই বেঁকে ছিলেন। মুজিব ভাইকে ছাড়া হয় না। সৈয়দ নজরুলও একমত। খন্দকার মোশতাকও উড়ে এসেছে। সে মিন মিন করে কিছু বলছে। গোলটেবিলে বসতে সে একপায়ে খাড়া। মোশতাক এই মওকাই খুঁজছে। ঝড়ঝঞ্ঝা আগুন পোড়া ঢাকা থেকে একটু ওম-আরামের জন্য এই পশ্চিমের শীত শহরে পৌঁছানো গোলটেবিলটা করে ফেললেই ভালো। আরও ২/১টা এঁড়ো শেয়াল তার সঙ্গে হুক্কা হুয়া ডাক পাড়ছিল ঢাকায় বসেই।

নজরুল, তাজউদ্দিন পরিষ্কার ভিন্নমত। তাদের নাকে এখনো রক্তের তাজা গন্ধ। আগুন পোড়া ঢাকায় হৃদপিণ্ড রেখেই এখানে এসেছেন তারা। জল্লাদের জবাইখানায় বন্দি। না, এভাবে হয় না। মোশতাক তলে তলে সব পণ্ড করতে চাইছে। বাঙালির ভালোটা সে চাইছে না। তারা বললেন, গোলটেবিল বৈঠক হোক, চাইছি। আলোচনার পথ খোলা। কিন্তু তার আগে শেখ মুজিবকে কারামুক্ত দেখতে চাই। মুজিবকে ছাড়া কোনো টেবিল হতে পারে না। পূর্ব বাংলার মানুষ মুজিবকে মুক্ত দেখতে চায়। তাকে বাদ দিয়ে গোলটেবিলে বসা বাংলার সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে বেঈমানি।

আইয়ুবশাহী কুচক্রিদের দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ভেস্তে গেল সে সব কুটনামি। মোশতাকের শেষ রক্ষা হলো না।

শেখ মুজিব নেই। গোলটেবিলে আওয়ামী লীগ নেই। তারা আইয়ুবের চোরা ফাঁদে পা দেবেন না।

রাওয়ালপিন্ডির শীত কাতুরে খুব কুয়াশার দিনগুলোতে হঠাৎ রোদের ঝলকানি; বেশ খানিকটা উত্তাপ। থমকে না গিয়ে উপায় ছিল না আইয়ুবের। তার কী আর করা! ‘ডাক’-এর মাথামুণ্ডু গতর মিলিয়ে সাড়ে পনের আনাই আওয়ামী লীগ! তারা বেঁকে বসলে কিসের সংলাপ। সেই গোলটেবিলে কী-ই বা ফায়দা!

গোলটেবিলের আয়োজন কয়েকদিনের জন্য স্থগিত করা হলো। পাকিস্তান রেডিও আইয়ুবি জমহুরিয়ার সদরে জবান। খবর এলো, সন্ধ্যায় বসছে আগরতলা মামলা ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল সেশন। পুতুল ট্রাইব্যুনালে সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে – শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার। সাময়িক মুক্তি পেয়ে তিনি যাতে রাওয়ালপিন্ডি যেতে পারেন। অংশ নিতে পারেন গোলটেবিল বৈঠকে। সেই মতোই আইনি প্রস্তুতি চলছিল।

বৃত্তান্ত শুনে আম্মা মোটেই খুশি হননি। স্বামীর মুক্তির জন্য তিনি ব্যাকুল। কিন্তু প্যারোলে নয়। তিনি অনেকটাই স্বগতোক্তির মতোন বললেন, হাসু, শেখ সাহেবের প্যারোলে মুক্তি মানুষ চায় না। মানুষ চায় শর্তহীন মুক্তি। তোর বাপের কোনো অবস্থাতেই প্যারোলে বেরিয়ে আসা ঠিক হবে না। মা খুব উতলা হয়ে উঠলেন, কেমন করে বাবাকে মানুষের এই মোক্ষম দাবি ও ধ্যান-ধারণার কথা পৌঁছে দেয়া যায়।

আম্মা বললেন, আইয়ুব তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আসামী রেখেই যদি গোলটেবিলে বসাতে পারে – তবে তো তারই জিত। এখন হয়তো একটু নরমভাব দেখাচ্ছে। পরে দেখবি – সুড় সুড় করে কেমনে সুর বদলায়।

তোর বাবাকে আগে ভাগেই এই খবরটি দেয়া দরকার রে মাগো!

