ইফতেখারুল ইসলাম
এক
দিন পনেরো আগে কয়েকজন তরুণ লেখক ও ভ্রামণিকের সঙ্গে বই-পড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বললাম, আমাদের সময়ের একজন লেখকের বই পড়ার গভীরতা ও পরিধি আমার কাছে ঈর্ষণীয়। লেখকের নাম না শুনে, শুধু অনুমান করেই অনু তারেক আমার সঙ্গে একমত হয়। বলে, উনি সম্পাদনা করেছেন অথবা লেখা নির্বাচন করেছেন এরকম কোনো সংকলন পেলেই আমি তা বিনা দ্বিধায় কিনতে ও পড়তে চেষ্টা করি। কারণ, তার পড়ার ব্যাপ্তি ও উৎকৃষ্ট লেখা নির্বাচনের ক্ষমতা অসাধারণ। এই লেখকের নাম ইমদাদুল হক মিলন।
মিলন আমার বন্ধু। তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ও তারপরের উম্মাতাল দিনগুলো খুবই আনন্দের। আমাদের দুজনের জন্মদিন যে একই তারিখে সেটা তখন জানা ছিল না। কিছুদিন পর নিয়মিত হয় আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ। আরো কজন বন্ধুর সঙ্গে একসাথে আড্ডা, লেখালেখি ও নানারকম পরিকল্পনা। এইভাবে দিন কাটে। আনন্দ, হইচই আর হতাশার দিন। বন্ধুত্ব গভীরতর ও স্থায়ী হতে থাকে। সে সময় দেখেছি মিলন বই পড়ে প্রচুর আর লেখালেখিতে অসম্ভব সিরিয়াস। অথচ উপার্জনের জন্য ও অন্য কিছু করতে চায়। এটা কীভাবে সম্ভব?
জীবিকার প্রয়োজনে অল্প কিছুদিন নানারকম কাজ করলেও আসলে মিলন শুরু থেকে মনে-প্রাণে শুধু লেখক হতে চেয়েছে। সেটুকুই তার একমাত্র উচ্চাকাক্সক্ষা। তাই মিলনকে নিজের লেখালেখির জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়। কৈশোর থেকেই মিলন বিশ্বাস করে, ভালো বই পড়লে ভালো লেখক হওয়ার মন্ত্রটা জানা যাবে। তাই অনেকটা সময় সে ব্যয় করে পড়ার জন্য। এরপর আর সময় কোথায়? কাজেই এক সময় তুচ্ছ হয়ে যায় ওর অন্যান্য জাগতিক কর্মকান্ড।
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে তখন ছিল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। অনেকের বাড়িতেই ফোন ছিল না। মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ফেইসবুক ছাড়া নিত্যদিনের এই যোগাযোগ কেমন করে সম্ভব হতো সেটা ভাবলে এখন আশ্চর্যই লাগে। তারপরেও আমরা ঠিকই সময়মতো একত্রিত হয়ে যেতাম। কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ, জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র হুমায়ুন ফরিদী, অভিনেতা আফজাল হোসেন প্রায়ই চলে আসতেন কার্জন হলের ফার্মেসি বিভাগে। ছাত্রজীবনে আমি যেখানে কাজ করতাম সেই অরিয়ল এডভারটাইজিং-এর অফিসে আর ফরিদুর রেজা সাগরের খাবার দাবার রেস্তোরাঁয় ছিল আমাদের আড্ডা।
দুই
বিভিন্ন কারণে সিনিয়র কবি, লেখক, সম্পাদক, নাট্যকার ও অধ্যাপকদের সঙ্গে আমাদের অনেকের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। এ ব্যাপারে মিলন ছিল একদম অন্যরকম। নিজে গদ্যলেখক। কিন্তু ছোট-বড় নানা বয়সের কবির সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা। কবিরা কেন তাকে এত পছন্দ করতো আর এত ভালোবাসতো তা আমার কাছে রহস্যময়। রফিক আজাদের সঙ্গে মিলনের সম্পর্ক তো সে সময় রীতিমতো বিখ্যাত। সেটাকে মিলন আরো জনপ্রিয় ও প্রবাদতুল্য করে তোলে নিজেদের নিয়ে লেখা উপন্যাসে।
