চাকরিটা ছিল ভালো। বেতনও ছিল আকর্ষণীয়। সামনে ছিল নিরাপদ ক্যারিয়ার, প্রতিষ্ঠিত একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিবারেরও চাওয়া ছিল ভালো চাকরি করবেন, স্থির জীবন বেছে নেবেন। কিন্তু ৩০ বছর বয়সে হঠাৎ সেই নিরাপদ জীবন ছেড়ে দিলেন তিনি।
কেন?
কারণ তার মাথায় তখন অন্য এক স্বপ্ন। চাকরি নয়, নিজের হাতে কিছু তৈরি করবেন। ট্রেডিং নয়, গড়ে তুলবেন উৎপাদনমুখী শিল্প। এমন কিছু, যার পণ্য শুধু দেশের বাজারে নয়, একদিন পৌঁছাবে বিশ্বের বাজারেও।
সেই সিদ্ধান্তের পর পথটা সহজ ছিল না। শূন্য থেকে শুরু, চামড়ার ব্যবসা, ট্যানারি, তারপর জুতা কারখানা। প্রথমদিকে ছিল উৎপাদনের সমস্যা, মান ধরে রাখার চাপ, সময়মতো পণ্য সরবরাহের চ্যালেঞ্জ। একের পর এক বাধা পেরিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
আজ যে এপেক্স ফুটওয়্যারের জুতা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়, তার পেছনে রয়েছে সেই এক সিদ্ধান্ত; নিরাপদ চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটা।
এই মানুষটির নাম সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।
বাংলাদেশের চামড়া ও জুতা শিল্পের সঙ্গে যার নাম কয়েক দশক ধরে জড়িয়ে আছে। একটি ছোট পরিসরের চামড়া ব্যবসা থেকে শুরু করে এপেক্সের মতো শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলার পথটি ছিল দীর্ঘ, নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। সেই পথের শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন থেকে বাংলাদেশে উৎপাদন হবে, আর সেই পণ্য পৌঁছাবে আন্তর্জাতিক বাজারে।
১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর। তার বাবা স্যার সৈয়দ নাসিম আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর বড় ভাইদের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। পরিবারের শিক্ষা ও শৃঙ্খলার পরিবেশ তার জীবনভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল।
কলকাতায় শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৪ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতেন এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সেই সময়ের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তার কাজে লাগে।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানিতে যোগ দিয়ে করপোরেট কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো নামে পরিচিত। করাচিতে প্রশিক্ষণ শেষে ফাইন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়।

কিন্তু চাকরি তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল না। স্বাধীনতার পর নিজের কিছু করার ইচ্ছা আরও প্রবল হয়। ১৯৭২ সালে ফরাসি ব্যবসায়ী রেমন্ড ক্লেয়ারের সঙ্গে পরিচয় তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। চামড়া বিক্রির কমিশন ব্যবসায় অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব পান তিনি। স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের আপত্তি থাকলেও শ্বশুরের সমর্থন পেয়েছিলেন।
১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, নিজের ৩০তম জন্মদিনে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামেন মঞ্জুর এলাহী। হাজারীবাগ থেকে চামড়া সংগ্রহ করে বিদেশি ক্রেতার কাছে বিক্রি দিয়ে শুরু হয় তার নতুন জীবন। কয়েক বছরের মধ্যে সেই ব্যবসার পরিধি বাড়ে। ১৯৭৬ সালে ওরিয়েন্ট ট্যানারি কিনে প্রতিষ্ঠা করেন এপেক্স ট্যানারি।
চামড়া রফতানির ব্যবসায় প্রায় ১৪ বছর কাজ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, চামড়ার বড় একটি চূড়ান্ত ব্যবহার জুতা শিল্পে। সেখান থেকেই আসে নতুন ভাবনা কাঁচামাল রফতানি না করে দেশে জুতা তৈরি করা যায় না কেন?

ভাবনা থেকে বাস্তবায়ন। গাজীপুরের সফিপুরে ৫০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠে জুতার কারখানা। রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এপেক্স ফুটওয়্যারের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হতো। কিন্তু উৎপাদনের মান ও সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে প্রথম দিকে সমস্যায় পড়তে হয়। ধৈর্য, অভিজ্ঞ পরামর্শ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় সেই বাধা কাটিয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯১ সালে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায় এপেক্স ফুটওয়্যার।
এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের তৈরি জুতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে জায়গা করে নিতে শুরু করে। চামড়া থেকে জুতা উৎপাদনের পরিধি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত এপেক্সের ব্যবসাকে যেমন বদলে দেয়, তেমনি দেশের জুতা শিল্পের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী আজ এপেক্স গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন। এপেক্স ট্যানারি ও এপেক্স ফুটওয়্যারের পাশাপাশি গ্রুপটির ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন খাতে। উদ্যোক্তা হিসেবে মঞ্জুর এলাহীর ভূমিকা ব্যবসার বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে।

১৯৯৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগাযোগ, নৌপরিবহন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকার সভাপতি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।
তবে এত কিছুর পরও তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা ফিরে যায় সেই পুরোনো স্বপ্নে নিজের হাতে কিছু তৈরি করার স্বপ্নে।
মঞ্জুর এলাহীর পথচলা তাই শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিস্তারের গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিরাপদ চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত পথে পা রেখেছিলেন। চামড়ার ব্যবসা থেকে ট্যানারি, সেখান থেকে জুতা উৎপাদন প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন কিছু করার চেষ্টা।
২০২৫ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টায় সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর তার জন্মদিন। সময়ের সঙ্গে বাজার বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, ব্যবসার ধরনও বদলেছে। কিন্তু কয়েক দশক আগে দেখা সেই স্বপ্ন বাংলাদেশে তৈরি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাবে এখনও এপেক্সের পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সবসময়ই নিজের অর্জনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। বিশ্বের বিশাল প্রতিযোগিতার মাঠে বাংলাদেশের জুতা কীভাবে আরও দূর এগিয়ে যাবে, কীভাবে দেশের তৈরি পণ্য বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে এই ভাবনাই ছিল তার পথচলার সঙ্গী। তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অর্জনই আজকের এই পথের ভিত্তি তৈরি করেছে। আর সেই পথ ধরেই এপেক্স এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের তৈরি জুতাকে আরও দূরে পৌঁছে দিতে, আরও বিস্তৃত করতে বিশ্ব মানচিত্র।









