গত ২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে আটটার ঘটনা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রসুয়া জেলার শান্ত পাহাড়ি জনপদ তখনো ঘুম থেকে পুরোপুরি জাগেনি। ঠিক তখনই তিব্বত অঞ্চলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ছোট একটি ভূমিকম্পের কম্পন গিয়ে লাগে হিমালয়ের এক অস্থির হিমবাহে।
মুহূর্তের মধ্যে বরফ-পাথরের ধস নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে তৈরি করে এক কৃত্রিম হ্রদ, আর তা ফেটে নেমে আসে প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস।
গ্রামের পর গ্রাম মুহূর্তেই তলিয়ে যায় জলের গ্রাসে। আজ যখন এই লেখা লিখছি, ততক্ষণে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ জন, নিখোঁজ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার জন, যাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা একে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলছেন। ঘরবাড়ি, সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু—সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি, তবে তা যে বিপুল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
এই দুর্যোগ নতুন কিছু নয় নেপালের জন্য। হিমালয়ের কোলে গড়ে ওঠা এই দেশ ভূমিকম্প, ভূমিধস আর হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ) জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিলের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় নয় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, আহত হয়েছিলেন প্রায় বাইশ হাজার।
এর আগে ২০১৪ সালে সিন্ধুপালচক জেলার জুরে গ্রামে ভয়াবহ ভূমিধসে শতাধিক প্রাণহানি ঘটে। উঁচু পাহাড়, খাড়া ঢাল, অস্থিতিশীল হিমবাহ আর তার নিচে ঘন বসতি—এই সমন্বয়ই নেপালকে পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
আকস্মিক জলবিপর্যয় অবশ্য শুধু হিমালয়ের সমস্যা নয়, এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে বারবার ফিরে আসা এক আতঙ্কের নাম। ১৯৭৫ সালে চীনের হেনান প্রদেশে বানকিয়াও বাঁধ ধসে যে বন্যা হয়, তাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে—ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বাঁধ-বিপর্যয় হিসেবে এটি চিহ্নিত।
আবার ২০০৬ সালের ১৭ জুলাই ইন্দোনেশিয়ার জাভা উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার সমুদ্রতলদেশীয় ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট সুনামি পাংগানদারান সৈকত এলাকায় আঘাত হানে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আসা সেই ঢেউয়ে অন্তত ৬৬৮ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন প্রায় নয় হাজার তিনশ মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, আর মোট আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার কোটি ডলার। এই দুটি ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সঙ্গে দুর্বল সতর্কতা ব্যবস্থা যুক্ত হলে বিপর্যয় কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশও এই তালিকা থেকে বাইরে নয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে যে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে, তাতে প্রায় এক লাখ আটত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। প্রায় ছয় মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।
এরপর ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলাও আমাদের স্মৃতিতে এখনো তাজা। সিডরে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, লক্ষাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। আইলা তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী হলেও উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার যে ক্ষত রেখে গেছে, তা আজও পুরোপুরি সারেনি।
পাহাড়ধসের ইতিহাসও কম মর্মান্তিক নয়। ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে শুধু শিমুলতলী এলাকাতেই মাটিচাপা পড়ে হারিয়ে যায় ২৫টি প্রাণ। এরপর ২০১৮ সালে নানিয়ারচরে ১১ জন এবং ২০১৯ সালে কাপ্তাইয়ে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি বর্ষায় এখনো হাজার হাজার মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন। এ বছরও জুলাইয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে প্রায় ৫৫ জনের মৃত্যু এবং প্রায় নয় লাখ মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দেয়, এই ঝুঁকি কমেনি বরং বেড়েছে।
এসব দুর্যোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটুকু—এই প্রশ্ন এখন অবধারিত। বিজ্ঞানীরা কোনো একক ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলতে সতর্ক থাকেন, কিন্তু প্রবণতা স্পষ্ট। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অস্থিতিশীল হিমবাহ-হ্রদ, যেকোনো মুহূর্তে যা বিস্ফোরিত হতে পারে।