হাসিনা ঠিক করলেন, দ্রুত কিছু একটা করা দরকার। আম্মা নেতাকর্মী, ছাত্র-জনতার নাড়ির খবর রাখেন। ৩২ নম্বরে তিনি যেমন হেঁশেলও সামলাচ্ছেন। তেমনি তিনি জানেন জনতার হৃদস্পন্দন। আম্মার হিসাব কখনো ভুল হওয়ার কথা নয়। যেদিন খবর এলো – ট্রাইব্যুনাল স্পেশাল সেশনে বসছে; আম্মা ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বিকেলে পেয়েছিলেন খবরটা। সন্ধ্যাতেই ওয়াজেদকে বললেন, তোমার শ্বশুরের সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার বাবা। ট্রাইব্যুনাল যদি রাতে বসে, দেখা করা যাবে নিশ্চয়ই।

ওয়াজেদ জানালেন, ট্রাইব্যুনাল বসার খবরটা পাকা। সেক্ষেত্রে সাক্ষাতের একটা সুযোগ নিশ্চয়ই মিলবে। এমনকি আজ মুক্তি পেতে পারেন বলে শুনেছি।

প্রতিটি মুহূর্ত তখন বিচিত্র এক উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাবা কি আজ সত্যিই মুক্তি পেতে যাচ্ছেন! যদি পানও বা – সে কি বিনা শর্তে। নাকি প্যারোলে।

দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উৎকণ্ঠা চলছিল। কেউ কেউ এমনও বলছিল – সার্জেন্ট জহুরুলের ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটেছে – এটাই শেষ নয় বরং শুরুটা করেছে সার্জেন্টকে দিয়ে। আইয়ুব শাহী বর্তমান তুঙ্গস্পর্শী আন্দোলন একবার দমিয়ে ফেলতে পারলে আবারও গুপ্ত গুম খুনের চেষ্টা করবে নিশ্চয়ই। এবার কে টার্গেট, কে জানে। কারাবন্দি মুজিবর জীবন ঝুঁকিমুক্ত নয়। তার ক্ষেত্রে কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়তো ওরা করছে। ফৌজি দেমাগ-বুদ্ধি মতো সাফাই তারা গাইতে পারে নির্লজ্জের মতো। ফৌজি বুদ্ধির ফৌজি খুন। এই জঙ্গ-ভঙ্গ বাহাদুররা মুফতে মৌকায় পাওয়া পাকিস্তানের কল্লা কব্জা করার পর থেকেই দেশটার নাভিশ্বাস দশা। মৌলানা ভাসানী তো আগাম এলান করেই দিয়েছেন – এখন ইন্নালিল্লাহ পড়ে জানাজা কেবল বাকি।

আম্মা ঘরের বাইরে মুখ ফুটে কখনো কিছু বলেননি। কিন্তু ঘরে তার আশ্চর্য ভবিষ্যতবাণী শুনে অবাক না হয়ে পারেন না হাসিনা।

আম্মা নিজের মতো করেই মাঝে মধ্যেই উদ্বেগের বশে বলছেন, হায় আল্লাহ – এরা তো পাকিস্তানের গোরখোদক। মুর্খগুলো জানে না, ওরা পাকিস্তানকে কবরস্থান বানাতে চলেছে। আল্লাহ রে আল্লাহ – এদের হাতে কত সাধারণ মানুষ মারা যায় কে জানে। আইয়ুব আর পারবে না রে হাসু, আইয়ুবের কইলজা ভয় খেয়ে গেছে। কয়লা পড়া খাইলেও ওর জানে আর পানি আসবে না। আইয়ুবের দিন শেষ। এখন যাওয়ার আগে কোন বেকুবি করে কে জানে।

আম্মা বললেন, একটা কথা তোরে বলে রাখি হাসু, আইয়ুব হইছে আইয়ুব। সে জবর দখল করে পাকিস্তানের কলিজা কাইট্টা খাইতেছে – সে একশ’ একটা ভুল করবার পারে। একটার পর একটা ভুল কইরা সে যাইতেছে – তার কোনো অনুশোচনা নাই, পস্তানো নাই; পাইক পেয়াদা বাদশা হইলে যা হয়। বাদুর দিনের বেলা উল্টা হইয়া গাছে ঝুল খায়, সে দুই চোখে কিছু দেখে না। আইয়ুবকে উল্টানো বাদুর দশায় পাইছে। কিন্তু তোর বাপের একটাও ভুল করা চলবে না। বাংলার মানুষের কইলজা খাইতে আইয়ুবের যেমন জিহ্বা লকলক করতেছে – সেই রাক্ষসের কবলে পড়া বাংলার মানুষ এখন শেখ সাহেবরে কইলজা দিয়া ভালবাসে। মানুষের ভালবাসার দাম সোনাদানা, জহরত দিয়াও শোধ করা যায় না। তোর বাপেও যে নিজের কইলজা দিয়া মানুষরে ভালবাসে – মানুষও তাই তার জন্য পাগল। তারে ছাড়া গোলটেবিল কোনো অবস্থাতেই হইতে পারে না হাসু। মায়ের অপূর্ব উপলব্ধি, দূরদৃষ্টি শ্রদ্ধা-মুগ্ধচিত্তে শোনেন হাসিনা। কত কিছুই না তিনি মায়ের এই সরল সহজ কথা থেকে শিখছেন। বুঝতে পারছেন।

