কৈশোরের সেই প্রিয় বন্ধুটিই যদি একদিন আপন বোন হিসেবে ধরা দেয়, তবে কেমন হবে? ঠিক এমনই এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন চল্লিশোর্ধ্ব দুই নারী।
শিশু বয়সে ভারতের এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়ে নেদারল্যান্ডসে আলাদাভাবে বড় করা হয়েছিল তাদের। এরপর বন্ধুত্ব, দীর্ঘ বিচ্ছেদ এবং সবশেষে একটি ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে তারা আবিষ্কার করেছেন নিজেদের আসল পরিচয়।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ভারতে জন্মগ্রহণকারী চল্লিশোর্ধ্ব দুই নারী, যাদের শিশু বয়সেই দত্তক নিয়েছিল নেদারল্যান্ডসের দুটি ভিন্ন পরিবার এবং তারা কাছাকাছিই বড় হয়েছিলেন।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে জন্মগ্রহণকারী মিনা গেলটিংক এবং মিনাল টিজসেনকে তাদের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুম্বাইয়ের দুটি ভিন্ন এতিমখানা থেকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল।
তাদের বয়স যখন তেরো বা চোদ্দ, তখন দত্তক প্রদানকারী সংস্থার আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা হয় এবং সে সময় তাদের চেহারা ও আচরণের অদ্ভুত মিল দেখে তারা অবাক হয়েছিলেন।
বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী মীনা জানান, সেই দিনের কথা এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বলেন, দত্তক নেওয়া সব শিশুদের একসঙ্গে সময় কাটানো, সম্পর্ক তৈরি এবং রাতের খাবারের জন্য একত্র করা হয়েছিল।
মিনা এবং মিনাল দুজনের সাথেই তখন তাদের বন্ধুরা ছিল, তাদের বন্ধুরাই প্রথম লক্ষ্য করেন যে তাদের দেখতে কতটা একই রকম লাগে।
মীনা বলেন তারা বলেছিল, আয়নায় নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখো, আর আমার মনে হচ্ছিল, ওহ ঈশ্বর, ওর নাক তো একদম আমার মতো! আমাদের হাসির ধরনও একই। রাতের খাবারের সময় আমি পুরোটা সময় শুধু ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।
পরদিন তারা দুজন নিজেদের টেলিফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন এবং যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক থাকার কোনো প্রমাণ না থাকলেও, তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক এক আত্মিক টান তৈরি হয়েছিল এবং বছরের পর বছর ধরে তারা একে অপরকে চিঠি লিখতেন, প্রায়শই একে অপরকে বোন বলে ডাকতেন। তারা স্কুল, বন্ধু, ছেলে, বাইরে ঘোরাঘুরি এবং নাচ নিয়ে লিখতেন। তারা কোন কোন খেলাধুলা করেন তা জানাতেন এবং গান নিয়ে আলোচনা করতেন, এভাবেই তারা আবিষ্কার করেন যে দুজনেই ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ ব্যান্ডের ভক্ত।
এরপর ১৫ বছর আগে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে পাড়ি জমান। আর মিনা তখন সবেমাত্র প্রথম সন্তানের মা হয়ে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
২০১৭ সালে মিনা ভারত থেকে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের আরেকটি সভায় অংশ নেন, যেখানে তিনি ডিএনএ পরীক্ষার কথা শোনেন এবং নিজেও পরীক্ষাটি করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি কারোর সাথেই মিল খুঁজে পাননি এবং ফোনের স্টোরেজ ভরে যাওয়ায় চলতি বছরের শুরুতে ডিএনএ টেস্টের অ্যাপটি অ্যাপটি ডিলিট করে দেন।
এরপর ২০ মে, মিনা ফেসবুকে মিনালের একটি বার্তা পান মিনাল জিজ্ঞাস করে আমাকে মনে আছে?
