এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ইউএস-বাংলা ঢাকাকে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক কানেকটিং হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, একজন বাংলাদেশী যাত্রী বর্তমানে ঢাকা থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা যেতে অনেক সময় দুবাই, দোহা, ইস্তানবুল, কুয়ালালামপুর বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক হাব ব্যবহার করেন। ভবিষ্যতে ইউএস-বাংলার লক্ষ্য যতটা সম্ভব কানেকটিং ট্রাফিক ঢাকার মধ্যেই রাখা। এটি সফল হলে ঢাকা শুধু বাংলাদেশের বিমানবন্দর থাকবে না, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কানেকটিং হাব হওয়ার দিকে এগোতে পারে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি একথা বলেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আকাশপথে দেশীয় উপস্থিতি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২০১৪ সালে অভ্যন্তরীণ রুট দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু একটি বেসরকারি এয়ারলাইন হিসেবে নয়, বরং ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক হাব তৈরি করার পথে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এ কৌশলকে আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে এবং ২০টি দেশে যাওয়ার লক্ষ্য এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সময়ে ফুল সার্ভিস ক্যারিয়ারের সঙ্গে দ্বিতীয় একটি লো-কস্ট ক্যারিয়ার চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইউএস-বাংলার চরিত্রই বদলে যাবে—একটি দেশীয় ক্যারিয়ার থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ক্যারিয়ারে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, চলতি বছরের ২৯ জুলাই ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১টি নতুন বোয়িং এয়ারক্রাফট যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ১৫টি বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এনজি, যার ডেলিভারি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। এ বহর সম্প্রসারণের তাৎপর্য শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়। একটি নতুন বিমান সাধারণত তিনটি কাজ করতে পারে—নতুন গন্তব্য চালু করা, বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো, পুরনো বিমানের জায়গায় আরো দক্ষ বিমান বসিয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো। ইউএস-বাংলার ক্ষেত্রেও ঘোষিত পরিকল্পনায় এ তিন উদ্দেশ্যই রয়েছে। তাই ২১টি বিমানকে ফ্লিট এক্সপানশন নয়, বরং নেটওয়ার্ক এক্সপানশন প্লাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক বাজার দক্ষিণ এশিয়া। এখানে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ—প্রতিটি বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে কলকাতা, চেন্নাই ও মালদ্বীপে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। ইউএস-বাংলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বেঙ্গালুরু, দিল্লি, কাঠমান্ডু ও কলম্বো বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে বেঙ্গালুরু একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। কারণ এটি ভারতের প্রযুক্তি ও ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। একইভাবে কলম্বো কেবল শ্রীলংকার বাজার নয়; পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ইউএস-বাংলার বর্তমান আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, দোহা, মাসকাট, রিয়াদ ও জেদ্দার মতো গন্তব্য রয়েছে। পরবর্তী ধাপে দাম্মাম, মদিনা, সালালা, কুয়েত, বাহরাইন ও ব্রুনাই যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নেটওয়ার্ক অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হবে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার, পর্যটন গন্তব্য এবং ব্যবসায়িক অংশীদার। বর্তমানে কুয়ালালামপুরের সঙ্গে ইউএস-বাংলার যোগাযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে পেনাং ও জহুরবাহরু যুক্ত হলে নেটওয়ার্কটি আরো কার্যকর হবে। এখানে বড় সুযোগ হলো পয়েন্ট টু পয়েন্ট যাত্রীর পাশাপাশি কুয়ালালামপুর ছাড়াও অন্যান্য শহরকে প্রাধান্য দিলে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা-কুয়ালালামপুর, ঢাকা-পেনাং এবং ঢাকা-জহুর বাহরু—এ তিন রুটকে একই বাজারের তিনটি আলাদা সেগমেন্ট হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশী, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য আরো বিকল্প তৈরি হবে।
তিনি বলেন, পূর্ব এশিয়া হবে পরবর্তী বড় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র। ইউএস-বাংলার ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হতে পারে পূর্ব এশিয়া। বেইজিং ও হংকংয়ের মতো গন্তব্যের সম্ভাবনা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া নিয়েও সম্প্রসারণের পরিকল্পনার রয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক শুধু পর্যটনের নয়—তৈরি পোশাক, শিল্প, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি, শিক্ষার্থী, ব্যবসা, সাপ্লাই চেইন—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউএস-বাংলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় লন্ডন ও রোম গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। কারণ ইউরোপীয় রুটে প্রবেশ মানে শুধু নতুন দুটি শহরে ফ্লাইট চালু করা নয়। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বাজারে সরাসরি প্রবেশ। বিশেষ করে লন্ডন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নিউইয়র্ক, টরন্টো ও সিডনি ২০৩০ সালের দিকে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ইউএস-বাংলা কাজ করছে।
ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের সবচেয়ে অব্যবহৃত সম্ভাবনার একটি হলো এয়ার কার্গো। ইউএস-বাংলা এরই মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে কার্গো, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, ক্যাটারিং ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে। ভবিষ্যতে প্যাসেঞ্জার নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্গো নেটওয়ার্ক আলাদা করে পরিকল্পনা করা উচিত। বিভিন্ন রুটে প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটে বেলি কার্গো একটি বড় আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আবদুল্লাহ আল মামুন বড় সম্প্রসারণের ঝুঁকির কথাও বলেছেন। জানান, ২১টি বিমান দ্রুত যুক্ত হলে পর্যাপ্ত যাত্রী ও লাভজনক রুট না থাকলে যাত্রী সংখ্যা কমতে পারে। বিমান, লিজ, মেইনটেন্যান্স, ইন্স্যুরেন্স, বেশির ভাগ ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর। জেট ফুযেল মূল্যের পরিবর্তন এয়ারলাইনের আয়-ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইনস, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, সাউদিয়া, মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস, ইন্ডিগো এবং অন্যান্য এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। ২১টি বিমান মানে শুধু ২১টি উড়োজাহাজ নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজন বিশাল দক্ষ মানবসম্পদ। ঢাকা বিমানবন্দরে ক্যাপাসিটির কারণে এয়ারলাইনসের বিস্তৃতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সামনে এখন যে সুযোগটি তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন শিল্পের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২১টি নতুন বোয়িং, ২০২৭ সালের মধ্যে ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্য ও ২০টি দেশের লক্ষ্য এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রবেশের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কৌশল এখন আর কেবল ‘আরো কিছু আন্তর্জাতিক রুট চালু করা’ নয়। বরং ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে ইউএস-বাংলা বাংলাদেশের আকাশে একটি বেসরকারি এয়ারলাইন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ঢাকাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি বাংলাদেশী সংযোগের সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, বৃহত্তর জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্য আরও বড়। বিদেশী এয়ারলাইনের মাধ্যমে দেশের যাত্রী ও বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে যাওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন যদি সেই যাত্রীর একটি বড় অংশ ধরে রাখতে পারে, তাহলে আকাশপথ নিজেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।









