অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মিছিল যেন কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছে না। একে একে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের যৌবনের মিছিলের সাথীরা। যাদের সঙ্গে একদিন রাজপথে হেঁটেছি, স্লোগান দিয়েছি, রাত জেগে গল্প করেছি, একই প্লেটে খাবার ভাগ করে খেয়েছি, ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি—আজ তাদের একজন একজন করে বিদায় জানাতে হচ্ছে। শোক জানানোর ভাষাও যেন ফুরিয়ে এসেছে।
কাউকে হারালে আমরা বলি—‘গভীর শোক ও সমবেদনা।’ কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু আছে, যেখানে এই কথাগুলো ভীষণ নিষ্প্রাণ, ভীষণ আনুষ্ঠানিক মনে হয়। ইয়াসিন ভাইয়ের মৃত্যু তেমনই একটি মৃত্যু। তাঁর জন্য শোক জানাব কার কাছে? তাঁর পরিবারের কাছে? বন্ধুদের কাছে? সহযোদ্ধাদের কাছে? নাকি নিজেদের কাছে? আমরা তো নিজেরাই তাঁর পরিবারের একজন।
আজ সকালে মধুবাজারের বাসায় মোহাম্মদ ইয়াসিন ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল, তা শোক নয়—অবিশ্বাস। মনে হচ্ছিল, না, এটা হতে পারে না। এতবার তো তিনি মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছেন। এবারও হয়তো ফিরবেন। হয়তো কোনো একদিন ফোন করে বলবেন, ‘কী খবর? আসো, বসি।’ কিন্তু ফোনটি আর আসবে না। এই ‘আর’ শব্দটাই সবচেয়ে কষ্টের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যখন ভর্তি হই, তখন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ দুজা আর সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন ইয়াসিন ভাই। আমাদের কাছে তখন পদ-পদবি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমরা মানুষটাকে দেখতাম। আর ইয়াসিন ভাইকে দেখলে মনে হতো—এই মানুষটির মধ্যে অদ্ভুত এক তাড়না আছে। কিছু একটা করতে হবে, কোথাও যেতে হবে, কাউকে সঙ্গে নিতে হবে।
আমার বন্ধু ইনু ইয়াসিন ভাইয়ের সঙ্গে মুহসীন হলে থাকত। সেই সূত্রে মুহসীন হলে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আজ এত বছর পর চোখ বন্ধ করলে সেই হলের রুমটা আবার দেখতে পাই। নিচ তলায়, মাঠের পাশে। সেই রুমে বসে সিগারেটের ধোঁয়া, হইচই, তর্ক, আর অন্তহীন আড্ডা। কখন যে আড্ডা শুরু হতো, কখন রাত গড়িয়ে যেত—তার কোনো হিসাব থাকত না।
রাজনীতি নিয়ে কথা হতো। সংগঠন নিয়ে কথা হতো। কে কী বলল, কোথায় কী কর্মসূচি হবে, আগামীকাল কোথায় যেতে হবে—এসব ছিলই। কিন্তু তার বাইরেও ছিল জীবনের অসংখ্য ছোটখাটো গল্প। কে প্রেমে পড়েছে, কার সঙ্গে কার ঝগড়া, কে পরীক্ষায় কী করেছে, কে টাকা ধার নিয়েছে, কার পকেট ফাঁকা—সবই আলোচনার বিষয়। আর এসবের মধ্যেই ইয়াসিন ভাই ছিলেন স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত, কখনো প্রচণ্ড সিরিয়াস, আবার মুহূর্তেই হাসিতে ফেটে পড়তে পারা একজন মানুষ।
তাঁর মধ্যে একটা ব্যাপার খুব স্পষ্ট ছিল—তিনি বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। কোনো কর্মসূচি হলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যেত। কোথাও মিছিল হলে তিনি সামনে। কোনো সমস্যা হলে তিনি ছুটছেন। নতুন কেউ সংগঠনে এসেছে—তাকে নিয়ে বসেছেন, কথা বলেছেন। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তর্ক করছেন। কোনো কাজ আটকে আছে—নিজেই উদ্যোগ নিচ্ছেন। তখন আমাদের বয়স কম। আমরা ভাবতাম, আমাদের হাতে অনেক সময়। জীবন অনেক লম্বা। সামনে অসংখ্য দিন পড়ে আছে। আজ মনে হয়, সেই বিশ্বাসটাই ছিল আমাদের যৌবনের সবচেয়ে সুন্দর সরলতা।
