নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর শীর্ষনেতা ইমতিয়াজ সেলিম বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের তালিকাভুক্ত প্রশিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রেফারি। ব্ল্যাকবেল্টধারী সেলিম জাপান কারাতে অ্যাসোসিয়েশনের লাইসেন্সধারী প্রশিক্ষকও। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব বিজনেস হিসেবে কর্মরত।
ইমতিয়াজ সেলিম ছদ্মনাম ব্যবহার করে নানা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠায় নানা কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
প্রথমবারের মতো হিজবুত তাহরীরের শীর্ষ নেতা তৌহিদুর রহমান ওরফে তৌহিদ ওরফে সিফাতকে (২৯) গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে আরেক শীর্ষ নেতা এই সেলিমের সন্ধান পায় ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।
মঙ্গলবার ১২ ডিসেম্বর ভাটারা এলাকা থেকে ইমতিয়াজ সেলিম ওরফে ইমাদুল আমিনকে (৪১) গ্রেপ্তার করা হয়। এরফলে গত ৩০ সেপ্টেম্বর হিজবুত তাহরীরের অনলাইন সম্মেলনের দুই বক্তাকেই গ্রেপ্তার করলো সিটিটিসি।
বুধবার ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, গত ৬ ডিসেম্বর হিজবুত তাহরীরের অনলাইন সম্মেলনের প্রথম বক্তা তৌহিদকে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে রিমান্ডে এনে অন্যদের বিষয়ে আমরা তথ্য জানার চেষ্টা করি। সম্মেলনে আরো যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ছিলো আমাদের প্রথম কাজ।
সাধারণত প্রত্যেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমে ছদ্মনাম ব্যবহার করে, তারা আসল নাম কোন সদস্যের কাছে প্রকাশ করেনা। সে হিসেবে সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া আরেক ব্যক্তির নাম জানা যায় তিনি ইমাদুল আমিন। জানা যায়, তার বাড়ি চট্টগ্রামে আর থাকেন ভাটারা এলাকায়। আমাদের কর্মকর্তারা ৭ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তৌহিদকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করে ম্যানুয়ালি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেই ইমাদুল আমিনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। যার আসল নাম ইমতিয়াজ সেলিম।
তিনি বলেন, সেলিম বাংলাদেশে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব বিজনেস। যে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার একটির বনানীর অফিসে চাকরি করতেন তিনি। এর আড়ালে সেলিম তার জঘন্যতম কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। রাষ্ট্রবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল।
তিনি সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বিভিন্নজনকে তাদের খেলাফতে শরিক হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। এর আগেও তিনি এমন কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন।
এছাড়া, সেলিম একজন মার্শাল আর্টে ব্ল্যাকবেল্টধারী। বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের রেগুলার ট্রেইনার। কারাতে ফেডারেশনের ওয়েবসাইটে তার ছবি রয়েছে। কারাতের একজন আন্তর্জাতিক রেফারি সেলিম।
সিটিটিসি প্রধান বলেন, হিজবুত তাহরিরের সদস্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের নির্দেশনা থাকে শারিরীকভাবে ফিট থাকতে হবে। যুদ্ধ বা আত্মরক্ষার কৌশল শেখার অংশ হিসেবে অধিকাংশ সদস্যদেরই কারাতে শেখার নির্দেশনা থাকে। নির্দেশনার অংশ হিসেবে বিশ্বিদ্যালয় শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় সেলিম প্রথমে কারাতে শেখে ও পরে ব্ল্যাকবেল্টধারী হয়।
ইমতিয়াজ সেলিম নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সেলিম হিজবুতত তাহরীরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০১০ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হয়। তার এক বন্ধুর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনে যোগদান করে।
গ্রেপ্তারের পর জেলখানায় গিয়ে হিজবুত তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম মাওলার সান্নিধ্যে আসেন সেলিম। এরফলে তিনি অতিমাত্রায় সংগঠনের প্রতি অনুগত হন এবং বের হয়ে ফুলটাইম সংগঠনের জন্য কাজ করতে থাকেন। এভাবে একপর্যায়ে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন।
শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হিজবুত তাহরীরের দাওয়াতী কার্যক্রম চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে নতুনদের প্রথম টার্গেট করে। কারণ নতুন ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের যেভাবে গ্রুমআপ করা হবে সেভাবেই তৈরি হবে। তাই নতুন মেধাবী তরুণদের টার্গেট করে তারা সংগঠনের রিক্রুটমেন্ট শুরু করে।
হিজবুত তাহরীরের দুই শীর্ষ ব্যক্তি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, কাল সেলিমকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে কিছু ডিভাইস পেয়েছি। সেখানে তৈহিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবাদলিপি ড্রাফট রয়েছে। প্রতিবাদলিপি প্রেসে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিলো, হয়তো সে সুযোগ পায়নি। সেখানেও সরকার পতন ও খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নানা ধরনের উসকানিমূলক কথাবার্তা রয়েছে।
সেলিমকে রমনা থানায় মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে। তার আরও যারা সহকর্মী যারা আছে, এটা নিয়ে আমরা কাজ করবো। সংগঠনের আরো যারা যারা আছে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। সংগঠনের সদস্যরা দৃশ্যমান ইনএকটিভ দেখালেও আড়ালে নানা কাজ করে যাচ্ছে। সেলিমও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করেও সংগঠনে কাজ করছে। মেধাবী হওয়ার কারণে সে সংগঠনের নেতৃত্বপর্যায়ে চলে আসে। সংগঠনের ইন্টারন্যাশনাল যে বিষয়গুলো আছে তার মাধ্যমে সম্পাদিত হতো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ, সর্বোচ্চ দিতে প্রস্তুতের পর্যায়ে গেলেই তাকে শীর্ষ পর্যায়ে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া কষ্টকর। আমাদের কর্মকর্তারা তৌহিদকে সাতদিন জিজ্ঞাসাবাদে ছোট্ট একটি তথ্য পেয়েছে। সেলিমের নাম-ঠিকানা সবই জানে, কিন্তু সে সাংগঠনিক নামের মধ্যেই ছিলো। সর্বশেষ ছোট্ট একটা তথ্য দিয়েছে, মনে হয় সে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ছেট পদে চাকরি করে। কোম্পানির নামটাও বলেনি। কিন্তু অফিসাররা সুকৌশলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট ঘেটে ঘেটে সেলিমকে শনাক্ত করেছে।
‘শীর্ষ নেতৃত্ব যারা দেয়, এদের মধ্যে ২ জন আছে বাকি যারা আছে তাদের নাম বলবোনা। গ্রেপ্তার হলে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাবো’ যোগ করেন তিনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সবসময়ই তৎপর রয়েছি। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নানান ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ সুযোগে জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের রিক্রুটমেন্ট, তৎপরতা বৃদ্ধি করতে চায়। কিন্তু আমরা তাদের সে সুযোগটা দিচ্ছিনা।