আম্মা আবারও বলেন, শেখ সাহেবের কিন্তু কোনো ভুল করা চলবে না। যদু মধুর কথা শুনলে তার চলবে না। বাংলার মানুষের কথা তাকে শুনতে হবে। মানুষের অন্তর কী চায় সেইটা বুইঝা শুইনা পা ফেলতে হবে। আইয়ুবের দিন শেষ, এখন বাংলার মানুষের দিন শুরু। ভোগান্তি দুর্ভোগ যত চরমে হোক, বাংলার মানুষের জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না রে হাসু।

মায়ের কথা শুনে ভাবালুতায় পেয়ে বসে হাসিনাকে। অলৌকিক এক অনুভব তাকে মোহাবিষ্ট করে তুলছে।

ঠিক বলছেন আম্মা। ষোলো আনাই ঠিক। শোক ও ক্ষোভের ঢেউয়ে সারা বাংলাই এখন উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে। ঘুমন্ত মানুষ যেন এক যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় প্রতিদিন বীর পদক্ষেপে অবিনাশী আগুন হয়ে উঠছে। আইয়ুব যত চালবাজি করুক, বাঙালির মহাজাগরণকে পণ্ড করতে পিন্ডি যত ফৌজিদের পিন্ডি চটকে নিত্য নতুন ঢং বাহানা করুক, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ৩২ নম্বরের বাড়িতে সব খবরই আসছে। আম্মা, হাসিনা সব কিছুই জানতে পারছেন।

মোনায়েম খানসামা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। ধর্মের নামে মহাঅধর্ম করছে তারা। মানুষের সামনে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে উঠছে ক্রমশ। মুসলিম মিল্লাত, কওম – ইত্যাদি নাম ভাঙিয়ে আইয়ুবের ফৌজি রং তামাশা, মদ্যপান, নারীসম্ভোগ আর কাজে আসছে না। জনগণের রক্ত পান অফুরান হয়ে উঠছে। হত্যা, গুম, গ্রেফতার, জেলজুলুমই এখন আইয়ুবের শেষ অস্ত্র। রক্তের নেশায় বুভুক্ষু। কিন্তু বাঙালি নির্ভীক। যুবক-তরুণ-ছাত্র সবাই আন্দোলনের রাস্তায়। মিছিল শ্লোগান অলিতে গলিতে। অভূতপূর্ব, অবিস্মরণীয় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বাইরের হাওয়ায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সাগর গর্জনের দূরাগত শব্দ। ক্রমশ কাছে চলে আসছে শব্দ। কখন কী ঘটে যায় – মহা আবাহন চারদিকে। আইয়ুবি খুনে হোলি খেলায় আম্মা মাঝে মধ্যেই ভীষণ মুষড়ে পড়ছেন। কখনো কখনো তার চোখের কোণে স্ফটিক বিন্দু। লাশের কাফেলা দেখে আহত হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে সামলে নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। হাসিনাও উদ্বিগ্ন মর্মাহত প্রতিদিনের দুঃসংবাদে। আইয়ুব কী করতে চাইছে! সে কি হাজার হাজার বাঙালি মেরে রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিতে চায়? প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও রক্ত বইয়ে চলেছে সে। একদিকে গোলটেবিল বৈঠকের রাজনৈতিক মূলো ঝুলিয়ে রাখলেও অন্যদিকে তার খুন পিপাসাও থামছে না। বাংলাময় রক্তপাতের লাল সংকেত দেখিয়ে ভয় খাওয়াতে চাইছে বাংলার উজ্জীবনকে।

কিন্তু পূর্ববাংলা ক্রমশ অভয়দুর্গ হয়ে উঠছে। আইয়ুবের দুর্বৃত্তহানায় বাঙালির চিত্ত মোটেই কাবু নয়। খুন খারাপি, পুলিশ ফৌজি গুলি – তাতে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং মনোবল হচ্ছে দৃঢ়। শ্লোগানে মিছিলে ময়দানে বেড়েই চলেছে মানুষ। আম্মা বারান্দা থেকে সব কিছুই বুঝি দেখতে পাচ্ছেন। তার মন ক্ষতবিক্ষত। তবুও তিনি হতাশ নন। কামাল বেশিরভাগ সময়ই থাকছে বাইরে। সদ্য তরুণ। টগবগানো তারুণ্য। কেউ কেউ আম্মাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। দু’একজন মুরব্বি নেতাও বলছেন, দিনকাল ভালো যাচ্ছে না ভাবী! আইয়ুব টার্গেট করেছে মুজিব ভাইকে। কখন যে কাকে গুম করে ফেলে বলা যায় না। কামালের হুঁশিয়ার হয়ে চলা উচিত।

