এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ভুয়া অন্তরঙ্গ ছবি, হুমকি ও নজরদারির শিকার নারীদেরই অনেক সময় অনলাইন থেকে সরে যেতে বলা হয়। জাতিসংঘের নতুন গবেষণা বলছে, সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সমাজকেও নিতে হবে। এই কথা জানান দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর এ এইচ এম বজলুর রহমান।
একজন নারী সাংবাদিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। এরপর তার কাছে আসতে থাকল হুমকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি বিকৃত করে ছড়ানো হলো। ব্যক্তিগত ঠিকানা প্রকাশের ভয় দেখানো হলো। সহকর্মীরা হয়তো বলবেন, কিছুদিন অনলাইনে কম থাকুন। কিন্তু প্রতিবেদনটি লেখার জন্য তাঁকেই কেন জনপরিসর ছাড়তে হবে?

প্রশ্নটি সাংবাদিকদের মধ্যে সীমিত নয়। একজন শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা বা অধিকারকর্মীও একই পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। আক্রমণটি মুঠোফোনের পর্দায় শুরু হয়, কিন্তু তার প্রভাব পড়ে পড়াশোনা, কাজ, আয়, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের ওপর।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের উপদেষ্টা কমিটির ২০২৬ সালের গবেষণা, টেকনলজি ফ্যাসিলিটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স এন্ড ইটস ইম্প্যাক্ট অন ওমেন এন্ড গার্লস, এই সহিংসতাকে মানবাধিকারের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে সংঘটিত, সহায়তাপ্রাপ্ত বা আরও ছড়িয়ে পড়া লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে প্রতিবেদনে একসঙ্গে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে আছে অনুমতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ, এআই দিয়ে যৌন প্রকৃতির ভুয়া ছবি তৈরি, অনলাইন অনুসরণ, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং ফোন বা অন্য যন্ত্র দিয়ে সঙ্গীর ওপর নজরদারি।
এআই দিয়ে বানানো একটি ছবি ‘আসল নয়’ বলে তার ক্ষতিও অবাস্তব নয়। সেটি দেখিয়ে কাউকে ভয় দেখানো, অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা বা সামাজিকভাবে হেয় করা সম্ভব। ছবিটি ভুয়া, তা প্রমাণের ভারও প্রায়ই আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর পড়ে। ততক্ষণে ছবিটি কোথায় কোথায় ছড়িয়ে গেছে, তিনি হয়তো জানতেও পারেন না।

সংখ্যার পেছনে যে বাস্তবতা
গবেষণায় উদ্ধৃত একটি বৈশ্বিক হিসাবে, প্রায় প্রতি তিনজন নারীর দুজন জীবনের কোনো পর্যায়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সংখ্যাটি সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝায়। তবে এটি বাংলাদেশের হার নয়। বিভিন্ন গবেষণায় সহিংসতার সংজ্ঞা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। উপদেষ্টা কমিটিও কিছু অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর তথ্যের ঘাটতি চিহ্নিত করেছে।
দেশের নীতি তৈরিতে তাই শুধু বৈশ্বিক হার উদ্ধৃত করলে চলবে না। জানতে হবে, বাংলাদেশে কতজন অভিযোগই করতে পারেন না; অভিযোগ করলে কত দ্রুত সাড়া পান; এবং বয়স, পেশা, আয় বা বাসস্থানের কারণে কারা সহায়তা থেকে বাদ পড়েন।
এই সহিংসতার প্রভাব ব্যক্তিগত পরিসরের বাইরেও যায়। গবেষণায় উদ্ধৃত একটি জরিপে প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ নারী সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাঁরা কাজের সূত্রে অনলাইন সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। একই জরিপে অনেকে বলেছেন, অনলাইন হুমকি ও হয়রানির পরিণতিতে তাঁরা অফলাইনেও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। একটি জরিপের ফল সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। তবে এটি অনলাইন হুমকিকে তুচ্ছ না করার যথেষ্ট কারণ।
নারী সাংবাদিক যদি হামলার ভয়ে একটি বিষয় নিয়ে লেখা বন্ধ করেন, পাঠকও তথ্য হারান। নারী রাজনীতিক বা অধিকারকর্মী যদি প্রকাশ্যে কথা বলা কমিয়ে দেন, জনবিতর্কে তাদের অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত থাকে। একজন মানুষকে চুপ করানোর এই প্রভাব শেষ পর্যন্ত সবার মতপ্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করে।
সরে যাওয়ার পরামর্শ কেন যথেষ্ট নয়
অনলাইনে হয়রানির শিকার নারীকে প্রায়ই পরামর্শ দেওয়া হয়, ছবি কম প্রকাশ করুন, অ্যাকাউন্ট গোপন রাখুন, মন্তব্য পড়বেন না। ব্যক্তিগত সতর্কতা কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক। কিন্তু নিরাপদ থাকার শর্ত যদি হয় নিজের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়া, তবে সহিংসতাকারীর উদ্দেশ্যই পূরণ হয়।
উপদেষ্টা কমিটি এ কারণে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবার ওপর জোর দিয়েছে। একজন মানুষের প্রথম প্রয়োজন কী, তা বুঝে সহায়তা দিতে হবে। কারও ক্ষতিকর ছবি দ্রুত সরানো দরকার। কারও অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। অন্য কারও প্রয়োজন আইনি পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপদে অভিযোগ করার জায়গা।
বর্তমান ব্যবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রায়ই একই ঘটনার বিবরণ বারবার দিতে হয়। প্ল্যাটফর্মে একবার, পুলিশের কাছে আরেকবার, পরে আইনি সহায়তার জন্য আবার। প্রতিবার ব্যক্তিগত ছবি বা বার্তা দেখানোর প্রয়োজন হলে তার ওপর নতুন চাপ পড়ে। অভিযোগ গ্রহণের সময় তাকে দোষারোপ করা কিংবা ক্ষতিটিকে ‘অনলাইনের ব্যাপার’ বলে ছোট করাও এক ধরনের দ্বিতীয় আঘাত।
