সকাল ১০টায় অফিসে এসে কিছুটা আলস্য নিয়েই আজ কি কি খবর যাচ্ছে তা দেখার জন্য ডিএনই ফাইলটা খুললাম। ৩/৪ সেকেন্ড পরই চোখে পড়ল। সন্তোষ দাদার মৃত্যুর সংবাদটি। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
দাদা, আমার অনেক অনেক প্রিয় দাদা। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে নিউইয়র্কে মারা গেছেন। এখনো পর্যন্ত আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, দাদা নেই।
এ রকম নির্ভীক, দাপুটে, প্রভাবশালী ক্রাইম রিপোর্টার চ্যানেল আই তে আমি একজনও দেখিনি। দাদা ছিলেন তার কনিষ্ঠ সহকর্মীদের প্রতি ভীষণ স্নেহশীল। সমসাময়িকদের সাথে বন্ধুসুলভ। অনেক প্রানবন্ত। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। চ্যানেল আইতে কাজ করতে এসে আমি সন্তোষ দাদার মতো এত বড় সাংবাদিক ও এত ভালো একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। তুখোড় রিপোর্টার ছিলেন তিনি।একটি অপরাধের ঘটনা ও এর পেছনের মোটিভগুলো খুব সাবলীল ভাষায় রিপোর্টিং এর মাধ্যমে তুলে ধরতেন দাদা।
২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে সাপ্তাহিক মিটিং এ চিফ নিউজ এডিটর শাহ্ আলমগীর ভাই, আমরা যারা নতুন জয়েন করেছি তাদের জিগ্যেস করেছিলেন, কে কোন্ বিটে কাজ করতে চাও। আমি নিদ্বির্ধায় এবং কিছু না বুঝেই বললাম ক্রাইম বিটের কথা। শুনে সন্তোষ দাদা অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। মনে আছে তার দু’দিন পরই এক রেলওয়ে কর্মকর্তা দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছিলেন। সন্তোষ দাদা আমাকে মতিঝিলে এজিবি কলোনীতে সেই স্পটে পাঠাতে দ্বিধা করেন নি এতোটুকুও।
অফিসে দেখতাম যে কোনো রিপোর্টার অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ফিরে আসলে তিনি সমস্ত ঘটনা আগে শুনে নিতেন। পরে নিজেই ব্রিফ করতেন ওই রিপোর্টের টেম্পারমেন্ট সম্পর্কে। একটি রিপোর্টের গুরুত্ব তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষন করতেন। তার নিউজের সিক্সথ্ সেন্স ছিল অসাধারন। সবাইকে সমানভাবে সহযোগিতা করতেন সন্তোষ দাদা। ছিল রসবোধও। দাদার নির্দেশ পালন করতেও ভাল লাগতো খুব।
সে সময় চ্যানেল আইয়ের ক্রাইম বিট্ মানেই সন্তোষ মন্ডল। রাজনৈতিক অ্যাসাইনমেন্টও দক্ষতার সঙ্গে কাভার করতেন দাদা। এসব করতে গিয়ে প্রচন্ড সাহসিকতারও পরিচয় দিয়েছেন তিনি। আলমগীর ভাই, নিউজ রুমে এসে দাদাকে সন্তোষ না বলে সন্ত্রাস বলে সম্বোধন করতেন। সবাই একসাথে হেসে উঠতাম আমরা। দাদা কোন কিছুতেই ভয় পেতেন না। আমাদেরকেও অনেক সাহস দিতেন। দায়িত্ব পালনে তিনি একনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
আমার প্রতি দাদা ছিলেন একাধারে স্নেহশীল, সেইসাথে শাসনও করতেন । মনে আছ সে সময় সহকর্মী রিজভী নেওয়াজ সব সময় আমাকে সন্তোষ দাদার চাম্চা বলে সম্বোধন করতো। শুনে রাগ তো দূরের কথা। ভালো লাগতো ভীষণ। দাদাকেই সে বলতো, চ্যানেল আইতে আপনার একটি নব্য চাম্চার উদয় হয়েছে। শুনে দাদা হাসতেন।
