এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
‘আমি সেনাবাহিনীর অমুক বলছি।’
অপর প্রান্ত থেকে এমন একটি ফোনকল। কথার ধরন দৃঢ়, পরিচয়: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিংবা অন্য কোনো পদবীর সামরিক কর্মকর্তা। কখনো আবার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তা হিসেবে। হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইলে সামরিক পোশাক পরা কোনো কর্মকর্তার ছবি।
এরপর ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে জানানো হয়, তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা করছেন, যা নিয়ে ‘উচ্চপর্যায়ে’ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফোনদাতা আরও বলেন, “আপনি যে গ্রুপে আছেন, সেখানে এমন কিছু তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি এখনই পরিষ্কার করতে হবে। আপনার কার্যক্রম নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুতর, দ্রুত আমাদের সঙ্গে দেখা করুন।”
ভুক্তভোগী বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে অপর প্রান্ত থেকে তাকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়, “এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই আপনি দেখা করুন।” কখনো নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার নাম, পদবি ও সেনা সদরের ঠিকানা ব্যবহার করে ফোনটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
এরপর কথিত কর্মকর্তা ভুক্তভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা ও পেশাগত পরিচয় জানতে চান। কখনো আবার তাকে নির্দিষ্ট একটি নম্বরে যোগাযোগ করতে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয়পত্রের ছবি পাঠাতে বলা হয়।
এমন প্রতারণার ব্যাপারে সরাসরি সতর্ক করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। সতর্কবার্তায় আইএসপিআর জানায়, একটি চক্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। প্রতারকরা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ইউনিফর্ম পরা কর্মকর্তাদের ছবি সংগ্রহ করে হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে ব্যবহার করছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে এক তরুণীর পরিবার অভিযোগ করেন, সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন মোশাররফ। রাঙামাটির আরেক তরুণীর কাছ থেকে বিসিএস কর্মকর্তা পরিচয়ে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। দিনাজপুর থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের পর জানিয়েছে, একাধিক নারীর সঙ্গে মিথ্যা পরিচয়ে সম্পর্ক তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে।
অন্যদিকে চাকরি পাওয়ার আশায় যারা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পরিচয়কে বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের জন্য তৈরি হয়েছিল আরও বড় একটি ফাঁদ। চলতি বছরের মে মাসে র্যাব-১০-এর হাতে গ্রেপ্তার মো. তারেক সরকার ও তার সহযোগী মো. পলাশ কবিরের বিরুদ্ধে সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে।
তারেক নিজেও একসময় সেনাসদস্য ছিলেন। পরে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম, ছবি ও পদবি ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। চাকরিপ্রার্থীদের বলা হতো, ‘উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ আছে’, সুপারিশ করে চাকরি নিশ্চিত করা যাবে।
র্যাবের ভাষ্য, এভাবে দীর্ঘদিনে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তারেক। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের ছবি ফটোশপ করে বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণও তৈরি করেছিলেন তিনি।
চাকরিপ্রার্থীদের বিশ্বাস করানোর জন্য শুধু পরিচয়পত্রই যথেষ্ট ছিল না। ২০২৩ সালের এক মামলায় পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে আরও অভিনব কৌশল। হাবিবুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ও বিমানবাহিনীর সার্জেন্টের ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন।
বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়ে নৌবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে নেত্রকোণার আটপাড়ার পাঁচজনের কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। চাকরির স্বপ্নকে আরও বাস্তব মনে করাতে খুলনার একটি আবাসিক হোটেলে নেওয়া হয় কথিত লিখিত পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে সেখানেই দেওয়া হয় নিয়োগপত্র।
কিন্তু চাকরির সেই কাগজই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে প্রতারণার প্রমাণ। ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন: পরীক্ষা, নিয়োগপত্র, কর্মকর্তা পরিচয়; সবই ছিল সাজানো একটি ফাঁদ।
আইএসপিআর স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের যোগাযোগ করা হয় না। কেউ সামরিক কর্মকর্তার পরিচয়ে ফোন বা বার্তায় ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো সুবিধা চাইলে সংশ্লিষ্ট নম্বরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএসপিআর।
পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম-পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা করছে একটি চক্র। ভুয়া পরিচয়ে বার্তা পাঠিয়ে অর্থ দাবি ও বিভিন্ন তদবিরের চেষ্টা করছে তারা।
পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, এ ধরনের প্রতারণায় শুধু মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পুলিশ সতর্ক করে বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো আইডিতে সরকারি কর্মকর্তার নাম বা ছবি থাকলেই সেটি তার প্রকৃত আইডি বা ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর; এমনটি নিশ্চিত নয়। তাই এ ধরনের বার্তা বা অর্থের অনুরোধে সাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতারণামূলক বার্তা পেলে ৯৯৯, সাইবার পুলিশ সেন্টার, সিআইডি অথবা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ রাজ্জাক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘গত কয়েক মাস ধরে এ ধরনের প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ফোন করে হয়রানি করার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অসাধু চক্রগুলো কখনো চাকরির প্রলোভন, কখনো নারীঘটিত বিষয়, আবার কখনো বিভিন্ন ধরনের স্ক্যাম ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এমনভাবে কথাবার্তা বলে বা হুমকি দেয় যে ভুক্তভোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মানসিকভাবে ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ছেন, আবার অনেকে সরাসরি প্রতারণার শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়ছেন।”
উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে তারা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে, সেই তথ্য ব্যবহার করে ভয় দেখাচ্ছে এবং নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অনেকেই সামাজিক সম্মান, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আশঙ্কায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতেও ভয় পান। ফলে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে না এবং প্রকৃত চিত্রের চেয়ে অপরাধের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।’’
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যেতে আগ্রহী হন না। কারণ তারা মনে করেন, অভিযোগ করেও হয়তো দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যাবে না। এই অনীহা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। ফলে একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু মামলা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; ভুক্তভোগীকে দ্রুত সহায়তা, প্রযুক্তিগত তদন্ত এবং অর্থ বা তথ্য উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’’
ভুয়া পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে প্রতারণার এ প্রবণতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় হুমকি। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রতারকদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এমন ফোন বা বার্তায় আতঙ্কিত না হয়ে সত্যতা যাচাই ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।