আমার ঢাকা কলেজের শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হন। আমার সঙ্গে ওই সময় তার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। বৈশাখী পূর্নিমার পর তার কাব্যগ্রন্থ কীর্তিনাশা তখন সদ্য বের হয়েছে। আমরা তার মুগ্ধ পাঠক। জাহাঙ্গীরনগরে তার বাসায় গিয়েছি অনেকবার। তিনি ঢাকায় এলে একবার না একবার অরিয়ল অফিসে আসবেনই। অন্যান্য কাজ শেষে আমাদের অফিসে এসে কখনো কখনো শাওয়ার নিয়ে, বিশ্রাম সেরে তারপর ইউনিভার্সিটির বাস ধরতেন। কিছুদিন পর লক্ষ করি যে এই কবির সঙ্গে মিলনের ঘনিষ্ঠতা হলো সবচেয়ে গভীর।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার কলেজ-জীবন থেকে আমার শিক্ষক। ধারণা করি, আমি তার প্রিয় ছাত্রদের একজন। তার সম্পাদিত বিখ্যাত কণ্ঠস্বর পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়। কিন্তু কিছুদিন যোগাযোগ না থাকলে আমার কথা একদম ভুলে যান স্যার। মিলন প্রায়ই অভিমান ও কৌতুক মিশিয়ে গল্প করে স্যার ওর গল্প কণ্ঠস্বর পত্রিকায় ছাপেননি। জনপ্রিয় ধারার কথাসাহিত্য সম্পর্কে স্যার কী মনোভাব পোষণ করেন সেটা আমরা সকলেই জানি। অথচ আশ্চর্য হয়ে দেখি আমাদের বন্ধু মিলনের প্রতি স্যারের অসামান্য নহে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে কিংবা স্যারের সঙ্গে গল্পে মিলন আমার চেয়ে বেশি নিয়মিত। সায়ীদ স্যারের কাছাকাছি যারা গিয়েছেন তারা জানেন স্যার তাকেই বেশি ভালোবাসেন যে বেশি বই পড়ে, নতুন কিছু পড়ে, আর সেসব বইয়ের মূল কথা ও উজ্জ্বল লাইনগুলো মনে রাখতে পারে।
মিলনের বই পড়ার পরিধি ও গভীরতা ওকে এভাবেই অনেকের কাছে প্রিয় করে তুলেছে। তা ছাড়া একজন লেখকের একাগ্রতাকে সকলেই মূল্য দেয়। সাহিত্যের মতো একটা বিষয়ের জন্য নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করে দেওয়াটা কোনো দেশে কোনো সমাজেই খুব বেশি দেখা যায় না। নিজের সর্বস্ব দিয়ে সে লেখালিখিকে সার্বক্ষণিক কাজ হিসেবে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছে। মিলনের এই অঙ্গীকারকে সম্মান জানিয়েছেন সকলেই।
তিন
মিলনকে বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা ও শক্তিমান কথাসাহিত্যিকদের একজন বলে মনে করি আমি। কথাটা একটু সাহসী মনে হলেও যুক্তিহীন নয়। তার লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস উৎকর্ষের এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমাদের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্ভারের মধ্যে তাদের অনায়াসে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যাকে বলে কালজয়ী এমন কিছু লেখা মিলন ইতিমধ্যেই লিখেছে। যাঁরা তা পড়েননি তাঁরা সুসাহিত্য পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
গত কয়েক বছরে ছোটদের জন্য ও কয়েকটা অসাধারণ উপন্যাস লিখেছে। ঈদ সংখ্যা অথবা পূজাবার্ষিকীতে অগ্রজ ও জনপ্রিয়তম লেখকের জায়গাটি ও অনায়াসে অধিকার করে নিয়েছে। ক্রমাগতভাবে লিখছে আরো নতুন বিষয়ে, নতুনতর আঙ্গিকে।
সাহিত্যে মিলন যে একটা বড় কাজ করতে এসেছে তা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। প্রথম দিকে লেখা কিছু উপন্যাস, কয়েকটি ছোটগল্প আর পরবর্তীকালে রচিত দীর্ঘ উপন্যাস ‘নুরজাহান’ পর্যন্ত নিজের আকাক্সক্ষা পূরণে অবিরত কাজ করেছে মিলন। তার অসামান্য সাফল্য দেখি কাহিনির বিস্তারে, চরিত্র-সৃজন ও বিকাশে, পরিপার্শ্বের অনুপুঙ্খ বিবরণে। সমাজের অন্তর্গত নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাত এবং তা থেকে তৈরি মানবিক জটিলতার উদঘাটনে কথাসাহিত্যিক হিসেবে মিলন তার উচ্চ সামর্থ্য এবং সুচারু শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছে। দুঃখ-কষ্ট মোড়ানো জীবন সংগ্রামের সঙ্গে মিলনের আশৈশব পরিচয় ছিল। কিন্তু সেইসঙ্গে সে অসামান্য কৃতিত্বের সঙ্গে আয়ত্ত করেছে গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের সমস্ত খুটিনাটি। সমাজের অন্তর্গত সকল মানবিক দ্ব›দ্ব-জটিলতা এবং নানাপ্রকার সংঘাতের সূত্র তার জানা। এটা এক বিস্ময়।
আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে, এই শহরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে, নাগরিক আবহের মধ্যে বড় হয়ে কখন, কীভাবে এত কিছু আয়ত্ত করলো সে? গ্রামীণ প্রকৃতি, নদী ও জলাভ‚মি, ফসলের মাঠ, ঝোপঝাড়, খেজুর গাছের গায়ে বন্যা-জলের দাগ, মেঘ, বৃষ্টি, রোদ ও সূর্যাস্ত এমন গভীর মমতা নিয়ে কখন দেখল মিলন? শুধু প্রকৃতি নয়, সেখানকার সমাজের ভিতরকার জটিলতা, শ্রেণিবৈষম্য ও তা থেকে সৃষ্ট সংঘাত মিলন চেনে। সে জানে শহরের মধ্যবিত্ত ও নগরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যসত্ত¡ভোগী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গ্রামের ক্ষমতাবানদের পারস্পরিক স্বার্থ ও স্বাভাবিক নৈকট্যের কথা। নারী-পুরুষের ব্যবধান ও বৈষম্য, দমিত ও নিরুপায় মানুষের মন, ধর্মান্ধতার বাণিজ্য এবং তা থেকে তৈরি করা নানাবিধ স্বার্থান্বেষী শৃঙ্খল ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে অনায়াসে গল্পের ভিতরে তুলে আনে ইমদাদুল হক মিলন। তাদেরকে সে সঞ্চারিত করে আমাদের বোধ ও অনুভ‚তিতে।
ওর লেখা সম্পর্কে বিশ্লেষণ-ধর্মী আলোচনা কতটা হয়েছে জানি না। সমকালীন সাহিত্যের কোনো বড় কাজ নিয়ে আমাদের ফেনিল উচ্ছ¡াস অথবা সন্দিগ্ধ অবজ্ঞা-সংশয় যতখানি, বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়নের আগ্রহ ততটা দেখি না। কিছু কিছু উলেখযোগ্য সৃষ্টি সেই দাবি জানালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের সমালোচনা-সাহিত্য থাকে নিস্পৃহ ও নিরুত্তর। তার ওপরে রয়েছে জনপ্রিয় লেখককে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেয় করার রাজনীতি।
এখানে সমকালীন সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ে আলোচনা সাধারণত অতি সংক্ষিপ্ত হয়। আর তা সীমাবদ্ধ থাকে দৈনিক সংবাদপত্রের সাহিত্য সাময়িকীর পরিসরে। সাতশো-আটশো বা এক হাজার শব্দে। পত্রিকার পাতায় আবার অনেকখানি জায়গা দিতে হয় নোবেল, বুকার, পুলিৎজার অথবা অন্য কোনো পুরস্কার পাওয়া লেখকদের নিয়ে আলোচনা করার জন্য। বিদেশি লেখকদের নিয়ে আলোচনা লেখাও সহজ। নেট ও চ্যাট জিপিটি ঘাটলেই অনেক কিছু পাওয়া যায়। সহজেই মেলে রেফারেন্স। কিন্তু দেশের একজন সমকালীন লেখক সম্পর্কে লিখতে গেলে পরিশ্রম বেশি। পাঠকের কাছে তার মর্যাদা অনিশ্চিত। ফলে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস অথবা রিজিয়া রহমানের নাম আমরা ভুলে যাই। সৈয়দ শামসুল হক, রাহাত খান, সেলিনা হোসেন ও রাবেয়া খাতুনরা অনালোচিত থাকেন।
মিলনের ছোট-বড় বেশ কিছু উপন্যাস, তাদের ভাষা, চরিত্র, মনোজগত, সমাজ-প্রতিবেশ ও গ্রাম-চিত্রের জন্য এখনই যথাযথ মনোযোগ, ও মর্যাদা পাবার উপযুক্ত। পরবর্তীকালে হয়তো ওর লেখার বৈশিষ্ট্য নিয়ে তত্ত¡-পদ্ধতি ও প্রকরণগত দিক থেকে উন্নতমানের আলোচনা ও গভীর গবেষণা হবে। হয়তো মিলনের সমাজ-নিরীক্ষণ অথবা বিস্তারিত আখ্যান থেকে নতুন দৃষ্টিকোণ ও শৈলী খুঁজবেন ভবিষ্যতের আলোচকগণ।
এই লেখকের সৃষ্টিশীল কাজ এখনও নতুন কোণ, মোড় ও বাঁক ধরে নতুন পথে এগিয়ে চলেছে। ইমদাদুল হক মিলনের সৃষ্টিশীল দীর্ঘায়ু কামনা করি। দীর্ঘজীবি হোক তার রচনাবলি। মিলন ও আমি যেন একসঙ্গে আমাদের জš§দিন উদযাপন করতে পারি আরো অনেক বছর।