২০০৭ সালে আমাকে যখন ন্যাশনাল ডেস্কে দেয়া হলো। মেনে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই। এখন বলতে দ্বিধা নেই, প্রথমেই ফোন দিয়েছিলাম দাদাকে। দাদা বলেছিলেন, এখানেই থাকো। আমার বিশ্বাস তুমি ভালো করবে। দাদা আমি এখনো ন্যাশনাল ডেস্কেই আছি। আপনি চলে গেছেন বহু বহু দূরে। দাদার প্রতিটি পরামর্শ আমি বেদবাক্যের মতো পালন করতাম। দাদার মনটা ছিলো আকাশের মতো বিশাল। হ্যা, সন্তোষ দাদাকে আকাশের সাথেই তুলনা করি আমি। যার মনের বিশালতা অনুমান করা যায় না। 
একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। দাদা যখন কাঁটাবনে ফ্ল্যাট কিনলেন। নিউজ সেকশনের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আলমগীর ভাই থেকে শুরু করে সব রিপোর্র্টার, ক্যামেরামান, ভিডিও এডিটর এমন কি নিউজের ড্রাইভাররাও দাদার বাসায় গিয়েছিলেন সেই দাওয়াতে। সে সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার রহমান মুস্তাফিজ ভাই, দাদার দুই ছেলে মেয়ের জন্য কিছু চিপস্ ও চকলেট নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই চকলেট ও চিপস নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হলো ফারহানা, আশরাফুল আলম খোকন ও আমার মধ্যে। শেষে আমি পেলাম না একটিও। দাদা পরে আমার হাতে একটি চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, শম্পার শুধু মুখেই পটর পটর। মারামারি করতে পারে না একটুও।
২০০৮ সালে আমার বিয়ের দাওয়াত দিতে দাদার বাসায় গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে দেখছিলাম, চ্যানেল আইয়ের এক সময়ের নির্ভীক, শক্ত সমর্থ চিফ রিপোর্টার সন্তোষ মন্ডলকে। সে সময় অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। দাদা ভীষন ভেঙ্গে পড়েছিলেন শারিরীক এবং মানসিকভাবে। ভুগছিলেন ডায়াবেটিসের সমস্যায়। দাদা আমাকে বললেন, এই শুভ সময়ে তাকে যে মনে করে দাওয়াত দিতে এসেছি। এতেই তিনি খুশি। আমার চোখে পানি এসে গেল। বললাম. দাদা আপনাকে মানুষ মনে রাখবে আপনার অনবদ্য রিপোটিং এর জন্য। দাদা আমার বিয়েতে আসেন নি। নিজেকে সান্তনা দিয়েছিলাম এই বলে, চ্যানেল আইয়ের সাথে এখন তাঁর সম্পৃক্ততা নেই বলেই এড়িয়ে গেছেন তিনি ।
গত বছর আমেরিকা যাওয়ার আগে চ্যানেল আইতে প্রনব দাদার রুমে শেষ দেখা হয়েছিলো সন্তোষ দাদার সঙ্গে। আমেরিকা যাবার পর আমি প্রায়ই প্রনব দাদাকে সন্তোষ দাদার কথা জিগ্যেস করতাম।
দাদার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তার দুই ছেলেমেয়ের কথা বার বার মনে পড়ছে। ¯েœহা ও স্বাগত। দাদার ছেলের বয়স এখন কত। অনুমান করছি ১০ কিংবা খুব বেশী হলে ১১। খুব ছোট থাকতেই পিতৃহারা হলো স্বাগত। মেয়েটিও ছোট। ১৫ বা ১৬ বছর বয়স। স্নেহা-স্বাগত, সৃষ্টিকর্তা তোমাদের এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দান করুন । শোকে মূহ্যমান দাদার স্ত্রীর প্রতি রইলো সহমর্মিতা। আর দাদা আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। আপনার জন্য অনেক অনেক ভালবাসা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)<