হাসিনাও ক্যাম্পাসে যাচ্ছেন নিয়মিত। ছাত্র-জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে চলছেন। অতি শুভাকাঙ্খীরা তাদের সদুপদেশ বিলিয়ে ফিরছেন। তাতে কান দেননি মা। তিনি সোজাসুজিই বলছেন, শেখ সাহেবের জন্য রক্ত দিতে কার্পণ্য করছে না বাঙালি। এ সময় মুজিবের পুত্র-কন্যা ঘরে চার দেয়ালের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। তাদেরও মানুষের সঙ্গে মানুষের পাশে থাকা উচিত। তাতে তাদের যদি যায় প্রাণ, কোন খেদ থাকবে না। মুজিবের পরিবারের লোকজন আর দশজন বাঙালির মতোই মানুষ।

মায়ের এই প্রত্যয় মোটেই মিথ্যে নয়। টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ঢাকা – শেখ সাহেবের আত্মীয়-পরিজন, জ্ঞাতিগুষ্টি যারা যেখানে আছে – কেউ ঘরে বসে নেই। মহামিছিলে সবাই শরিক।

কামালকে সেখানে আম্মা কেমন করে বুকের আঁচলে আগলে রাখবেন। কঠিন কথাকে তিনি বলতে পারেন খুব সহজে। এক অতি শুভাকাঙ্খী পরিজনকে তিনি বলেই দিয়েছেন – আওয়ামী লীগের আর দশটি তরুণ ছেলে আমার কাছে যেমন আপন, কামাল ঠিক তেমনই। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

তাই বলে আম্মা কিন্তু কামালকে ঠেলে পাঠাননি ছাত্র-জনতার কাতারে; কামাল মিছিলের একজন তার নিজেরই আগ্রহে। বাবার প্রতি তার এক অদ্ভুত নীরব ভালবাসা; তার খুব ইচ্ছে – বাবার মতো অনেক বড় হবে; অনেক বড় মানুষ। বাবার মতো সবার প্রিয় মানুষ। তাই সে প্রতিটি পা ফেলেছে বাবার পদাঙ্কে।

ঢাকা, বরিশাল, রংপুর থেকে আসছে নানা খবর। মিছিল সমাবেশে দমন নিপীড়ন হুমকি ধমকি। লাশ বানিয়ে ফেলার ভয়ভীতি। তারপরও মিছিল সভা সারা দেশজুড়ে। আহত নিহতের খবরও আসছে ৩২ নম্বরে। শুনে আম্মা শোক বিহ্বল হয়ে পড়ছেন। একান্ত মমতায় খোঁজখবর করছেন, নিহত ছেলেটি কে! বাড়ি কোথায়। সংসারের কী অবস্থা। ভেঙে পড়া পরিবারটিকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা করার উপায় কী!

আইয়ুবের ফৌজি মৌজি আতঙ্ক জমানা। সাহায্য সহযোগিতার উপায় বের করা কি ছেলের হাতের মোয়া! তবুও কোনো কিছুই আম্মার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। তিনি সদা তৎপর। এর কাছে ওর কাছে নানা তরফে তালাশ করছেন দুর্ভাগা পরিবারটির। শেখ সাহেব জেলখানায়। তিনি আজ মুক্ত থাকলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিশ্চয়ই ছুটে যেতেন। বজ্রকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতেন। তারই পত্নী হিসেবে আম্মারও দায়দায়িত্ব কম নয়। কোনো শোরগোল না তুলে, কোনো আওয়াজ না দিয়ে তিনি ঠিকই নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন একান্ত আগ্রহে।

কোথাও থেকে কোনো মৃত্যুর খবর এলে, মিছিলে হামলার খবর এলে মা খুবই সংক্ষুব্ধ। তার শোকার্ত মুখ দুঃখে মলিন। ওরে আইয়ুব রে আইয়ুব – আর কত লাশ ফেলবি তুই! বাঙালিকে লাশের ভয় দেখায় দাবিয়ে রাখবি আর কয়দিন?