পুরো নব্বইয়ের দশক ছিল আমাদের উত্তাল সময়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলো। রাজপথ তখন শুধু রাজনীতির জায়গা ছিল না; আমাদের জীবনেরই একটা অংশ ছিল। মিছিলের আগে প্রস্তুতি, কোথায় জমায়েত হবে, কে কখন আসবে, পুলিশের গতিবিধি কী—এসব নিয়ে ব্যস্ততা। তারপর মিছিল, স্লোগান, দৌড়, কখনো ধাওয়া, কখনো ছত্রভঙ্গ হয়ে আবার অন্য জায়গায় জড়ো হওয়া। সেই দিনগুলোতে ইয়াসিন ভাইকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে একজন সামনের সারির মানুষ হিসেবে। তিনি শুধু মিছিলে থাকতেন না—মিছিলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন।
আমরা অনেক সময় পরিস্থিতি দেখে একটু পেছনে সরে যেতাম। তিনি বরং সামনে যাওয়ার মানুষ ছিলেন। তাঁর মধ্যে ভয় ছিল না—এ কথা হয়তো পুরোপুরি বলা যাবে না, কিন্তু ভয়কে গুরুত্ব না দেওয়ার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। আজ ভাবি, তখন আমরা কতটা তরুণ ছিলাম! আমাদের কাছে পৃথিবীটা ছিল বদলে দেওয়ার মতো বড় একটি জায়গা। আমরা বিশ্বাস করতাম, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করব। রাজপথে নামব। কথা বলব। সংগঠন করব। মানুষের পাশে দাঁড়াব। ইয়াসিন ভাই সেই বিশ্বাসেরই একজন মানুষ ছিলেন।
একসঙ্গে মিছিল, একসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে যাওয়া, একসঙ্গে খাওয়া—এই ‘একসঙ্গে’-র তালিকাটি আসলে অনেক দীর্ঘ। কতদিন যে তাঁর সঙ্গে কোথাও বসে চা খেয়েছি, কতবার যে কোনো কর্মসূচির ফাঁকে খাবার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। কখনো পকেটে টাকা নেই—তবু আড্ডা থামেনি। কখনো রাত হয়ে গেছে—তবু হলে ফেরার তাড়া নেই। কখনো কোনো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তুমুল মতবিরোধ—কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার একই জায়গায় বসে হাসাহাসি। সেই সময় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আলাদা ছিল।
মোবাইল ফোন ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। কারও সঙ্গে দেখা করতে হলে সত্যিই তার কাছে যেতে হতো। কারও খবর জানতে হলে খুঁজে বের করতে হতো। ফলে সম্পর্কগুলোও ছিল অন্যরকম। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে শারীরিক উপস্থিতি, একসঙ্গে বসা, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা—সেটাই ছিল সম্পর্কের মূল। ইয়াসিন ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ছিল তেমনই।
সময়ের সঙ্গে সবাই যার যার জীবনে চলে গেলাম। ছাত্র রাজনীতি শেষ হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আড্ডা কমে গেল। কেউ চাকরিতে গেল, কেউ ব্যবসায়, কেউ অন্য রাজনীতিতে। জীবন আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা দিকে ছুড়ে দিল। ইয়াসিন ভাইও থেমে থাকেননি। একসময় গণফোরামে যুক্ত হলেন। নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে ছিলেন। পরে শিক্ষা ও ব্যবসার জগতেও নিজের জায়গা তৈরি করলেন। সেন্টার ফর বিজনেস স্টাডিজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আল ইনসানিয়া পর্যটনের মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। এনআরবিএক্সপ্রেস ডটকমের সিইও হিসেবেও কাজ করেছেন। স্যালভেশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁকে যারা শুধু ছাত্রনেতা হিসেবে চিনতেন, তারা হয়তো ইয়াসিন ভাইয়ের এই পরবর্তী জীবনটাকে আলাদা করে দেখবেন। কিন্তু আমার কাছে মানুষটি আলাদা হয়ে যাননি। সময় তাঁকে বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে, কাজের ক্ষেত্র বদলেছে—কিন্তু মানুষটির ভেতরের সেই প্রাণশক্তিটা যেন একই ছিল।
তারপর শুরু হলো তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতার সময়। প্রায় এক দশক ধরে তিনি নানা জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই করেছেন। বন্ধু, স্বজন, শুভানুধ্যায়ী—অনেকে মিলে তাঁর চিকিৎসার জন্য ছুটেছেন। দেশে চিকিৎসা হয়েছে, বিদেশেও চিকিৎসা হয়েছে। কতবার যে মনে হয়েছে, এবার হয়তো আর পারবেন না। কিন্তু তিনি আবার ফিরেছেন। একবার নয়, বারবার।
