নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, নিজের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা মানুষের মধ্যে অহংকারের প্রকাশ বিভিন্নভাবে দেখা যায়। ইসলামে অহংকারকে শুধু একটি খারাপ অভ্যাস হিসেবে নয়, বরং মানুষের আত্মিক ক্ষতির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই কোরআন ও হাদিসে বারবার অহংকার থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
অহংকার সম্পর্কে কোরআনের সতর্কতা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী, আত্মগর্বীকে পছন্দ করেন না।” —সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬।
অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।” —সূরা আন-নাহল, ১৬:২৩।
অর্থাৎ একজন মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান যতই থাকুক, তা নিয়ে অন্যকে তুচ্ছ করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
অহংকারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইবলিস
কোরআনে ইবলিসের ঘটনা অহংকারের ভয়াবহ পরিণতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আল্লাহ আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দিলে ইবলিস তা প্রত্যাখ্যান করে। সে যুক্তি দেয়, “আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” —সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১২।
নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করাই তাকে আল্লাহর আদেশ অমান্য করার দিকে নিয়ে যায়। এ ঘটনা মানুষের জন্য অহংকারের বিপদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
অহংকার সম্পর্কে নবীজি (সা.) কী বলেছেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” সাহাবিদের একজন জানতে চাইলেন, মানুষ সুন্দর পোশাক ও সুন্দর জুতা পছন্দ করলে সেটিও কি অহংকার? নবীজি (সা.) ব্যাখ্যা করেন, “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।” —সহিহ মুসলিম।
এই হাদিসে অহংকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা পাওয়া যায়। সুন্দর পোশাক পরা বা নিজের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের যত্ন নেওয়া অহংকার নয়। বরং সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্য মানুষকে ছোট মনে করাই অহংকারের বড় প্রকাশ।
সম্পদ ও ক্ষমতা অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়
মানুষের কাছে অর্থ, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক মর্যাদা আসতে পারে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো—এসব আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। তাই এগুলো নিয়ে অন্যকে হেয় করার সুযোগ নেই।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” —সূরা লুকমান, ৩১:১৮।
অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে আচরণে বিনয় বজায় রাখার ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
অহংকার থেকে বাঁচবেন কীভাবে?
নিজের সীমাবদ্ধতা মনে রাখা: মানুষ যত জ্ঞানী বা সফলই হোক, তার জ্ঞান ও সামর্থ্য সীমিত। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের জ্ঞান খুবই সামান্য।” —সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৫।
আল্লাহর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা: নিজের অর্জনকে শুধু নিজের যোগ্যতার ফল মনে না করে আল্লাহর দেওয়া সুযোগ ও নিয়ামত হিসেবে দেখা উচিত।
অন্যকে ছোট না করা: কারও অর্থ, শিক্ষা, পেশা, চেহারা বা সামাজিক অবস্থান দেখে তাকে তুচ্ছ করা অহংকারের প্রকাশ হতে পারে।
ভুল স্বীকার করা: নিজের ভুল হলে তা মেনে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে অন্যের কাছে ক্ষমা চাওয়া বিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল বিনয়ের অন্যতম উদাহরণ। তিনি মানুষের সঙ্গে সদয় ও নম্র আচরণ করতেন।
বিনয় মানুষের মর্যাদা কমায় না
অনেকে মনে করেন, নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করা বা আত্মবিশ্বাসী হওয়া হয়তো অহংকার। আসলে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ভালো কাজের জন্য আত্মবিশ্বাসী হওয়া অহংকার নয়। সমস্যা তখনই, যখন মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে অন্যকে তুচ্ছ করতে শুরু করে কিংবা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।” —সহিহ মুসলিম।
অহংকারের বিপরীত হলো বিনয়
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মর্যাদা শুধু সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা বা সামাজিক পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না। কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” —সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।
তাই নিজের সাফল্যে কৃতজ্ঞ থাকা, অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো, সত্যকে গ্রহণ করা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
অহংকার মানুষকে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর বিনয় মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে। ইসলামের শিক্ষা হলো নিজেকে বড় প্রমাণ করার চেয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে বিনয়ী বানানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।