গবেষণাটি তাই পুলিশ, বিচার বিভাগের সদস্য, স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছে। প্রশিক্ষণে ডিজিটাল প্রমাণ বোঝার পাশাপাশি অভিযোগকারীর মর্যাদা ও ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার বিষয়ও থাকতে হবে। একটি অভিযোগব্যবস্থা কত সহজে ব্যবহার করা যায়, তা যেমন জরুরি, অভিযোগ করার পর তথ্য কত নিরাপদ থাকে, সেটিও তেমন জরুরি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায়
কোনো ক্ষতিকর ছবি হাজারবার ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিটি পোস্ট আলাদা করে সরাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকেই আবেদন করতে হলে সুরক্ষার ব্যবস্থাটি কার্যকর বলা যায় না। কেন একই ছবি বারবার প্রকাশ করা যাচ্ছে? হয়রানিমূলক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার পর আবার ফিরছে কেন? অভিযোগের সিদ্ধান্ত জানতে এত দেরি হয় কেন? এসব প্রশ্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য।
উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশ, পণ্য ও অ্যালগরিদম তৈরির শুরু থেকেই নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও অধিকার বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো ব্যবস্থা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে কি না, কোম্পানিকে তা পরীক্ষা করতে হবে এবং পাওয়া ঝুঁকি কমাতে হবে। বিশেষ করে গোপনে নজরদারির সরঞ্জাম ও সম্মতি ছাড়া যৌন প্রকৃতির ছবি তৈরির প্রযুক্তির ঝুঁকি কঠোরভাবে যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
ভাষার প্রশ্নও আছে। একটি প্ল্যাটফর্ম ইংরেজিতে লেখা হুমকি দ্রুত শনাক্ত করলেও বাংলায় লেখা অভিযোগ বুঝতে দেরি করতে পারে। বৈশ্বিক সেবা ব্যবহারকারী দুই নারীর নিরাপত্তা তাদের ভাষা বা দেশের বাজারমূল্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বাংলাসহ স্থানীয় ভাষায় অভিযোগ গ্রহণ, দক্ষ পর্যালোচনা এবং কনটেন্ট সরানো বা না সরানোর কারণ জানানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারে। তারা অনেক সময় আক্রান্ত মানুষের প্রথম যোগাযোগস্থল। কীভাবে প্রমাণ রাখতে হবে, কোথায় অভিযোগ করতে হবে কিংবা কোন তথ্য আর প্রকাশ করা নিরাপদ নয়, সে বিষয়ে সহায়তা দেয়। গবেষণাটি এসব সংগঠনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং স্বাধীনতার সুপারিশ করেছে। প্ল্যাটফর্মগুলোকেও তাদের বিশেষজ্ঞ অভিযোগ দ্রুত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে বলেছে।
আইন দরকার, প্রয়োগেও সতর্কতা দরকার
গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচার অপরিহার্য। কিন্তু আইন থাকলেই প্রতিকার নিশ্চিত হয় না। অভিযোগ কোথায় করা যাবে, কোন প্রমাণ প্রয়োজন, কত সময়ে সাড়া মিলবে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে কী করা যাবে, এসব বিষয় সহজ ও স্পষ্ট হতে হবে। একই সঙ্গে আইনি সহায়তা পাওয়ার খরচ এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ও কমাতে হবে।
এখানে আরেকটি সতর্কতা জরুরি। অনলাইন সহিংসতা রোধের নামে অস্পষ্ট ও অতিবিস্তৃত ক্ষমতা তৈরি হলে সেটি নারী সাংবাদিক বা অধিকারকর্মীদের মতপ্রকাশের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে পারে। উপদেষ্টা কমিটি সতর্ক করেছে, নারীদের রক্ষার জন্য করা আইন যেন তাদের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা না হয়। সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে একই নীতির মধ্যে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে কার্যকর ব্যবস্থা কেমন হতে পারে, তা কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে বিচার করা যায়। অভিযোগ করার পর আক্রান্ত ব্যক্তি কি নিরাপদে কথা বলতে পারেন? ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়? অ্যাকাউন্ট সুরক্ষা, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তার মধ্যে যোগাযোগ আছে? তার পরিচয় ও প্রমাণ কারা দেখতে পাচ্ছেন? অভিযোগের অগ্রগতি তিনি জানতে পারছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কেবল অভিযোগের সংখ্যা প্রকাশ করে সাফল্য দাবি করা কঠিন। অনেক সময় অভিযোগ কম হওয়ার অর্থ সহিংসতা কম হওয়া নয়; মানুষ ব্যবস্থাটিকে নিরাপদ বা কার্যকর মনে করছেন না, এমনও হতে পারে।
প্রতিরোধের কাজ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখানো মানে শুধু পাসওয়ার্ড বদলানো শেখানো নয়। সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমা, হয়রানির শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নারীকে দোষারোপ করার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। ছেলে ও পুরুষদের এই শিক্ষা থেকে বাদ দিলে সহিংসতার সামাজিক কারণ অক্ষত থেকে যাবে।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার প্রমাণ ডিজিটাল হতে পারে। ক্ষতিটি বাস্তব। তাই নীতির আসল পরীক্ষা হলো, আক্রান্ত নারী কত দ্রুত নিরাপদ সহায়তা পান এবং সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও নিজের কাজ, চলাফেরা ও কথা বলার স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেন কি না।