মুমূর্ষু অবস্থা থেকে ফিরে এসে আবার কথা বলেছেন, আবার কাজের কথা বলেছেন, আবার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। তখন মনে হতো—এই মানুষটাকে এত সহজে মৃত্যু নিতে পারবে না। মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর লড়াইটা অনেকটা আমাদের সেই পুরোনো রাজপথের লড়াইয়ের মতোই মনে হতো। শরীর তাঁকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে, আর তিনি যেন ভেতর থেকে বলছেন—‘না, এখনো না।’ তাঁর মনের জোর সত্যিই অসাধারণ ছিল।
কিন্তু এবার আর পারলেন না। সব চিকিৎসা, সব চেষ্টা, সব মানুষের ভালোবাসা, সব প্রার্থনা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি চলে গেলেন।
ইয়াসিন ভাই, আপনি চলে গিয়ে আমাদের বয়সটাকেও যেন হঠাৎ অনেক বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। আপনার মৃত্যু শুধু আপনাকে হারানোর সংবাদ নয়; এটা আমাদের নিজেদের একটা সময় হারানোর সংবাদ। আপনার সঙ্গে চলে গেল মুহসীন হলের সেই আড্ডার একটা অংশ। চলে গেল নব্বইয়ের রাজপথের একটা অংশ। চলে গেল ছাত্র ইউনিয়নের সেই উত্তাল দিনগুলো। চলে গেল আমাদের অকারণ হাসি, তর্ক, উত্তেজনা, স্বপ্ন আর বেপরোয়া তারুণ্যের একটা টুকরো।
আমরা ভেবেছিলাম, একদিন আবার সবাই এক জায়গায় বসব। পুরোনো দিনের গল্প হবে। কেউ বলবে—‘মনে আছে, ওই মিছিলের কথা?’ কেউ বলবে—‘মনে আছে, মুহসীন হলে সেই রাতটার কথা?’ হয়তো হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসবে। কিন্তু সেই আড্ডায় এখন একটি চেয়ার খালি থাকবে। সেই চেয়ারটিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে। কারণ সেখানে বসার কথা ছিল ইয়াসিন ভাইয়ের।
আজ বুঝতে পারছি, মানুষ আসলে একদিনে মারা যায় না। মানুষের মৃত্যু তার নিজের জীবনের সমাপ্তি। কিন্তু যারা তাকে ভালোবাসে, তাদের জীবনে সে বারবার ফিরে আসে—একটি স্মৃতিতে, একটি গন্ধে, একটি জায়গায়, একটি পুরোনো কথায়, একটি মিছিলের ছবিতে, কিংবা হঠাৎ কোনো এক সকালে পাওয়া একটি ফোনকলে।
ইয়াসিন ভাইও আমাদের জীবনে এভাবেই ফিরে আসবেন। মুহসীন হলের কোনো পুরোনো করিডর মনে পড়লে, নব্বইয়ের দশকের কোনো মিছিলের কথা উঠলে, ছাত্র ইউনিয়নের সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে, অথবা কোনো এক গভীর রাতে যখন হঠাৎ মনে হবে—কতদিন হলো সেই মানুষটির সঙ্গে কথা হয়নি! তারপর মনে পড়বে—কথা আর হবে না।
এই না-পারা, না-হওয়া, আর ফিরে না আসার বেদনাই হয়তো মৃত্যুর সবচেয়ে কঠিন দিক।
ইয়াসিন ভাই, আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু আমাদের যৌবনের যে অংশে আপনি ছিলেন, সেখান থেকে আপনাকে কেউ সরাতে পারবে না। আপনি থাকবেন আমাদের মিছিলের ভেতর, থাকবেন মুহসীন হলের সেই দীর্ঘ আড্ডায়, থাকবেন ছাত্র ইউনিয়নের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিতে, থাকবেন আমাদের বন্ধুত্বের গল্পে।
আর থাকবেন আমাদের বয়স বেড়ে যাওয়া মুখগুলোর ভাঁজে ভাঁজে—যেখানে আজও লুকিয়ে আছে সেই তরুণ ছেলেগুলো, যারা একদিন বিশ্বাস করত, পৃথিবী বদলে ফেলা সম্ভব।
আপনি সেই ছেলেগুলোরই একজন ছিলেন। আমরাও ছিলাম। হয়তো সেই কারণেই আপনার মৃত্যুতে এত কষ্ট হচ্ছে।
কারণ আজ শুধু ইয়াসিন ভাই মারা যাননি—আমাদের যৌবনের আরও একটি দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
এই শোকের সান্ত্বনা কোথায়, জানি না। হয়তো সান্ত্বনা নেই। শুধু স্মৃতি আছে। আর সেই স্মৃতির ভেতর আপনি আছেন, ইয়াসিন ভাই—আমাদের সেই দিনগুলোর একজন হয়ে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









