মিডিয়ায় অনুমোদনহীন তথ্য ফাঁসের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট স্টাফের প্রায় ৫০ সদস্যকে পলিগ্রাফ বা মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কেউ সাংবাদিকদের কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন কি না, তা খুঁজে বের করতে এ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার তথ্য কীভাবে গণমাধ্যমে এসেছে, তা তদন্তের অন্যতম বিষয়।
গত মাসে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর পলিগ্রাফ পরীক্ষা করা হয়। এসব প্রতিবেদনে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরসহ বিভিন্ন অস্ত্রের ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এসব প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছিলেন, দেশটির অস্ত্রের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা তদন্তমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের বিষয়টি প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করে।
তিনি আরও বলেন, গোপন তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন আমাদের সেনাদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জয়েন্ট স্টাফে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে সামরিক কমান্ডগুলোর সঙ্গে অভিযান পরিচালনার কৌশল, নীতি এবং যুদ্ধ পরিকল্পনা সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই সংস্থা।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে, শুধু তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের তথ্য ফাঁস ঠেকাতেও ব্যাপক পলিগ্রাফ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইন ও সামরিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তের পরিধি নজিরবিহীন। আধুনিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে এত ব্যাপকভাবে পলিগ্রাফ পরীক্ষা আগে কখনো করা হয়নি।
ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে এবং এ নিয়ে সামরিক ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে যুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই এসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
অনুমোদনহীন তথ্য ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে বারবার অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গোলাবারুদের ঘাটতি এবং ইরান সংঘাত মোকাবিলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের পর তিনি এসব তথ্য ফাঁসকে প্রকাশ্যে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
ধারাবাহিক তথ্য ফাঁসের ঘটনায় পেন্টাগনের ভেতরে অবিশ্বাসের পরিবেশ আরও গভীর হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এর জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ব্যবস্থাপনার ধরনকে দায়ী করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হেগসেথ অন্তত ৮০ জন জেনারেল, অ্যাডমিরাল ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন অথবা তাদের পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন।
হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পেন্টাগন একাধিক তথ্য ফাঁসের তদন্ত শুরু করেছে। এর মধ্যেই একটি সিগন্যাল গ্রুপ চ্যাটে সংবেদনশীল সামরিক অভিযানের তথ্য শেয়ার করার অভিযোগে হেগসেথ নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
গত মাসে প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর শীর্ষ সম্পাদক ও প্রকাশককে বরখাস্ত করলে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা আরও বাড়ে। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ একটি স্বাধীন ও সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সামরিক সংবাদমাধ্যম।
কর্মীরা অভিযোগ করেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিশোধ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে পেন্টাগন ঘিরে টানাপোড়েন বাড়লেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন ট্রাম্প। প্রকাশ্যে তিনি হেগসেথের কাজের প্রশংসা করে একে ‘চমৎকার’ বলে মন্তব্য করেছেন।