এর আগে এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়ে মিনাল একটি ডিএনএ টেস্ট করিয়েছিলেন এবং তার ফলাফলের একটি ছবি মীনাকে পাঠান। তার ধারণা ছিল, বাহ্যিক গঠনে মিল থাকায় এবং দুজনই দত্তক নেওয়া শিশু হওয়ায় তাদের পরিবার কোনোভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।
মিনা বলেন, আমি আবার অ্যাপটি ইনস্টল করি। আমি এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে লগ ইন করার আগে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম।
ফলাফল এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট হতে পারত না; এই দুই নারীর শতভাগ মিল পাওয়া যায়।
মিনা ব্যাখ্যা করে বলেন, আমার একজন আপন বোন রয়েছে, যার মানে হলো আমাদের জৈবিক বাবা-মা একই। এটি যেন আমার কাছে অ্যাড্রেনালিন শটের মতো ছিল। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার জীবনের সেই হারিয়ে যাওয়া অংশ, যার জন্য আমি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম।
এই ডিএনএ ফলাফলটি ছিল সেই প্রমাণ, যা বুঝিয়ে দেয় আমাদের সব ধারণাই সঠিক ছিল।
আগস্টের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে তারা বোন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর প্রথমবারের মতো মিলিত হন এই পুরোনো দুই বন্ধু।
বর্তমানে তিন সন্তানের জননী মিনা বলেন, এটি এক অদ্ভুত অনুভূতি ছিল। মনে হচ্ছিল যেন ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর ধরে আমি আর মিনাল আমাদের হৃদয়ে একটি বিশাল শূন্যতা অনুভব করছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা পূর্ণতা পেয়েছি। সবকিছুই এখন ঠিক যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, তেমনই মনে হচ্ছে।
তাদের এই আবেগঘন পুনর্মিলন নিয়ে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের সাক্ষাতে ছিল কান্না, আলিঙ্গন এবং হাসি এরপর তারা একসাথে তাদের প্রথম সেলফি তোলে।
৪৪ বছর বয়সী মিনাল, যিনি তার সঙ্গী এবং দুই ছেলেকে নিয়ে ফ্রান্সে থাকেন, সংস্থাটিকে জানিয়েছেন যে এপ্রিলে যখন তার ডিএনএ পরীক্ষার ফল আসে, তখন তিনি প্রথমে বুঝতেই পারেননি যে তার সাথে মিলে যাওয়া মেয়েটি সেই একই কিশোরী, যার সাথে ৩০ বছর আগে তার প্রথম দেখা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি দেখার পরই বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, মিনা: বোন। আমি এটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা বোন হওয়ার আগে থেকেই বন্ধু ছিলাম।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময়ই বোন ছিলাম, কিন্তু আমরা তা জানতাম না।’
নেদারল্যান্ডসের দুটি ভিন্ন দম্পতি মিনা এবং মিনালকে আলাদা এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়েছিলেন। মিনা জানান, নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে তিনি এমন বাবা-মায়ের কাছে বড় হয়েছেন, যারা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।
তিনি বলেন, তারাই ছিলেন আমার শিক্ষক। তারা খুব স্নেহশীল এবং ভীষণ বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন।
কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা যান, তবে তার মা এখনও একই গ্রামে থাকেন। তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের প্রতিদিন কথা হয়। তিনি এখনও আমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মিনা তার বাবা-মা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া ভাইয়ের সাথে মুম্বাইয়ের সেই এতিমখানায় গিয়েছিলেন।
মিনার জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে জানতে তারা দুই সপ্তাহ ধরে সেখানকার নথিপত্র ঘেঁটেছিলেন। মিনা বলেন, কারণ আমার জন্য এটি জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
মে মাস থেকে মিনা ও মিনাল প্রায় প্রতিদিনই কথা বলছেন। তারা একে অপরের স্বামী, সন্তান, ভাই এবং বাবা-মায়ের সাথেও দেখা করেছেন।
মিনা বলেন, সবাই খেয়াল করে কীভাবে আমরা একে অপরের অসম্পূর্ণ বাক্যগুলো সম্পূর্ণ করি, কীভাবে আমরা একইভাবে মাথা নাড়াই বা হাঁটি।
তারা যে আপন বোন, এই সত্যিটা এখনও তারা পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না বলে তিনি জানান।
মাঝে মাঝে আমরা দুই ঘণ্টা ধরে কথা বলি এবং সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলি, হঠাৎ মনে পড়ে যায় যে আমাদের বাজার করতে হবে বা বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে হবে।
মিনা বলেন, একটি কাজ তিনি এবং তার বোন খুব আনন্দের সাথে করতে চান, আর তা হলো ঠিক যেখান থেকে সবকিছুর শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে যাওয়া।
আমরা কোনো একসময় একসাথে ভারতে যেতে চাই, মুম্বাইয়ের রাস্তায় একসাথে হাঁটতে চাই।
তিনি বলেন, এমন অনেক সময় এসেছে যখন আমরা দুজনেই খুব একাকী বোধ করেছি, যেমন যখন আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি বা চরম হতাশার মধ্য দিয়ে গেছি।
আমার আক্ষেপ হয় যে আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি, আমরা হয়তো একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারতাম।









