ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার ওপরে আকাশের নীল চাদরে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর এক পরম বন্ধু— ওজন স্তর। এটি এমন এক অদৃশ্য ছাতা যা সূর্য থেকে ধেয়ে আসা মহাজাগতিক বিষাক্ত অতিবেগুনি রশ্মিকে (ইউভি রে) শুষে নিয়ে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ওজন দিবস’ ।
পৃথিবীর এই অতিপ্রয়োজনীয় রক্ষাকবচকে বাঁচানোর লড়াইয়ে প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের দায়িত্ববোধকে পুনরুজ্জীবিত করে।
কেন এই দিনটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা প্রথম আবিষ্কার করেন যে, মানুষের তৈরি কিছু রাসায়নিকের কারণে ওজন স্তরে বিশাল এক ফাটল বা গর্ত তৈরি হয়েছে। এর ফলে পৃথিবীতে ক্যানসার, চোখের ছানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই বিপর্যয় রুখতে ১৯৮৭ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর বিশ্বের দেশগুলো একত্রিত হয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধের জন্য ‘মন্ট্রিল প্রোটোকল’ স্বাক্ষর করে। জাতিসংঘ পরবর্তীতে এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক ওজন স্তর সুরক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আশার আলো: ওয়ান স্তর কি সুস্থ হচ্ছে?
গত কয়েক দশকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সাফল্য দেখেছে। ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (সিএফসি) এর মতো ওজোনক্ষয়কারী গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ৯৯ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ধারা বজায় থাকলে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলের এবং ২০৬৬ সালের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকার ওপরের ওজোন স্তর পুরোপুরি আগের অবস্থায় (১৯৮০ সালের রূপে) ফিরে আসতে পারে। এটি পরিবেশ রক্ষায় মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় যৌথ জয়।
কিন্তু চ্যালেঞ্জ এখনও শেষ হয়নি
ওজন স্তর সুরক্ষায় আমরা সফল হলেও, বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস (যেমন এইচএফসিএস) মারাত্মক গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে কাজ করছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের লড়াইটা দ্বিগুণ— একদিকে ওজন স্তরকে ধরে রাখা, অন্যদিকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করা।
সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের করণীয়
ওজন স্তর রক্ষায় বড় বড় পলিসির পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখতে পারে:
- পরিবেশবান্ধব গ্যাজেট ব্যবহার: এসি বা রেফ্রিজারেটর কেনার সময় ‘CFC-Free’ বা ওজোন-বান্ধব সার্টিফাইড পণ্য বেছে নিন।
- সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ: এসি বা ফ্রিজ নষ্ট হলে দ্রুত মেরামত করুন, যাতে তা থেকে ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে না পড়ে।
- যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ: গাড়ি থেকে নির্গত নাইট্রাস অক্সাইড ওজন স্তরের ক্ষতি করে। তাই গণপরিবহন ব্যবহার বা সাইক্লিংয়ের অভ্যাস গড়ুন।
পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। আকাশের সেই অদৃশ্য ছাতাটি যদি অক্ষত না থাকে, তবে জ্বলন্ত সূর্যের নিচে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। আজকের এই বিশেষ দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক— প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া।