ঠিক তাই। মানুষকে আর আইয়ুব দাবিয়ে রাখতে পারছে না।

সার্জেন্ট জহুরুলকে গুম খুন করে আইয়ুব আগুনের গুদামে টনকে টন ঘি ঢেলে দিলো। তার জানাজায় লোক আর লোক। জানাজা তো নয়। ক্ষোভ ও শোকের হিল্লোল। বিকেলে সন্ধ্যায় চলতে থাকল মিছিল আর মিছিল। ছাত্র-জনতা আর ঘরে ফিরতে রাজি নয়। এই সঙ্গীন মৃত্যুমুখর দিনে শেখ সাহেবকে তাদের চাই-ই চাই। আইয়ুবের পোষ্য ভৃত্য মোনায়েম খানসামার নামে থু থু, ছি ছি ধিক্কার পেশাবের জলপ্রবাহ ভাসিয়ে নিতে চলেছে জগদ্দল মসনদকে। তিন তিনটে ডাকসাইটে জাহাবাজ মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন দিলো ছাত্রজনতা। আইয়ুবের পোষ্য সারমেয়গুলো পালিয়ে লাপাত্তা।

কনভেনশন মুসলিম লীগ আইয়ুবের ঠাঁই। এই ঘেয়ো দলটির বাংলা-প্রধানের বাড়িতেও হামলা করল মানুষ। পুলিশ-ফৌজি পাল্টা হামলা চলছে। রক্তপাত ঘটছেই। বঙ্গোপসাগর আর সবুজ শ্যামল ভূখণ্ডে ঘেরা এই পূর্ববাংলা। সাগরে গর্জনের শব্দ তীব্র হচ্ছে। শ্যামল বাংলার মাঠে ময়দানে, প্রান্তরে চকমকি পাথরের ঘর্ষণে জ্বলে উঠছে বহ্নিশিখা। এই বহ্নিশিখা ছড়িয়ে ছাই করতে চলেছে আইয়ুবের শাহী মসনদকে। ফৌজি বন্দুক-কামানের উপর এই মসনদটির অবস্থান। তারপরও আইয়ুবের শেষ রক্ষা হচ্ছে না। শেষ ফেব্রুয়ারির এক বিকেল। খবর এলো সন্ধ্যাতেই প্যারোলে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন শেখ সাহেব। আম্মা ভীষণ বিচলিত খবরটি শুনে। প্যারোলের কথা শুনে তিনি যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।

বিকেলেই তিনি শেখ সাহেবের দেখা পেতে একান্ত ব্যাকুল। অনেকেই ভাবল – স্বামীকে মুক্ত দেখতে চাইছে পতিব্রতা পত্নী। খুবই স্বাভাবিক। তবুও আম্মার ব্যাকুলতা যেন একটু বেশিই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার লালিমা তখন পশ্চিমের আকাশে। মেঘ নেই। দিনও যেন একটু বেশিই আবির মাখানো। ক্যান্টনমেন্টে ট্রাইব্যুনালের অফিস। সেখানে পৌঁছে গেছেন তিনি। সঙ্গে হাসিনা, রেহানা, জামাই ওয়াজেদ, আরও কয়েকজন। হাজারো মানুষও সেখানে হাজির। ফৌজি রক্তচক্ষু কোনো কাজে আসেনি, বরং ছাত্রজনতার রক্তচক্ষু দেখে ভড়কে গেছে ফৌজি নজরদারি। কোত্থেকে কেমন করে এলো এতো মানুষ! জেগে উঠছে বাঙালি! সত্যিই যে তবে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা খুব কষ্টসাধ্য। জাগো বাঙালি জাগো। অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে পড়েছে ঘুম ভাঙানি গান।

ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ট্রাইব্যুনালের সামনে মানুষের তীব্র প্রতীক্ষা। কখন তারা একনজর দেখতে পাবে মুজিবকে। কখন তিনি বেরিয়ে আসবেন সবার সামনে। প্রতীক্ষার একেকটি মুহূর্ত তখন দীর্ঘ হচ্ছিল। ছাত্র-জনতা এমনই অপেক্ষায় – প্রিয় মুজিবের যে কোনো রকম মুক্তিই যেন তাদের অনেকের কাছে মহার্ঘ্য। এই মুহূর্তে তারা মহান নেতাকে চোখের সামনে দেখতে চায়। অনেকের ইচ্ছা – ছুঁয়ে স্পর্শ করে দেখবে, শেখ সাহেব সুস্থ আছেন তো! মুজিব বেঁচে আছেন তো! হৃদয়ের স্পন্দন শোনা যাচ্ছিল মানুষের। শুনতে পাচ্ছিলেন আম্মাও। তিনি ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে কয়েক নজর দেখলেন। কোন অচিন বাঁধভাঙ্গা আবাহনে এত্ত মানুষ ক্যান্টনমেন্টের রক্তনখর বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে ছুটে এসেছে এখানে! তাদের প্রাণের মায়া নেই! তারা কি ভয় পায় না আইয়ুবকে!