একই সঙ্গে মৌসুমি বায়ুর আচরণ বদলে যাচ্ছে—স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে, যা বাংলাদেশ ও নেপাল উভয় অঞ্চলেই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন—পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহপথে স্থাপনা নির্মাণ। প্রকৃতি আর মানুষের ভুলের এই মিথস্ক্রিয়াই বিপর্যয়কে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দুর্যোগ কি আদৌ ঠেকানো যায়? ভূমিকম্প বা হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের মতো ঘটনা পুরোপুরি রোধ করা অসম্ভব। কিন্তু তার ফলে যে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব—যদি প্রস্তুতি ও পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাপান, চিলি কিংবা ফিলিপাইনের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আর সচেতন জনগোষ্ঠী থাকলে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব—ঠিক যেমন ইন্দোনেশিয়ায় সতর্কব্যবস্থার অভাবেই ২০০৬ সালে এত মানুষের প্রাণ গিয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে স্যাটেলাইট মনিটরিং। হিমালয় অঞ্চলের অস্থিতিশীল হিমবাহ-হ্রদগুলো নিয়মিত স্যাটেলাইট চিত্রে পর্যবেক্ষণ করে বিপজ্জনক হ্রদগুলো চিহ্নিত করা এবং সময়মতো সতর্কবার্তা দেওয়া এখন প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ সম্ভব।
নেপাল, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ—এই চার দেশের অভিন্ন নদী-অববাহিকা যেহেতু একে অপরের সঙ্গে জড়িত, তাই একটি যৌথ আঞ্চলিক ঝুঁকি প্রশমন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ইসিআইএমওডির মতো সংস্থা এ ধরনের সমন্বয়ের উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা প্রায়ই তথ্য বিনিময়ে বাধা তৈরি করে।
অথচ উজানে সামান্য একটি সতর্কবার্তা সময়মতো ভাটির দেশে পৌঁছালে বহু প্রাণ বাঁচানো যায়—যেমনটা এবারের ঘটনার পর ভারতের বিহার ও গণ্ডক নদী অববাহিকায় সতর্কতা জারি করে কিছুটা হলেও প্রস্তুতি নেওয়া গেছে।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন স্থানীয় সম্প্রদায়-ভিত্তিক প্রস্তুতি—ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দুর্যোগের আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মহড়া, দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা, আর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসতি নিরুৎসাহিত করে বিকল্প পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশের জন্য এই দুর্যোগ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানই আমাদের একাধারে নদীবিধৌত সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
উজানের দেশে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ বা অতিবৃষ্টি হলে তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা কিংবা মেঘনা অববাহিকায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, উপকূলে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, আর নিম্নাঞ্চলে নদীভাঙন-বন্যা—এই ত্রিমুখী ঝুঁকি একসঙ্গে মোকাবিলা করার মতো দেশ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি আর উজানের অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—এই তিনটি প্রবণতাই আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র এক মিটার বাড়লেই বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাই ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণে আমাদের এখনই যে বিষয়গুলোতে আরো মনোযোগী হতে হবে-
প্রথমত, প্রথমত, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং একই সঙ্গে বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচার পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নদী-তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে তুলে একটি কার্যকর দক্ষিণ এশীয় পূর্বাভাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
তৃতীয়ত, উপকূলীয় বাঁধ ও পার্বত্য ঢাল—উভয় ক্ষেত্রেই অবকাঠামো নির্মাণে জলবায়ু-সহনশীল প্রকৌশল নীতি অনুসরণ করা।
চতুর্থত, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে কাগজে-কলমে না রেখে প্রকৃত প্রশিক্ষণ ও সম্পদ দিয়ে সক্ষম করে তোলা।
নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, কিন্তু প্রস্তুতি আর দূরদর্শিতা থাকলে সেই অসহায়ত্বকেও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
প্রতিবেশী দেশের এই কষ্টের মুহূর্তে আমাদের সমবেদনা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে সৎ আত্মবিশ্লেষণ। দুর্যোগ আসবেই—প্রশ্ন হলো, আমরা তার জন্য কতটা প্রস্তুত থাকবো?
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









