ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রের ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানিকে ১০০ বছরের জন্য বিশেষ অধিকার দেওয়ার চুক্তি নিয়ে দেশটিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
বুধবার ২ সেপ্টেম্বর বিবিসি’র সূত্রে জানা যায়, কারাকাসে চুক্তিটি সই হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।
তবে চুক্তিটির কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্পের সাবেক ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস। তিনি বলেন, এটি একটি ভয়াবহ চুক্তি। রদ্রিগেজ কোনো বিনিময় ছাড়াই জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, ওয়াশিংটনের চাপের কারণেই রদ্রিগেজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (নবেপ) সঙ্গে কাজ করবে। কোম্পানিটি ভেনেজুয়েলায় শেভরনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল উৎপাদক।
চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নবেপ-এর পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ভেটো ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যের ‘চোক পয়েন্ট’ থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন বাড়ানো হলে বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার বিপর্যস্ত তেল খাত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। ট্রাম্প দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চুক্তি থেকে লাভ আসবে বলে দাবি করলেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এক দশক সময় লাগতে পারে।
হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকো বলেন, ৩০ বছর আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলার প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা আট বছরে করতে হবে।
চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ডেলসি রদ্রিগেজ সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারেরই অংশ ছিলেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র একসময় মাদুরোর সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত মাদক কার্টেল হিসেবে আখ্যা দিয়ে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক চাপ বাড়িয়েছিল।
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা না করলেও দেশটির অর্থনীতিবিদ রিকার্দো হাউসম্যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভেনেজুয়েলাবাসীকে মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করেননি, বরং আমাদের নিপীড়কদের সঙ্গে জোট বেছে নিয়েছেন।
শুধু বিরোধীরাই নয়, ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একটি অংশও চুক্তিটির বিরোধিতা করছে। ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসভি (পিএসইউভি) রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও অনেক সমাজতন্ত্রী মনে করছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণের শামিল।
সাবেক তেলমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর (পিডিভিএসএ) সাবেক প্রধান রাফায়েল রামিরেজ বলেন, এই চুক্তি তেল হস্তান্তর করে দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঔপনিবেশিকতার দরজা খুলে দিচ্ছে।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ভেনেজুয়েলায় সাবেক মাদুরো সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন নেতার হাতেই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হয়েছে। ফলে বিপুল তেলসম্পদের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।