মানুষ এমন কী ভালবাসে মুজিবকে!! হাসিনাও ভালবাসা-মুগ্ধতার চোখে সবকিছু দেখছিলেন। বাবার জন্য অপেক্ষায় তিনি কাতর। আবার বাবার জন্য মানুষের এত বিশাল ভালবাসা দেখে বিস্মিত হয়ে পড়ছিলেন। মানুষ জাগলে কেউ আর মহাজাগরণকে ঠেকাতে পারে না। রুখতে পারে না। মানুষই পারে সবকিছু। মানুষের ঐক্য পারে মাতাল সাগরের তাণ্ডবকে রুখে দিতে। উন্মত্ত বুনো হাতির পালকে পায়ে দাবিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে এই মানুষ। আবার সেই মানুষই পারে জনোচ্ছ্বাস প্রাণোচ্ছ্বাস ভালবাসার তাণ্ডবে সবকিছু ভাসিয়ে নিতে। মহৎ কিছুর নির্মাণ যেমন তার পক্ষে সম্ভব; তেমনি ভয়ংকর দানবকে পিষে ফেলা এই মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এই ছাত্রজনতাই অসীম সাহসে অবিনাশী জয়োল্লাসে আইয়ুব ফৌজী শাহীকে আজ পায়ের নীচে চেপে ধরেছে। এখন টুটিটি পায়ে দলে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া বাাক।

আম্মার চোখে পানি দেখছেন হাসিনা। আম্মা কি আনন্দে কাঁদছেন? কত কাল পরে দেখতে পাবেন স্বামীকে। না, কাঁদছেন কই! তিনি হাসিনার দিকে তাকিয়ে মৃদু মন্ত্র জপ করার মত বললেন, এই বাঙালি এখন যা বলবে, তোর বাপকে তাই শুনতে হবে। দেখবি একদিন আসবে যখন তোর বাপ যা বলবে – এই বাঙালি তাই শুনবে। পালন করবে অক্ষরে অক্ষরে। মানুষই বানায় জনদেবতা। তারপর সেই দেবতাকে সর্বস্ব মানে।

আশ্চর্য! আম্মা এসব কেমন করে বলছেন। তিনি অলৌকিক চোখে দেখছেন আগামী ভবিষ্যতকে। কাছেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের ছোট অফিস। অদূরে ফৌজী মেস। বলতে গেলে একদম পায়ের নাগালে। হেঁটে যাওয়া তেমন কষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু মেসটিকে ঘিরে যেন লাল দালানের দুর্ভেদ্য দেয়াল। হাসিনার দুরন্ত মনের ইচ্ছে পাখির উড়াল ছন্দে নেচে উঠতে চাইছে। মন চাইছে এক ছুটে গিয়ে বাবাকে একবার দেখে আসে। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের নিশ্চয়ই মন চাইছে তাই। নেতাকে ওরা কেমন করে মুক্ত করে আনবে, সেই অদম্য ইচ্ছা। যদি সত্যিই জনতা তেমনটা চায় – আর্মির এমন কী সাধ্যি মানুষকে ঠেকাবে। তেমন বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে কোনো সময়। জীবন মরণকে তুচ্ছ করে, আর্মির সাত খুন মাফের গুজব-গল্পকে পাত্তা না দিয়ে জনতা এভাবে ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে ধরবে – ফৌজীরা তা কল্পনা করেনি। কিন্তু এখন সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আম্মা, হাসিনা, অন্যরা গাড়িতে বসে অপেক্ষায়। একটু পরে মেসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন তরুণ এক উজ্জ্বল ব্যারিস্টার। আগরতলা মামলায় তিনি লড়ছেন। শেখ সাহেবের প্রধান কৌসুলির সহকারী। গাড়ির পাশে দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। দ্রুত পায়ে এগোচ্ছিলেন ট্রাইব্যুনাল অফিসের দিকে।

আম্মা তাকে ডাকতে বললেন। ব্যারিস্টার কাছে এসে সালাম দিলেন তাকে। কী অবস্থা বাবা মামলার? আজ কি কিছু হবে? কোনো খবর দিতে পারবেন!

ব্যারিস্টার আগুপিছু কিছু একটা ভাবলেন। তারপর আস্তে আস্তে জানালেন, তিনি কোর্টে প্যারোল চেয়ে আবেদন করতে যাচ্ছেন।

প্যারোল! প্যারোল কেনো! আম্মা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলেন। শেখ সাহেবের মুক্তি যে প্যারোল ছাড়াই দরকার।

ব্যারিস্টার বললেন, কোর্টে তাকে প্যারোলের কথাই বলতে বলা হয়েছে। তিনি সিনিয়রের আদেশ শুনেই কাজটি করতে যাচ্ছেন।

ক্ষুব্ধ হলেন আম্মা। বললেন, না বাবা, প্যারোলে মুক্তি বাঙালি চায় না। মানুষ এখন কোনো শর্ত ফর্ত মানবে না। বাঙালি চায় শেখ সাহেবের নিঃশর্ত মুক্তি। সেটাই দরকার। তুমি বাবা, শেখ সাহেবের কাছে আমার এই কথাটা খালি বলবা। পারবা না? ব্যারিস্টার বেশ একটু বুঝি দ্বিধান্বিত । চিন্তিত। তারপর মাথা নেড়ে চলে গেলেন ট্রাইব্যুনাল অফিসের দিকে। আম্মার উদ্বেগ শঙ্কা বাড়ছেই। ছেলেটা শেখ সাহেবের কাছে কথাটা বলতে পারবে তো!

অপেক্ষার মুহূর্তগুলো আবারও দীর্ঘ হতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা ফৌজী গাড়ি সচল হয়ে উঠল। ভারী চাকার শব্দ। হাজারো মানুষের তপ্ত নিঃশ্বাসের মাঝে হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ। সচকিত সকলে। কী ব্যাপার? অন্যকিছু ঘটতে চলছে না তো! জনতা তাদের হৃদয়ের স্পন্দনকে আশার সুতোয় বেঁধে শান্তিপূর্ণভাবে সবকিছু দেখছে। তারা চায় শেখ সাহেবের মুক্তি। সেজন্য অধীর অপেক্ষা। কোনো অশান্তি তারা চায় না। সবকিছু শান্তিমতো ঘটুক; কোনো চাল-ছলবাজি যেন না হয়। সেজন্য দিচ্ছে পাহারা।

গাড়িগুলো মেসবিল্ডিং কম্পাউন্ডে ঢুকল। শেখ মুজিবসহ অন্যরা গাড়িতে উঠলেন। তাদের আনা হলো ট্রাইব্যুনাল কোর্টে। দূর থেকে মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে সবকিছু দেখছে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রাতের আলো-আঁধারি। শাল সেগুন দেবদারু কাঠবাদাম নানারকম গাছের সারি। বৃক্ষপল্লবের আড়ালে টুকরো টুকরো অন্ধকার।

কোর্টে কী ঘটছে? পিন্ডির বদমতলবী ট্রাইব্যুনাল । কয়েকমাস ধরে বিচার প্রহসন সেখানে চলছে। পিন্ডি যেমন হুকুমবাজি করছে; ট্রাইব্যুনাল চলছে আইয়ুবের মগজধোয়া পানিতে। আইয়ুবি মতলবই তামিল করছে তারা। কোর্টে গোঁফ বাগিয়ে বসা বিচারক। ওরা মতলবের বাইরে কিছুই করবে না।

বিক্ষিপ্ত কিছু ভাবনা পেয়ে বসল হাসিনাকে। সত্যি, আম্মা অনেক দূরটি পর্যন্ত দেখছেন। উদ্দীপ্ত জাগ্রত জনতা কী অবলীলায় বীরদর্পে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকে পড়েছে। কেউ তাদের ডেকে আনে নি। ওরা এসেছে নিজের প্রাণের দাবির তাগিদে। অন্তরাত্মার ইশারায়। মুজিবের জন্য প্রাণের ভয়ডর পর্যন্ত নেই। রাতের অন্ধকারে এই ফৌজী আস্তানায় কত কিছুই তো ঘটতে পারে। শয়তানের শত ছল। দৃশ্যত মনে হচ্ছে আর্মি আজ কিছু বলবে না। হাজারো মানুষের নীরব পদভার সত্ত্বেও তারা চুপটি করে রয়েছে। কোনো বাধা বিপত্তি হাঙ্গামা ঘটেনি। নিশ্চয়ই ওদের নজরদারি ষোলো আনা রয়েছে। কিন্তু খেলা আর তাদের দখলে নেই। তাই কোনো উদ্ধত বেপরোয়া আচরণ করছে না। মানুষও শান্তিপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে।

তারপরও কখন কী ঘটে যায়। কোনো আশঙ্কাই উড়িয়ে দেয়া যায় না। সারাদেশ জুড়ে আইয়ুব দমন দলন পীড়ন নির্যাতন চালাচ্ছে। ভীষণ বেপরোয়া। জনগণ, বাঙালি আজ পিন্ডির চরম শত্রু। শেষ কামড় দিয়ে চলেছে আইয়ুব খানসামারা। চারিদিকটা চুপচাপ।

কী হচ্ছে কোর্টের ভেতরে! বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ব্যারিস্টার কি আব্বাকে আম্মার কথাগুলো বলতে পারলেন! লোকটার ভাবগতিক দেখে অবশ্য কিছুই আন্দাজ করা গেল না। কেমন নিস্পৃহ। নিরাসক্ত মনে হচ্ছিল তাকে। আইনের লোক। অমনটাই তাদের বুঝি হতে হয়।

সন্দেহ নেই, আম্মা যা বলেছেন, তা জনগণের মনেরই ভাষা। আম্মা তা ঠিক ঠিক পড়তে পেরেছেন। তার অনুধাবনে কোনো ভুল নেই। কিন্তু আব্বার কানে যদি কথাগুলো না যায় তখন? যদি তাকে বলা না হয়! এই সংশয় উদ্বেগ থাকছেই। আম্মাও বার বার ব্যাকুলতা প্রকাশ করছেন। তিনি বেশ শঙ্কিত। তোর বাপের কানে শেষ পর্যন্ত কথাটা যাবে তো! ঐ ব্যারিস্টারকে যা বললাম, সে গিয়ে তোর বাপকে নিশ্চয়ই বলবে। তাই না?

নিজেকেই যেন নিজেই প্রবোধ দিচ্ছেন আম্মা।

এক একটা মুহূর্ত; এক একটা মিনিট যেন অন্তহীন হয়ে উঠল। সময় কাটছে না। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে কি না বলা মুশকিল। অবশ্য আব্বার ওপর হাসিনার ভরসা ষোলো আনা। আব্বা এমনই বাঙালি অন্তপ্রাণ; তিনি সবকিছু নিশ্চয়ই অনুধাবন করে থাকবেন। কেবল এই ফৌজীখানার নিঝুম গরাদ কেন, তাকে পাতালপুরীতে নিয়েও যদি আটকে রাখত ওরা – তিনি জনতার মন-স্পন্দন ঠিকই টের পেতেন।

প্যারোলে মুক্তি বাঙালি একদমই চায় না। সার্জেন্ট জহুরুল হককে তো এই আগরতলা মামলার আসামী বানানো হয়েছিল। ফৌজীখানার গুপ্ত আঁধারে লোকচক্ষুর অন্তরালে এখানেই জল্লাদরা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। ওরা কাপুরুষ। বেঈমান। ওদেরকে বিশ্বাস করা যায় না। প্রহসনের বিচার তবু চলছিল। আসামীদের ওরা মিথ্যা বিচারের নামে ফাঁসিতে লটকানোর প্রতিজ্ঞা করেই এই ট্রাইব্যুনাল-নাটক মঞ্চস্থ করছিল। কই, সেই সাজানো বিচারের তো সবুর সইল না। ফৌজী হেফাজতেই জল্লাদি দম্ভ দেখাতেই হত্যা করল তাকে। ভেবেছে, এতে মুজিবকে ভয় খাওয়ানো যাবে। প্রাণের মায়ায় মুজিব সব শর্ত মেনে নেবেন। ওরে পাষণ্ড, হাত পা বেঁধেই যদি কাপুরুষের মতো পেছন থেকে হত্যা করবি, তবে কিসের বিচার-প্রহসন? কিসের এই এজলাস আদালত!

এই ফৌজী খানসামাদের মোটেই বিশ্বাস করা যায় না। এরা বাঙালির বিশ্বাসের যোগ্য নয়। (চলবে…)

অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন

Previous Post

জনসংখ্যায় ভয় নেই, তা আমাদের সম্পদ: প্রধানমন্ত্রী

Next Post

‘এবার কার মৃত্যুবার্ষিকীতে শোক করব?’

Next Post

‘এবার কার মৃত্যুবার্ষিকীতে শোক করব?’

বাংলাদেশে কেন রাজাকারদের সমর্থক রয়েছে?

সর্বশেষ

জেমসের নতুন গানের পরিবেশনা, মঞ্চে গিটার ও মাইক্রোফোন হাতে শিল্পী. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

ঘর ছেড়ে আজিজ বোর্ডিং, সংগীতে আজও অপ্রতিরোধ্য জেমস

অক্টোবর 2, 2026

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ কবে, কার বিপক্ষে, কোথায়

অক্টোবর 2, 2026
প্রাকৃতিক পরিবেশে মিথিলা সুন্দরভাবে ছবি তুলেছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

মিথিলার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন

অক্টোবর 2, 2026

দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ চলছে: মাহদী আমিন

অক্টোবর 1, 2026

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরু কবে, জানাল আইসিসি

অক্টোবর 1, 2026
iscreenads
চ্যানেল আই অনলাইন লোগো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদ পোর্টাল. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT